নিজস্ব প্রতিবেদক

২২ জুলাই, ২০২৬ ০০:৪৪

নজরুলের নারী-কাণ্ড: ২০ জুলাই ফোনে নির্দেশনা, ২১ জুলাই কাবিননামায় সই, বিয়ের তারিখ ১৭ জুন

সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর-কালীগঞ্জ) আসনের জামায়াতে ইসলামী দলীয় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক আপত্তিকর ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। সম্প্রতি ঢাকার মগবাজার এলাকার একটি কক্ষ থেকে ধারণ করা এসব ভিডিওতে এক তরুণীর সঙ্গে তাকে অন্তরঙ্গ অবস্থায় দেখা যায়, যা নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। প্রথম দিকে সমর্থকেরা একে ‘এআই’ প্রযুক্তির কারসাজি বলে দাবি করলেও পরে এমপি নিজেই ভিডিওর তরুণী মরিয়ম খাতুনকে তার ‘দ্বিতীয় স্ত্রী’ হিসেবে দাবি করেন।

তবে এমপির এই বিয়ের দাবি এবং ভার্চুয়াল জগতে ছড়িয়ে পড়া কাবিননামা নিয়ে নতুন করে চরম ধোঁয়াশা ও জালিয়াতির চিত্র সামনে এসেছে। এমপি ১৭ জুন বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার দাবি করলেও কাবিননামা নিবন্ধনকারী কাজী নিজেই জানেন না বিয়েটি কোথায় হয়েছে।

কাজীর স্বীকারোক্তি ও পেছনের তারিখে রেজিস্ট্রেশন
সাতক্ষীরার শ্যামনগর থানার ১২ নং গাবুরা ইউনিয়নের কাজী মাওলানা বি এ এম বাকী বিল্লাহ এ প্রসঙ্গে স্বীকার করেন, গত ২০ জুলাই (সোমবার) দিবাগত রাতে ঢাকা থেকে তাকে ফোনে বিয়ের বিষয়ে জানানো হয়। এরপর প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তিনি পেছনের তারিখ (১৭ জুন) দেখিয়ে কাবিননামা প্রস্তুত করেন। পরদিন ২১ জুলাই (মঙ্গলবার) সকালে কনে ও তার অভিভাবক এসে কাবিননামায় স্বাক্ষর করেন।

দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সাংবাদিক গাজী শাহনেওয়াজ ফোনে কথা বলেন সাতক্ষীরায় থাকা ওই কাজীর সঙ্গে। কথোপকথনের একপর্যায়ে কাজী আক্ষেপ করে বলেন, “আচ্ছা ভাই, আমি যাতে বিপদে পড়ে না যাই, আমাদের বিপদে ফেলেছেন।” এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে পত্রিকাটির ইউটিউব চ্যানেলে।

অন্যদিকে, এমপি নজরুল, তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগম, ভিডিও ভাইরালের পর দাবিকৃত দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুন এবং শ্বশুর মাসুম বিল্লাহ পৃথক ভিডিও বার্তায় ৩ লাখ টাকা দেনমোহরে পারিবারিকভাবে বিয়ের দাবি করলেও ঘটনাটিকে ঘিরে নতুন নতুন চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে।

ক্ষমার আকুতি
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, একটি কক্ষে এমপি নজরুল ও ওই তরুণীকে অবরুদ্ধ করে কয়েকজন ব্যক্তি জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। সেখানে জামায়াত সদস্য হিসেবে এমন কাজের তীব্র সমালোচনা করা হলে এমপি নজরুল মাথা নেড়ে অন্যায় স্বীকার করে বলেন, “বিশ্বাস করেন, আজই প্রথম।” এ সময় তিনি হাত জোড় করে ক্ষমাও চান।

ওই সময় মেয়েটির নাম জিজ্ঞাসা করা হলে অনেকক্ষণ চুপ থেকে সে নিজের নাম ‘মাহি’ বলে জানায়। এমপি আরও বলেন, “আপনারা ভিডিও ডিলিট করে দেন, সবকিছু বলছি। বলেও যা, না বলেও তা। আপনারা এটা নিয়েই তো ঝামেলা করবেন।”

সিভির বৈপরীত্য ও বয়সের অসঙ্গতি
আইনি ও সময়ানুক্রমিক অসঙ্গতি আরও স্পষ্ট হয় মেয়েটির শিক্ষাগত ও দাপ্তরিক সনদে। হঠাৎ করে সামনে আসা কাবিননামা অনুযায়ী মেয়েটির জন্ম ২০০৮ সালের ২২ মে। অথচ ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠান ‘দ্য ডিসেন্ট’ কর্তৃক সংগৃহীত মেয়েটির একটি বায়োডাটায় দেখা যায়, গত ২২ জুন ২০২৬ তারিখে এমপি গাজী নজরুল ইসলাম নিজেই ‘জোর সুপারিশ করছি’ লিখে সবুজ কালিতে স্বাক্ষর করেছেন। উক্ত সিভিতে মেয়েটির বৈবাহিক অবস্থা লেখা রয়েছে ‘অবিবাহিত’। ১৭ জুন বিয়ে হয়ে থাকলে ২২ জুনের সিভিতে মেয়েটিকে ‘অবিবাহিত’ দেখিয়ে কেন সুপারিশ করা হলো— এই বিষয়ে এমপি নজরুল কোনো উত্তর দেননি।

দ্বিতীয় বিয়ের আইনি ধারা ও চেয়ারম্যানের বক্তব্য
‘মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১’ অনুযায়ী, সালিসি পরিষদের পূর্বানুমতি ছাড়া বিদ্যমান স্ত্রী থাকা অবস্থায় কোনো পুরুষ পুনরায় বিয়ে করতে পারেন না। সালিসি পরিষদের পূর্বানুমতি ছাড়া ‘মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪’ অনুযায়ী তা নিবন্ধনের অযোগ্য হয়ে যায়।

এই বিয়ে প্রসঙ্গে সাতক্ষীরার গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জিএম মাসুদুল আলমের সঙ্গে ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’ পত্রিকার প্রতিবেদক ওয়াসেক বিল্লাহ কথা বলেছেন। স্থানীয় ওই চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতির জন্য এমপি কখনো কোনো আবেদন করেননি। সংসদ সদস্য দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি বিয়ের কথা শুনেছি।” কখন শুনেছেন— এমন প্রশ্নে তিনি উত্তর দেন, “এই তো আজকেই (২১ জুলাই) শুনেছি।”

সালিসি বোর্ডের অনুমতি ছাড়া বিয়ের নিবন্ধন কীভাবে হলো— এই প্রশ্নের জবাবে কাবিননামায় স্বাক্ষর থাকা কাজী বাকী বিল্লাহ দাবি করেন, প্রথম স্ত্রী উপস্থিত থাকায় তিনি নিবন্ধন করেছেন।

তবে প্রথম স্ত্রীর উপস্থিতি সালিসি পরিষদের বিকল্প কি না— এমন প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নাহিদা খানম জানান, স্ত্রীর শারীরিক অক্ষমতা, সন্তান ধারণে অক্ষমতা বা দাম্পত্য ক্ষেত্রে গুরুতর বিরোধের মতো নির্দিষ্ট কিছু কারণ দেখিয়ে সালিসি পরিষদে দ্বিতীয় বিয়ের আবেদন করা যায়। কিন্তু গাজী নজরুলের প্রথম স্ত্রী সন্তান ধারণে অক্ষম নন; ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জমা দেওয়া তার নির্বাচনী হলফনামায় সন্তানদের কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।

এছাড়া ‘মুসলিম বিবাহ ও তালাক (রেজিস্ট্রেশন) আইন, ১৯৭৪’-এর ৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী, কাজী নিজে বিয়ে পড়ালে তাৎক্ষণিকভাবে রেজিস্ট্রি করবেন, আর অন্য কেউ বিয়ে পড়ালে ৩০ দিনের মধ্যে বরকে নিকাহ রেজিস্ট্রারের কাছে রিপোর্ট করে রেজিস্ট্রি করাতে হবে। তা না করা হলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ (সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড বা ৩ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড)। এমপির দাবিকৃত ১৭ জুনের বিয়ে ২১ জুলাই নিবন্ধিত হওয়ায় আইনি এই ধারার ব্যত্যয় ঘটেছে।

সাবেক ড্রাইভারের বিস্ফোরক অভিযোগ ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিরাপত্তা আবেদন
এদিকে, জামায়াতের এই এমপির বিরুদ্ধে আরও বিস্ফোরক তথ্য দিয়েছেন তার দীর্ঘদিনের ড্রাইভার ও বিশেষ সহকারী (পিএস) ওবায়দুর রহমান ওরফে ওবায়দুল্লাহ। তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা চালানো হয়েছে দাবি করে তিনি জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে একটি আবেদন জমা দিয়েছেন। ওই চিঠিতে অন্যান্য অপ্রাপ্তবয়স্ক তরুণীর সঙ্গেও এমপি গাজী নজরুলের অনৈতিক ভিডিও রয়েছে বলে তিনি দাবি করেছেন।

ওবায়দুর রহমান জানান, তিনি দীর্ঘদিন গাজী নজরুলের ড্রাইভার ও ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) হিসেবে কাজ করার সূত্রে তার নানা দুর্নীতি, জমি দখল, বালুমহাল দখল, ঘুষ গ্রহণ এবং নারীঘটিত অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সরাসরি চাক্ষুষ সাক্ষী।

চিঠিতে সিসিটিভি ফুটেজের তথ্য উল্লেখ করে এমপি গাজী নজরুলের নারীঘটিত ঘটনার কয়েকটি নির্দিষ্ট তারিখ তুলে ধরা হয়, যার মধ্যে রয়েছে: ২২ জুন ২০২৬ বেলা ১:৩০ মিনিটের পর মেট্রোরেলের পল্লবী স্টেশনের দোতলায় একটি কফি শপে এক ১৭ বছরের মেয়েকে নিয়ে প্রায় ১ ঘণ্টা অবস্থান; ৯ জুলাই ২০২৬ বেলা ১টা থেকে ২টা পর্যন্ত মিরপুর ১২ নম্বরে ‘দীশা ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি’-তে ওই একই মেয়েকে নিয়ে অবস্থান; ১৩ জুলাই ২০২৬ বেলা ১০:৩০ মিনিট থেকে বিকেল পর্যন্ত মগবাজারে এক মহিলার বাসায় উক্ত মেয়েকে নিয়ে অসামাজিক কাজ, যার গোপন ভিডিও রয়েছে বলে জানান তিনি। ওবায়দুর রহমানের অভিযোগ, এমপি গাজী নজরুলের এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের তথ্য ও প্রমাণ তাঁর কাছে থাকার কারণেই তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণ করা হয়েছে।

দলীয় ক্ষোভ ও এমপির আত্মপক্ষ সমর্থন
একদিকে তড়িঘড়ি করে ফোনে তথ্য দিয়ে পেছনের তারিখে কাবিননামা তৈরি, অন্যদিকে বায়োডাটার বৈপরীত্য এবং সিসিটিভি ফুটেজের পুরনো সময়কাল— সব মিলিয়ে জামায়াতের প্রবীণ এই এমপির কর্মকাণ্ডে দলের অভ্যন্তরেও ব্যাপক ক্ষোভ ও অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত খোঁজখবর নিয়ে উপযুক্ত সাংগঠনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে জামায়াতের কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগ।

উল্লেখ্য, ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর জামায়াত-দলীয় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম এটিকে তার সাবেক পিএস ওবায়দুর রহমান ওরফে ওবায়দুল্লাহর ‘ষড়যন্ত্র ও ব্ল্যাকমেইল’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। একই সঙ্গে তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগম সামাজিক মাধ্যমে এসব ভিডিও প্রচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন।

ভিডিও :

আপনার মন্তব্য

আলোচিত