সিলেটটুডে ডেস্ক

২১ অক্টোবর, ২০১৮ ২০:৩৮

বাংলাদেশ-বন্ধু ফাদার রিগন বাংলাদেশেই সমাহিত

মৃত্যুর এক বছর পর বাংলাদেশে সমাহিত হলেন বাংলাদেশ-বন্ধু ইতালির নাগরিক ফাদার মারিনো রিগন। তার ইচ্ছাপূরণ করল বাংলাদেশ সরকার; চেয়েছিলেন তিনি বাংলাদেশেই সমাহিত হওয়ার।

২০১৭ সালের ২০ অক্টোবর ৯২ বছর বয়সে বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ইতালিতে মারা যান ফাদার রিগন। ঠিক এক বছর পর তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকারের সহায়তায় ইতালি থেকে তার মরদেহ ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায় রোববার ভোর পাঁচটায়। সেখান থেকে একটি হেলিকপ্টারে করে তাকে মোংলার শেখ রাসেল স্টেডিয়ামে নিয়ে যাওয়া হয় সকাল পৌনে ১০টায়।

এরপর ট্রাকে শোক র‍্যালি সহকারে পৌর এলাকা ঘুরে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় উপজেলা পরিষদের মাঠে। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সেখানে প্রথমে তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানো হয়। এরপর দুপুর ১২টায় তার প্রতিষ্ঠিত সেন্ট পলস হাসপাতাল ও সেন্ট পলস উচ্চবিদ্যালয়ে তাকে নিয়ে যাওয়া হলে হাসপাতালের সংশ্লিষ্টরাসহ স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ফুল দিয়ে তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। এরপর বেলা তিনটায় সেন্ট পলস গির্জার সামনে তাকে সমাহিত করা হয়।

ইতালি থেকে ফাদার রিগন বাংলাদেশে এসেছিলেন ১৯৫৩ সালে। খ্রিষ্টধর্ম প্রচারের পাশাপাশি মানুষের সেবা করতেন। এরপর অসুস্থ হয়ে ২০১৪ সালে ইতালি যাওয়ার আগে ৬১ বছর ধরে বাংলাদেশে ছিলেন। এই ৬১ বছরের কিছু সময় ছাড়া পুরো সময়টি কাটিয়েছেন মোংলার শেলাবুনিয়া গ্রামে।

বাংলাদেশে আসার পর থেকে নিরলসভাবে মানবকল্যাণে কাজ করে গেছেন। এই ছয় দশকে শিক্ষা বিস্তারে অতুলনীয় অবদান, বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বের দরবারে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়া আর মুক্তিযুদ্ধের সময় অসামান্য অবদানের জন্য বাংলাদেশের মানুষের মনের খুব গভীরে স্থান করে নিয়েছিলেন তিনি। ইতালির নাগরিক হয়েও যিনি মনেপ্রাণে একজন খাঁটি বাঙালি হয়ে ওঠেছিলেন।

১৯৫৩ সালে বাংলাদেশে আসার পর বিশপ দান্তে নির্দেশ দিলেন, মোংলায় গিয়ে একটি উচ্চবিদ্যালয় আর একটি চার্চ প্রতিষ্ঠার জন্য। এ সিদ্ধান্তই রিগনের জীবনে নতুন পরিবর্তন নিয়ে এল। তিনি স্থায়ী নিবাস গড়ে তুললেন সুন্দরবন–সংলগ্ন মোংলার শেলাবুনিয়া গ্রামে।

মোংলার সেন্ট পলস উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় নিজে মাথায় করে ইট বয়ে নিয়ে গেছেন। সেন্ট পলস থেকে শুরু করে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে তার সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া হাজার হাজার দরিদ্র ছাত্রছাত্রীকে স্পন্সরশিপ প্রোগ্রামের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন পড়াশোনার সুযোগ করে দিয়েছিলেন তিনি।

যুদ্ধকালীন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাসেবা, শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় দেওয়াসহ বিভিন্নভাবে মুক্তিযোদ্ধা ও নিরস্ত্র বাঙালিদের তিনি সহায়তা করেছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের জন্য যারা বিশেষ অবদান রেখেছিলেন, সেই বিদেশি বন্ধুদের বাংলাদেশ সরকার বিশেষ সম্মাননা প্রদান করেছে। ২০১২ সালে ফাদার রিগন সম্মাননায় সম্মানিত হয়েছেন।

বাংলাদেশ সরকার ২০০৮ সালে ফাদার রিগনকে এ দেশে তার সৃজনশীল, শিক্ষামূলক ও মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রদান করেছিল বাংলাদেশের সম্মানসূচক নাগরিকত্ব।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত