০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:৪৯
চারদিকে বর্জ্য আর ঘাস- দেখে কে বলবে কয়েক বছর আগেও এটি বিরাট এক বিল ছিলো। বিলে সরু খালের মতো পানির ক্ষীণ ধারা আছে বটে, তবে সে পানির রং কুচকুচে কালো। মাছ তো নয়, কোন জলজ প্রাণিরই অস্থিত্ব নেই পানিতে।
এমন অবস্থা সিলেটের দক্ষিণ সুরমার ভাড়েরা বিলের। এই বিলের পাশেই পারাইচকে সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) বর্জ্যের ডাম্পিং গ্রাউন্ড। এই গ্রাউন্ড থেকে বছরের পর বছর ধরে বর্জ্য এসে পড়ে পাশের হাওর ও বিলে। ফলে এগুলো ভরাট হয়ে পড়েছে। দূষিত হয়েছে পরিবেশ।
এই বিল আর হাওর ছিলো আশপাশের অন্তত ১০ টি গ্রামের মানুষের ধান, মাছ ও পানির অন্যতম উৎস। তবে এখানে এখন ধান বা মাছ কিছুই হয় না। পানিও ব্যবহার অনুপযোগী।
যদিও সিটি করপোরেশন বলছে, ডম্পিং স্টেশনের চারপাশে এখন রিটেনিং ওয়াল দেওয়া হয়েছে। ফলে এখন আর বর্জ্য ডাম্পিং স্টেশনের বাইরে যায় না। এছাড়া আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে নগরে দেশের প্রথম 'বায়োড্রায়িং প্ল্যান্ট' স্থাপন করা হচ্ছে। উন্নত প্রযুক্তির এই প্ল্যান্টটি বাস্তবায়িত হলে নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তনের পাশাপাশি বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন করা সম্ভব হবে।
তবে স্থানীয়রা বলছেন, রিটেনিং ওয়াল স্থাপন করা হলেও আগের কয়েকশ’ টন বর্জ্য এখনও স্তুপ আকারে বিল ও হাওরে জমা হয়েছে।
ভাড়েরা বিলের রক্ষার জন্য দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চালিয়ে আসছেন বিলের পাশ্ববর্তী গঙ্গারামের চক গ্রামের বাসিন্দা সমাজকর্মী শামীম কবির।
তিনি বলেন, সিসিকের বর্জ্যের কারণে ভাড়ের বিল ও আশপাশের ৫/৬ টি হাওর একেবারে বিলীন হয়ে গেছে। প্রায় ২০ একরের বিলের ১৫ একরই ভরাট হয়ে গেছে। বাকি অংশে সামান্য পানি থাকলে তা কুচকুচে কালো। এখানে কোন মাছ হয় না। কোন ধান চাষ করা যায় না। অথচ সিসিকের বর্জ্য তাদের ডাম্পিং গ্রাউন্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে এই ক্ষতি হতো না।
তিনি বলেন, বিল ও হাওর রক্ষা এবং পরিবেশের সুরক্ষায় আমরা মন্ত্রী, মেয়র, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন জায়গায় ধর্ণা দিয়েছি। কিন্তু কোন লাভ হয়নি।
এই বিলের চারপাশে রয়েছে অন্তত ৫ টি মৎস্যজীবী গ্রাম। এসব গ্রামের ৯০ শতাংশেরই পেশা ছিলো মাছ চাষ। কিন্তু এখন বাধ্য হয়ে পেশা বদলাতে হচ্ছে গ্রামবাসীদের।
তেমনই একটি গ্রাম ছিটা গোটাটিকরের একাধিক বাসিন্দা বলেন, ১০ বছর আগেও এই বিল থেকে বছরে কয়েক টন মাছ উৎপাদন হতো। এখানে প্রায় ২ হাজার একর জমিতে ধান চাষ হতো। এখন ধান মাছ কিছুই নেই। পানিও নেই। বর্ষা মৌসুমেও পুরো বিল হেঁটে পার হওয়া যায়।
তারা বলেন, হাওরে কেবল বর্জ্যের স্তুপ। কোন কৃষক হাওরে নামলেও কাচে পা কেটে যায়। প্লাস্টিকে ভরে গেছে হাওর ও বিল।
স্থানীয় কুচাই ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক মেম্বার সবুজ কুমার বিশ্বাস বলেন, কয়েক বছর আগেও ধরনের বক, কাক, পানকৌড়ি, চিল সহ পাখ-পাখালির কলকাকলিতে মুখরীতে থাকতে বিলটি। প্রতিবছর পলোভাওয়া উৎসব হতো। বিলের পানি দিয়ে কৃষকরা ধান চাষ করতেন, মৎস্যজীবীরা মাছ ধরতেন। কিন্তু আজ সেই বিলের কোন অস্তিত্ব নেই। বর্তমান প্রজন্ম ভাড়েরা বিলটি চিনবে না এমন অবস্থায় পরিনত হয়েছে।
তিনি বিলটি খনন, পাড় বাঁধাই, তালাগাছ রোপন ও যুগোপযোগী পরিবেশ বান্ধব পরিবেশ তৈরী করার দাবি জানান।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এই বিল ভরাটের কারণে ক্ষতির মুখে পড়েছেন আলমপুর, মনিপুর, ছিটা গোটাটিকর, গঙ্গা রামেরচক, গোটাটিকর, হবিনন্দী, গঙ্গানগর, পালপুর, কুচাই, শ্রীরামপুরসহ অন্তত ১০ এলাকার মানুষ।
সিলেট সিটি করপোরেশনে (সিসিক) সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১০ লাখ মানুষের নগরী সিলেটে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে ২৫০ থেকে ৩০০ টন বর্জ্য সংগ্রহ করে দক্ষিণ সুরমার পারাইচক ডাম্পিং গ্রাউন্ডে নেওয়া হয়। এই বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে সিলেট সিটি করপোরেশন ও লাফার্জ হোলসিম বাংলাদেশ’র যৌথ উদ্যোগে প্রায় ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা হয়েছে অত্যাধুনিক ও দেশের প্রথম ‘ম্যাটেরিয়াল রিকভারি ফ্যাসিলিটি’ (এমআরএফ) প্লান্ট।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে উদ্বোধন হওয়া এই প্লান্টে বর্তমানে প্রতিদিন ১৫০ থেকে ৩০০ টন বর্জ্য পৃথকীকরণ করা হচ্ছে। এখান থেকে প্লাস্টিক ও পলিথিন আলাদা করে পুনর্ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
প্রকল্পটির মাধ্যমে নগরীর বর্জ্যকে পৃথক করে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান উদ্ধার, পরিবেশ দূষণ কমানো এবং ডাম্পিং স্টেশনের ওপর চাপ হ্রাসের কথা ছিল। তবে উদ্বোধনের প্রায় দেড় বছর পর বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা।
প্ল্যান্টে পৃথক করা বিপুল পরিমাণ বর্জ্যের বড় অংশ এখনো ডাম্পিং স্টেশনে জমা হচ্ছে। যা ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের বিল, হাওর ও কৃষিজমিয়ে। আর প্ল্যান্ট থেকে নির্গত কালো বিষাক্ত পানি এবং ডাম্পিং স্টেশনের বর্জ্য বৃষ্টির পানিতে মিশে আশপাশের কৃষিজমি ও জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ায় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে।
সিসিকের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৭০ টন প্লাস্টিক ও পলিথিন আলাদা করে ছাতকের লাফার্জ সিমেন্ট কারখানায় পাঠানো হচ্ছে। এসব বর্জ্য সেখানে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
তবে সমস্যা তৈরি হচ্ছে অবশিষ্ট বর্জ্য নিয়ে। পৃথকীকরণের পরও বিপুল পরিমাণ প্রক্রিয়াজাত বর্জ্য ডাম্পিং স্টেশনেই স্তূপাকারে জমা রাখা হচ্ছে। একই স্থানে অপ্রক্রিয়াজাত বর্জ্যও ফেলা হচ্ছে। ফলে বর্জ্যের পাহাড় দিন দিন আরও বড় হচ্ছে।
এব্যাপারে পরিবেশবাদী সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) সিলেটের সদস্য সচিব আব্দুল করিম কিম বলেন, সিটি করপোরেশনকে যেখানে হাওর ও বিল রক্ষা করার কথা সেখানে তারাই এগুলো ধংস করছে। এভাবে অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে কেবল ধান আর মাছেরই নয়, পরিবেশ আর জনস্বাস্থ্যেরও বিরাট ক্ষতি হচ্ছে।
তিনি বলেন, নগরের কিছু মানুষের সুবিধার জন্য নগরের বাইরের বিপুল সংখ্যক মানুষকে বিপদে ফেলা হচ্ছে।
তবে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ একলিম আবেদীন বলেন, আগে অনেক বর্জ্য আশপাশের হাওর ও বিলে ছড়িয়ে পড়তো। এখন আর তা হচ্ছে না। এখন আমরা ডাম্পিং ইয়ার্ডের চারপাশে সীমানা দেয়াল দিয়ে দিয়েছি। তবে বর্ষাকালে পানির সাথে দেয়াল উপচে কিছু বর্জ্য যেতে পারে।
তিনি জানান, বর্তমানে প্রতিদিন ১৫০ টনের বেশি বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে এবং প্রায় ৫০ টন প্লাস্টিক আলাদা করা সম্ভব হচ্ছে। লাফার্জ হোলসিম বাংলাদেশ প্লান্টের কারিগরি সহায়তা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করছে।
এ ব্যাপারে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণের কারণে এখন আর বর্জ্য ডাম্পিং ইয়ার্ডের বাইরে যায় না।
তিনি বলেন, সিলেটে দেশের প্রথম 'বায়োড্রায়িং প্ল্যান্ট' স্থাপন করা হচ্ছে। উন্নত প্রযুক্তির এই প্ল্যান্টটি বাস্তবায়িত হলে নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তনের পাশাপাশি বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন করা সম্ভব হবে।
এদিকে, সম্প্রতি নগরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিদর্শনে এসে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, সিলেট সিটি করপোরেশনের সাথে লাফার্জ সুরমা হোলসিমের সাথে একটি প্রকল্প ২০২৪ সালে চালু হয়। তবে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি। এখন থেকে চালু হবে। এখন থেকে সিলেট নগরের বর্জ্য পরিশোধন করে প্লাস্টিক অংশ লাফার্জ সুরমা নিয়ে গিয়ে জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করবে। আর বাকী বর্জ্য সিটি করপোরেশন জৈব সার হিসেবে পরিণত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
আপনার মন্তব্য