সিলেটটুডে ডেস্ক

১৬ এপ্রিল, ২০২৬ ১০:৫৭

চিঠি নেই, নোটিশ নেই, শুধু টেলিফোনে ডেকে নিয়ে ডিসি নিয়োগের সাক্ষাৎকার

প্রতীকী ছবি

আনুষ্ঠানিক চিঠি দেওয়া হয়নি। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট ও নোটিশ বোর্ডে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়নি। শুধু টেলিফোন করে ডেকে এনে দুই ব্যাচের কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে জেলা প্রশাসক পদে নিয়োগের জন্য প্রায় ৯০ জনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে।

প্রচলিত নিয়ম হলো– জেলা প্রশাসক নিয়োগের তালিকা (ফিটলিস্ট) তৈরির জন্য প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের ব্যাচভিত্তিক সাক্ষাৎকার নিতে হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে নির্দিষ্ট তারিখ ও সময়ে চিঠি দিয়ে ডাকা হবে। সাক্ষাৎকারের প্রস্তুতির জন্য সময়ও দেওয়া হবে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট ও নোটিশ বোর্ডে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে।

কিন্তু বিএনপি সরকারের ডিসি নিয়োগের ফিটলিস্ট তৈরির প্রথম উদ্যোগ এসব নিয়মকানুন না মানেই শেষ হয়েছে। বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ২৮ ও ২৯তম ব্যাচ থেকে কর্মকর্তাদের ডাকা হয়েছে। কিন্তু অনেক কর্মকর্তা বিষয়টি জানতেও পারেননি। নিয়মানুযায়ী সব কর্মকর্তাকে এই সাক্ষাৎকারে ডাক পাওয়ার কথা। পছন্দের কর্মকর্তাদের ডাকার অভিযোগে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এই দুই ব্যাচের অনেকে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মেধাতালিকার ক্রম অনুযায়ী সব কর্মকর্তাকে সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকা হয়েছিল। এর মধ্যে যারা ঢাকার বাইরে গিয়ে ডিসির দায়িত্ব পালন করতে চাইতেন না, তারা সাক্ষাৎকারে অনুপস্থিত ছিলেন– এমন নজির আছে।

জনপ্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ডিসি নিয়োগের ফিটলিস্ট তৈরির জন্য গত ৭ ও ৮ এপ্রিল বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ২৮তম ব্যাচের ৪৮ কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। এই ব্যাচে কর্মকর্তা আছেন ১৮৪ জন। ৯ এপ্রিল ২৯তম ব্যাচের ৩০ কর্মকর্তা এবং ১২ এপ্রিল ২১ কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। এই ব্যাচে কর্মকর্তা আছেন ১৮৮ জন। ২৮তম ব্যাচের কর্মকর্তারা ২০১০ এবং ২৯তম ব্যাচের কর্মকর্তারা ২০১১ সালে নিয়োগ পেয়েছেন।

দুই ব্যাচের ডাক পাওয়া ৯৯ কর্মকর্তার মধ্যে অন্তত ৯০ জন সাক্ষাৎকার দিয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে সাক্ষাৎকার দেওয়া কর্মকর্তাদের সংখ্যা জানতে চাইলে তারা বলেন, ফিটলিস্টের সাক্ষাৎকারসংক্রান্ত তথ্য দেওয়ার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিষেধ আছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন কর্মচারীদের পদায়ন নীতিমালায় বলা হয়েছে, জেলা প্রশাসক পদের নিয়োগ তালিকা প্রণয়নের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হবে। কমিটির সভাপতি হবেন মন্ত্রপরিষদ সচিব। সদস্য সচিব হবেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব। কমিটির সদস্য হলেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব ও ভূমি মন্ত্রণালয়ে সচিব।

কমিটির কার্যপরিধিতে বলা হয়েছে, কমিটি প্রয়োজনবোধে অতিরিক্ত সচিব বা যুগ্ম সচিব এবং বিভাগীয় কমিশনারদের সহায়তায় এক বা একাধিক বোর্ড গঠনের মাধ্যমে প্রার্থীর তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক দক্ষতা এবং বিষয়ভিত্তিক উপস্থাপনার দক্ষতা বা পারদর্শিতা যাচাই করবে। প্রার্থীর সাক্ষাৎকার গ্রহণ এবং সাক্ষাৎকার গ্রহণকালে মেধা, প্রজ্ঞা, ব্যক্তিত্ব, স্বাস্থ্য, আগ্রহ, ভাষাজ্ঞান, বাচনভঙ্গি, উপস্থাপনার পারদর্শিতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষমতা এবং প্রয়োজনীয় অন্য যোগ্যতা যাচাই করবেন।

এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আবুল হায়াত মো. রফিক বলেন, আপাতত এ দুই ব্যাচের সাক্ষাৎকার শেষ হয়েছে। ব্যাচের সবাইকে না ডাকা বা প্রস্তুতির সময় না দিয়ে টেলিফোনে ডাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।’

সাক্ষাৎকারে ডাক পাওয়া ভোলা জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পিন্টু বেপারী বলেন, ‘চিঠি পাইনি। টেলিফোনে জানিয়েছে; সে অনুযায়ী গিয়ে সাক্ষাৎকার দিয়েছি।’

ডিসি হতে ইচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা বলেন, এক ব্যাচ থেকে সবাই ডিসি হবেন না। সরকার যাকে পছন্দ করবে, সে-ই ডিসি হবেন। কিন্তু ফিটলিস্ট তৈরিতে সাক্ষাৎকার নিয়ে লুকোচুরি কেন? তারা বলেন, আগে কখনও এভাবে হয়নি। সরকার যত বেশি সম্ভব যাচাই-বাছাই করুক, করা উচিতও। এ জন্য বিভাগীয় কমিশনারদের মাধ্যমে অধিকতর যাচাই-বাছাই করার বিধানও আছে। কিন্তু নিয়ম ও রীতি মানা হলো না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিসি ফিটলিস্ট প্রণয়ন কমিটির একজন সদস্য বলেন, ডিসি নিয়োগের বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে সিদ্ধান্ত হয়। তাই রাজনৈতিকভাবে যেভাবে সিদ্ধান্ত আসে, সেভাবেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

একজন সাবেক সচিব বলেন, প্রশাসনের শীর্ষ ছয়জন সচিব নিয়ে গঠিত কমিটির বোর্ডে সাক্ষাৎকারের জন্য একজন কর্মকর্তাকে অবশ্যই চিঠি দিয়ে ডাকা উচিত। ফিটলিস্টের সাক্ষাৎকারে অতীতেও চিঠি দিয়ে প্রার্থীদের ডাকা হয়েছে। অনেকভাবে যোগ্যতা যাচাই করা হয়েছে। কারণ, ডিসি হলেন একটি জেলার প্রধান প্রশাসনিক, রাজস্ব এবং ম্যাজিস্ট্রেটিয়াল কর্মকর্তা। তিনি জেলা প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু, মাঠ প্রশাসনের মাধ্যমে সরকার ও জনগণের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করেন এবং জেলার আইনশৃঙ্খলা, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন কার্যক্রমের সমন্বয় করেন।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সরকারি কর্মকর্তাদের কর্মস্থল থেকে ছুটি নেওয়ার জন্য নির্ধারিত ছুটি বিধিমালা মেনে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন নিতে হয়। জরুরি কোনো ছুটির জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদন জমা দিতে হয়। তাই কোনো জেলা থেকে ঢাকায় সাক্ষাৎকার দিতে এলে অবশ্যই চিঠির প্রয়োজন।

কর্মচারী পদায়ন নীতিমালায় বলা হয়েছে, ডিসি ফিটলিস্ট প্রণয়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক, এডিসি, জেলা পরিষদের সচিব, পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং ইউএনও উভয় পদে ন্যূনতম দুই বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। পূর্ববর্তী পাঁচ বছরের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনের রেকর্ড এবং সমগ্র চাকরিজীবনের শৃঙ্খলা প্রতিবেদন সন্তোষজনক হতে হবে। প্রকল্প ও ক্রয় ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত জ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সম্পর্কে সম্যক ধারণা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয় সম্পর্কে জানা এবং বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা থাকতে হবে। ম্যাজিস্ট্রেসি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হতে হবে।

সূত্র: দেলওয়ার হোসেন/ দৈনিক সমকাল

আপনার মন্তব্য

আলোচিত