১৪ নভেম্বর, ২০২১ ০০:১০
রাজধানীর বনানীতে রেইনট্রি হোটেলে দুই শিক্ষার্থী ধর্ষণের মামলার বিচারক মোছা. কামরুন্নাহারের দায়িত্ব পালন নিয়ে যেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সে জন্য প্রধান বিচারপতিকে চিঠি লিখবেন বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।
শনিবার বিকেলে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি প্রাঙ্গণে এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা জানান তিনি।
আনিসুল হক বলেন, ‘একটি কথা অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, আমি ওই বিচারকের (বেগম মোছা. কামরুন্নাহার) রায়ের বিষয়বস্তু নিয়ে এখন কথা বলতে চাই না। কিন্তু উনার (বিচারক) অবজারভেশনে ৭২ ঘণ্টা পরে পুলিশ যেন কোনো ধর্ষণ মামলার এজাহার না নেয়, এই যে বক্তব্য উনি দিয়েছেন, এটি সম্পূর্ণ বেআইনি ও অসাংবিধানিক।’
আইনমন্ত্রী বলেন, ‘এ কারণে আমি প্রধান বিচারপতির কাছে তাকে বিচারক হিসেবে তার দায়িত্ব পালন নিয়ে যেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সে জন্য একটা চিঠি লিখছি। রোববার এই চিঠি দেওয়া হবে।’
অবশ্য, আইনমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছেন সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদসহ বিশিষ্টজন। তারা মনে করেন, বিচার বিভাগের যে কোনো বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার একমাত্র সুপ্রিমকোর্টের। আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্নের উদ্রেক করে। তা ছাড়া ধর্ষণ মামলার দায়ের করা নিয়ে বিচারকের যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন সেটি প্রতিপালন করতে হবে এমনটা নয়। সংবিধান ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কেবলমাত্র সুপ্রিমকোর্টই সংবিধান ও আইনের বিষয়ে ব্যাখ্যা বা পর্যবেক্ষণ দিয়ে থাকে। যা সবার জন্য প্রতিপালনযোগ্য। তাই এ বিষয় নিয়ে বিতর্কের প্রয়োজন নেই।
ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রধান বিচারপতির কাছে চিঠি দেওয়া হবে-জনসম্মুখে বলা সঠিক হয়নি। কারণ, বিচার বিভাগ স্বাধীন। আদালতের একটা প্রসিডিউর আছে। কার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কী, হবে না সেটা প্রধান বিচারপতির এখতিয়ার। আইনমন্ত্রী আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেন।
ঘটনার ৭২ ঘন্টার পর ধর্ষণ মামলা না নেওয়া প্রসঙ্গে ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ আরও বলেন, ৭২ ঘণ্টা কেন আরও বেশি সময় লাগতে পারে। ওই সময় পেরিয়ে গেলে কী অপরাধের বিচার হবে না। এটাও আদালতের বলা সঠিক নয়। তিনি বলেন, আমরা প্রায় বিভিন্ন গণমাধ্যমে শুনি- ঘটনার পর ধর্ষণের শিকার ব্যক্তির পরিবারকে আটকিয়ে রাখা হয়। অপরাধীরা প্রভাবশালী হওয়ায় ভিকটিম অসহায় হয়ে পড়ে।
এ বিষয়ে বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ সুপ্রিম কোর্ট আইনের বিষয়ে ব্যাখ্যা দেবেন, সেটিই সবার জন্য বাধ্যতামূলক ও প্রতিপালনযোগ্য। তার অর্থ এই নয় যে, কোনো আদালত বিশেষত বিচারিক আদালতের কোনো পর্যবেক্ষণ বা আইনের বিশ্নেষণ অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রতিপালনীয় নয়। সেই বিবেচনায় ধষণ মামলায় আলোচ্য নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারকের দেওয়া ৭২ ঘন্টা সংক্রান্ত মন্তব্যের কোনো আইনী বাধ্যবাধকতা নেই। এই মন্তব্যের কারণে ৭২ ঘণ্টা পর পুলিশ আগেও যেমন মামলা নিতো, এখনও একইভাবে মামলা নিতে পারবে। অতএব আমর কাছে মনে হচ্ছে বিচারকরে মন্তব্য বা পর্যবেক্ষণ নিয়ে অহেতুক আইনী অস্পষ্টতা সৃষ্টি করা হয়েছে।’
বিচারকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রধান বিচারপতিকে আইনমন্ত্রীর চিঠি দেওয়া প্রসঙ্গে শাহদীন মালিক বলেন, ‘আইনমন্ত্রীর বক্তব্য দুর্ভাগ্যজনক। তার বক্তব্য নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ যে এখনও পৃথকীকরণ সম্পূর্ণভাবে হয়নি তারই একটি দৃস্টান্ত। কোনো বিচারক কোন আদালতে কি বিষয়ে মামলা শুনবেন, তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে- সেটা নির্ধারণ করার দায়িত্ব, ক্ষমতা ও এখতিয়ার কেবলমাত্র সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যাস্ত। অতএব কোনো বিচারকের দায়িত্ব পালন নিয়ে মন্তব্য বা ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশের সময় নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণের বিষয়টি অগ্রাহ্য করা মোটেই বাঞ্ছণীয় নয়।’
এর আগে গত ১১ নভেম্বর দুই শিক্ষার্থী ধর্ষণের মামলার রায় ঘোষণার পর পর্যবেক্ষণে আদালত পুলিশের উদ্দেশে ৭২ ঘণ্টা পর যদি কেউ ধর্ষণের মামলা করতে যায়- তা না নেওয়ার পরামর্শ দেন। ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭ এর বিচারক বেগম মোছা. কামরুন্নাহারের আদালত আলোচিত এ মামলার রায় দেন। আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদের ছেলে সাফাত আহমেদসহ পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় বিচারক তাদের খালাস দেন।
রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, মামলার দুই ভিকটিম আগে থেকেই সেক্সুয়াল রিলেশনে অভ্যস্ত। তারা স্বেচ্ছায় হোটেলে গেছেন। সেখানে গিয়ে সুইমিং করেছেন। ঘটনার ৩৮ দিন পর তারা বললেন, ‘আমরা ধর্ষণের শিকার হয়েছি’। অহেতুক তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রভাবিত হয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়েছেন। এতে আদালতের ৯৪ কার্যদিবস নষ্ট হয়েছে। এরপর থেকে পুলিশকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছি। এ ছাড়া এরপর থেকে ধর্ষণের ৭২ ঘণ্টা পর যদি কেউ মামলা করতে যায়- তা না নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছি।
আপনার মন্তব্য