সিলেটটুডে ডেস্ক

১১ ফেব্রুয়ারি , ২০১৬ ১৫:৫৪

টমেটোয় মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক

রাসায়নিক কুইনালফসের সহনীয় মাত্রা প্রতি কেজিতে ১০ মাইক্রোগ্রাম। কিন্তু টমেটোয় উপাদানটি পাওয়া গেছে এর ৩২ গুণ। কৃষক পর্যায়ে এবং পাইকারি ও খুচরা বাজার থেকে টমেটোর নমুনা সংগ্রহের পর জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষায় সবজিটিতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশকের এ উপস্থিতি ধরা পড়েছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কুইনালফস অর্গানোথায়োফসফেট গোত্রের কীটনাশক। এর প্রভাবে প্রাথমিক পর্যায়ে মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব ও ডায়রিয়া হতে পারে। তবে অতিমাত্রায় শরীরের সংস্পর্শে এলে শ্বাসকষ্ট, হূদরোগসহ স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটতে পারে।

জাতিসংঘ কৃষি সংস্থার সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরি চলতি বছরের ১৬ থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত টমেটোর ২৭টি নমুনা সংগ্রহ করে। কৃষক, পাইকারি ও খুচার বাজার— তিনটি পর্যায় থেকেই নয়টি করে নমুনা সংগ্রহ করে তারা। রাজধানীর তিনটি পাইকারি ও তিনটি খুচরা বাজার এবং ঢাকার আশপাশের তিনটি স্থানের কৃষকদের কাছ থেকে নমুনাগুলো সংগ্রহ করা হয়। পরে ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরিতে সেগুলো পরীক্ষা করা হয়।

পরীক্ষায় কৃষক পর্যায়ে সংগৃহীত তিনটি নমুনায় অস্বাভাবিক মাত্রায় কুইনালফস পাওয়া যায়। এর মধ্যে একটি নমুনায় কুইনালফস পাওয়া যায় ৩২১ মাইক্রোগ্রাম/কেজি। যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) নির্ধারিত স্বাভাবিক মাত্রা ১০ মাইক্রোগ্রাম/কেজি। টমেটোর অন্য দুটি নমুনায় কুইনালফস পাওয়া যায় যথাক্রমে ৭২ ও ২৬ মাইক্রোগ্রাম/কেজি; স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে যা সাত ও দ্বিগুণেরও বেশি। তবে নিরাপদ মাত্রায় পাওয়া গেছে ইথোপ্রোফসের উপস্থিতি। ইথোপ্রোফসের স্বাভাবিক মাত্রা প্রতি কেজিতে ২০ মাইক্রোগ্রাম হলেও একটি নমুনায় তা পাওয়া গেছে ৪ দশমিক ৬ মাইক্রোগ্রাম।

জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. জাফর উল্লাহ বলেন, মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য সংগ্রহের পর নিয়মিত তা পরীক্ষা করা হচ্ছে। ক্ষতিকর কী কী উপাদান রয়েছে, পরীক্ষার মাধ্যমে তা জানা যাচ্ছে।

দেশে টমেটো আবাদ সবচেয়ে বেশি হয় চট্টগ্রাম, যশোর ও জামালপুর জেলায়। পাশাপাশি রংপুর, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ ও খুলনা জেলায়ও সবজিটি আবাদ হয়। শীত ও গ্রীষ্মকালীন মিলে প্রতি বছর দেশে টমেটো উত্পাদন হয় প্রায় আড়াই লাখ টন। তবে অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে অনিরাপদ হয়ে উঠছে সবজিটি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কীটনাশক ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়ম রয়েছে। কীটনাশক প্রয়োগের পর ফসল তুলতে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু কৃষকরা অনেক ক্ষেত্রে ওই সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করেন না। এতে কীটনাশকের অবশেষ থেকে যাচ্ছে সবজিতে। এছাড়া যেকোনো কীটনাশক সহজেই কিনতে পারছেন কৃষক। সব মিলিয়ে কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বাড়ছে।

সবজিকে বিষমুক্ত রাখতে কীটনাশক বিক্রি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেয়ার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। সেই সঙ্গে জৈব সার ব্যবহার বাড়ানোর কথাও বলছেন তারা।

উবিনীগের নির্বাহী পরিচালক ফরিদা আখতার বলেন, বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে নিয়ন্ত্রণের সঠিক নীতিমালা গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া কোম্পানিগুলো কীটনাশককে ওষুধ হিসেবে যাতে বিক্রি করতে না পারে, সে ব্যাপারে কঠোর হতে হবে। ধীরে ধীরে কীটনাশক আমদানি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার পাশাপাশি কৃষককেও এ ব্যাপারে সচেতন করতে হবে।

সবজিতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশকের উপস্থিতি ধরা পড়ায় জনস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও। তারা বলছেন, কোনো কোনো কীটনাশক ব্যবহারের অনুমোদন থাকলেও তা করতে হবে সঠিক নিয়ম মেনে। কিন্তু তা না মানার কারণেই জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। মারাত্মক সব ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে শিশুরা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান বলেন, মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারে শিশুদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বয়স্কদের ক্ষেত্রে ক্রনিক ডিজিস হতে পারে।

অধিক মাত্রায় কুইনালফসের সংস্পর্শে এলে স্নায়ুদুর্বলতায় ভুগতে পারে বলে জানান স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ডা. আবু আজহার। তিনি বলেন, মাত্রাতিরিক্ত কুইনালফসের কারণে মানবদেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে কিডনি ও যকৃতে নানা সমস্যা দেখা দেয়।

সূত্র : বণিক বার্তা

আপনার মন্তব্য

আলোচিত