১০ মে, ২০১৬ ০১:৪১
যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামীর রায় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতির পর দেশটির হাই কমিশনারকে তলব করে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ।
একই সঙ্গে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিয়ে চালিয়ে যাওয়া ‘বিদ্বেষপূর্ণ প্রচার’ থেকে বিরত থেকে পাকিস্তানকে দায়িত্বশীল আচরণ করার জন্য সতর্ক করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
ঢাকায় পাকিস্তানের হাই কমিশনার সুজা আলম সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তলবে হাজির হলে মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপক্ষীয়) মো. মিজানুর রহমান বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ জানান।
এ সময় ‘দায়িত্বশীল আচরণের’ আহ্বান জানিয়ে পাকিস্তানে ‘যথাযথ কর্তৃপক্ষের’ কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য একটি প্রতিবাদপত্র হাই-কমিশনারের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়।
সচিব মিজানুর রহমান পরে সাংবাদিকদের বলেন, “পাকিস্তানি হাই কমিশনারকে ডেকে কড়া ভাষায় প্রতিবাদ জানান হয়েছে। বলা হয়েছে, তাদের বক্তব্য অগ্রহণযোগ্য।”
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ যুদ্ধাপরাধ মামলায় জামায়াত আমির মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসির রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন খারিজ করে দেওয়ার পর শুক্রবার এক বিবৃতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
সেখানে বলা হয়, “বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টে জামায়াতে ইসলামীর নেতা মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসির রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন খারিজ করে দেওয়ায় বিষয়টি আমরা গভীর উদ্বেগ ও মনোবেদনার সঙ্গে লক্ষ্য করলাম।”
১৯৭৪ সালের ত্রিপক্ষীয় চুক্তির আলোকে একাত্তরে ঘটনাবলী নিয়ে বাংলাদেশে কাছ থেকে ‘ভবিষ্যৎমুখী দৃষ্টিভঙ্গী’ আশা করার কথাও বলা হয় ওই বিবৃতিতে।
এরপর রোববার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক না গলাতে এবং ত্রিপক্ষীয় চুক্তির অপব্যাখ্যা দেওয়া বন্ধ করার আহ্বান জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম।
এর আগেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও কয়েকজন শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীর দণ্ড কার্যকরের পর বাংলাদেশের এই অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানায় পাকিস্তান।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে বিবৃতি ছাড়াও ঢাকায় পাকিস্তানের হাই কমিশন কর্মকর্তাদের জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগ নিয়ে দুই দেশের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যে দেশটির হাই-কমিশনারকে তলব করা প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ।
হাই-কমিশনার সুজা আলমকে দেওয়া সর্বশেষ প্রতিবাদপত্রে বলা হয়, “একটি সার্বভৌম দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনধিকার চর্চার এসব প্রতিক্রিয়া সর্ম্পূর্ণভাবে অগ্রহণযোগ্য।”
বারবার এ ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে পাকিস্তান একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ‘সরাসরি সম্পৃক্ততা ও দুষ্কর্মে সহযোগিতার’ বিষয়টি স্বীকার করে নিল বলেও এতে মন্তব্য করা হয়।
“এটা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, অন্যায়ভাবে দণ্ডিত অপরাধীদের পক্ষ নিয়ে পাকিস্তানেএ ধরনের মন্তব্য করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার আশা করে যে পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ দায়িত্বশীল আচরণ করবে এবং এধরনের অনধিকারচর্চামূলক বিবৃতি দেওয়া থেকে বিরত থাকবে।”
যুদ্ধাপরাধী নিজামীর দণ্ড কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়া ‘সম্পূর্ণ স্বাধীন, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও উন্মুক্ত বিচারিক প্রক্রিয়ার’ মাধ্যমে হয়েছে বলেও জানানো হয় প্রতিবাদপত্রে।
আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারকে ‘বিতর্কিত বিচার’ তকমা দেওয়ায় পাকিস্তানের চেষ্টার প্রতিবাদ জানিয়ে এতে দৃঢ়ভাবে বলা হয়, “একটি সার্বভৌম দেশের স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা নিয়ে পক্ষপাতদুষ্ট, ত্রুটিপূর্ণ ও ভিত্তিহীন মন্তব্য করার কোনো সুযোগ পাকিস্তানের নেই।”
১৯৭৪ সালের ত্রিপক্ষীয় চুক্তি নিয়ে পাকিস্তান তাদের প্রতিক্রিয়ায় বিভ্রান্তিকর ও পক্ষপাতদুষ্ট মন্তব্য করেছে বলেও হাইকমিশনারকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়।
“সুপ্রতিবেশীসুলভ ও শান্তিপূর্ণ সহ অবস্থানের পরিবেশ তৈরিতে প্রয়োজনীয় উদ্দীপনার জন্য ওই চুক্তি করা হয়েছিল। যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার পরিকল্পনাকারী ও দালালরা দায়মুক্তি ভোগ করবে বা বিচার এড়িয়ে যাবে চুক্তিটিতে এরকম কিছুর ইঙ্গিত কখনই ছিল না।”
বরং একাত্তরে চিহ্নিত পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বাধ্যবাধকতা থাকার পরও তাদের বিচারের আওতায় আনতে দেশটিতে ‘ব্যর্থ’ বলা হয় বাংলাদেশের প্রতিবাদপত্রে।
আপনার মন্তব্য