২৯ জুলাই, ২০১৫ ২২:০৪
বর্তমানে দেশে বাঘের সংখ্যা ১০৬। ক্যামেরা ট্র্যাপিং পদ্ধতি ব্যবহার করে সর্বশেষ বাঘ গণনায় চলতি বছর এ তথ্য পাওয়া গেছে, যা ২০০৪ সালের শুমারিতে পাওয়া বাঘের সংখ্যার মাত্র এক-চতুর্থাংশ। এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে পরিবেশ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর মন্তব্য- "পয়সা দিছে লেইখা দিছি ৪৪০ টা , তাই না...এটা বাস্তব।" ফলে জরিপ নিয়ে প্রশ্ন উঠাটাই স্বাভাবিক!
এর আগে ইউএনডিপি, বাংলাদেশ ও ভারতের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ২০০৪ সালে দেশে বাঘশুমারি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বাঘের সংখ্যা ছিল ৪৪০। এর মধ্যে বাঘ ছিল ১২১টি, বাঘিনী ২৯৮টি ও বাঘের শাবক ২১টি। সেবার বাঘের পায়ের ছাপ চিহ্নিত করে প্রাণীটির সংখ্যা গণনা করা হয়, যা পগমার্ক পদ্ধতি বলে পরিচিত।
তবে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ‘ক্যামেরা পদ্ধতিতে সুন্দরবনের বাঘ গণনা জরিপ ২০১৫’ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জরিপ শেষে বাঘের যে সংখ্যা জানানো হয়েছে, তা নির্ধারণে ক্যামেরা পদ্ধতি ছাড়াও পুরনো পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে। বাংলাদেশের সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা মোট ১০৬টি দাবি করলেও ক্যামেরা পদ্ধতিতে মাত্র ৩৮টি বাঘ নির্ধারণ করা গেছে। বাকি ৬৮টি বাঘের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে পুরনো পদ্ধতিতে অর্থাৎ পায়ের ছাপ গুনে ও বিচরণের তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে।
এছাড়াও পায়ের ছাপ গুনে বাঘের সংখ্যা নির্ধারণ পদ্ধতিটি যথেষ্ট বিজ্ঞানসম্মত ও আন্তর্জাতিক মান সম্পন্ন নয় বন বিভাগ এমন দাবি করলেও তারা সেই পদ্ধতিতেই বাঘের সংখ্যা নির্ধারণ করেছে।
সুন্দরবনের বাঘ গণনা জরিপ ২০১৫ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এই তথ্য পাওয়া গেছে।
সম্প্রতি সিলেট সার্কিট হাউসে 'ভূমিসন্তান, বাংলাদেশ' নামক একটি পরিবেশবাদী সংগঠনের সাথে সাক্ষাতকালে বন ও পরিবেশ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, "বাঘ রক্ষা করার জন্য আমাকে ১৩শ' মিলিয়ন (থার্টিন হান্ড্রেড মিলিয়ন ডলার) দিছে। আমি বক্তৃতায় বলছি যেখানে মানুষ রক্ষা করতে পারতেছিনা, এত্ত মানুষ...সেখানে আমি চারশো বাঘ রক্ষা করব? সুন্দরবনের মধ্যে বাঘে আর মানুষে ঘুমায়।... সুন্দরবনের মধ্যে মানুষ বসবাস করে। ধর তুমি বাঘ আমি মানুষ। বাঁচার অধিকার কার প্রথম? আমার। এখন যে দুই চারশো আছে...আল্লাহ জানে কত আছে। পয়সা দিছে লেইখা দিছি ৪৪০ টা । তাই না...এটা বাস্তব।"
সুন্দরবনে বাঘের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করতে ২০১৩ সালে ক্যামেরা পদ্ধতিতে গণনা জরিপ শুরু করে বন বিভাগ। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় তিন বছর পর ২০১৫ সালের মার্চে জরিপ শেষ হয়। বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ও বাঘ গণনা জরিপের প্রধান জাহিদুল কবীর জানিয়েছেন, বিশ্বব্যাংকের দুই কোটি পঁচিশ লাখ টাকা বাজেট থাকলেও খরচ হয়েছে দুই কোটি টাকা। এই জরিপে বন বিভাগকে কারিগরি সহায়তা দিয়েছে ভারতের বন্য প্রাণী ইনস্টিটিউট।
এর আগে সর্বশেষ ২০০৪ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সহায়তায় বাঘের পায়ের ছাপ গুনে ও বিচরণের তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে জরিপ করেছিল বন বিভাগ। এতে বাঘের সংখ্যা এসেছিল ৪৪০টি। এ বছর নতুন এই জরিপের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগের ওই জরিপটি যথেষ্ট বিজ্ঞানসম্মত ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে করা হয়নি। ফলে আগের ওই বাঘের সংখ্যা সঠিক নয়। এমন কথা বললেও এবারের জরিপে একই পদ্ধতিতে ৬৮টি বাঘের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে জরিপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রাণী বিশেষজ্ঞরা।
প্রাণী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড আনিসুজ্জামান খান বলেন, ‘প্রতিবেদনটি কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ পায়ের ছাপ ও লোকাল পদ্ধতিতে জরিপের তথ্যও এতে উপস্থাপন করা হয়েছে। পুরনো পদ্ধতিতে ৬৮টি বাঘের বিচরণ পাওয়া গেছে। আর বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে আন্তর্জাতিক মানের ক্যামেরা ট্র্যাপিং জরিপের মাধ্যমে মাত্র ৩৮টি বাঘ পাওয়া গেছে। ফলে বন বিভাগ যে তথ্য উপস্থাপন করেছে তা আন্তর্জাতিক মানের সাথে সাংঘর্ষিক।’
আনিসুজ্জামান বলেন, ‘এটি আসলে প্রকৃত শুমারি নয়। কারণ বাঘ জরিপে প্রত্যেকটি বাঘের কাছে যাওয়া উচিত। কিন্তু এখানে তা করা হয়নি। তাই বলা যায় এটি একটি অস্পষ্ট প্রতিবেদন। ধরুন শীতলক্ষা নদী ১০ কিলোমিটার হলে এর পানির অবস্থা জানতে কিন্তু ১০ কিলোমিটার পানি তুলে আনার প্রয়োজন নেই। এটার ১০ স্থানের পানির নমুনা নিলেই পানির অবস্থা জানা সম্ভব। যাকে বলা হয় নমুনা পরীক্ষা। বাঘ জরিপের ক্ষেত্রেও এই নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। যার মাধ্যমে বাঘের আসল সংখ্যা নির্ধারণ করা সম্ভব না। কারণ পুরো সুন্দরবনে কিন্তু জরিপ করা হয়নি, শুধু কয়েকটি স্পটে ক্যামেরা ট্র্যাপিং করা হয়েছে। ’ বিচ্ছিন্নভাবে এই জরিপ পরিচালনা না করে পুরো সুন্দরবন জুড়ে ক্যামেরা ট্রাপিংয়ের বিষয়টি সম্পন্ন করা যেত বলে মনে করেন তিনি।
এই প্রতিবেদন নিয়ে সন্তুষ্ট ও প্রকৃত চিত্র এসেছে কিনা বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ও বাঘ গণনা জরিপের প্রধান জাহিদুল কবীরের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রতিবেদনটি ঠিকই আছে। আমাদের হাতে যে প্রযুক্তি আছে তা দিয়ে চেষ্টা করেছি সঠিক তথ্য তুলে ধরতে।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের অংশে সুন্দরবনে ৮৩ থেকে ১৩০টি বাঘ প্রাক্কলন করা হয়েছে। তবে মধ্যবর্তী সংখ্যা হিসেবে ১০৬টি নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া ভারত ও বাংলাদেশের অংশে সর্বমোট ১৭০টি বাঘ রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে। এতে আরো বলা হয়, ভারতের অংশে প্রতি ১০০ বর্গকিলোমিটারে ৪টি বাঘ পাওয়া যায় আর বাংলাদেশের অংশে ২টি।
বন বিভাগের প্রতিবেদন সম্পর্কে প্রাণী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ফিরোজ আহমেদ বলেন, ‘এটার সাথে অনেক বিষয় সম্পৃক্ত। ১৯৭২ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত সে জরিপ করা হয়েছে তা কিন্তু ধারণাভিত্তিক। আমরা বাঘ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কথা বলে আসছি। বিভিন্ন সময়ে যা তথ্য উঠে এসেছে তা নিয়ে আমরা বলেছি তা ঠিক না। তবে ধারণা পাওয়া যায়।’
বাঘের সংখ্যা বাড়ছে না কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যেসব কারণে বাঘ কমছে বলে চিহ্নিত করা হয়েছে তা যদি বন্ধ করা যায়, তবে দ্রুতই আমাদের বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। চোরা শিকারির কারণে বাঘের সংখ্যা কমে এটা চিহ্নিত। এটা যদি কন্ট্রোল করা যায় তবে বাঘ বৃদ্ধি পাবে।’
তবে ক্যামেরায় ছবি তুলে ২০০৬ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মনিরুল হাসান খান ব্রিটিশ জুয়োলজিক্যাল সোসাইটির সহায়তায় সুন্দরবনে বাঘ গণনা জরিপ করেন। তাতে বাঘের সংখ্যা ছিল ২০০টি। সেই হিসাবে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা গত নয় বছরে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এছাড়া ২০১০ সালে বন বিভাগ ও ওয়াইল্ড লাইফ ট্রাস্ট অব বাংলাদেশ যৌথভাবে সুন্দরবনের খালে বাঘের বিচরণ পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে একটি জরিপ করে। এতে বাঘের সংখ্যা ৪০০ থেকে ৪৫০টি বলে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে নতুন এই প্রতিবেদনটি সন্তোষজনক কি না এবং বাঘ কমে যাওয়ার বিষয়টি কতটুকু যুক্তিযুক্ত জানতে চাইলে ড. মনিরুল বলেন, ‘আগে যে পদ্ধতিতে জরিপ করা হতো তা আমাদের কাছে কখনো গ্রহণযোগ্য ছিল না। এই প্রতিবেদনটি সঠিক সংখ্যার কাছাকাছি আছে বলে মনে হচ্ছে। এই পদ্ধতিটি বিজ্ঞান সম্মত।’
বাঘ গণনা জরিপের প্রধান জাহিদুল কবীর জানান, বাঘের সংখ্যা নিরূপনে জেনেটিক কোডিংয়ের কাজ চলছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর আজিজ জেনেটিক প্রোফাইলের কাজটি করছেন। আমরা সেই ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করছি। এতে বাঘের সঠিক সংখ্যাও বের করা সম্ভব হবে।
জরিপে কয়টা নারী বাঘ পাওয়া গেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা আসলে ওরকম না, মোটামুটি একটা চিত্র পেয়েছি। এরমধ্যে ৩০ শতাংশ নারী, বাকিগুলো পুরুষ।’
২০০৪-২০১৫ এই ১১ বছরে বাঘের বৃদ্ধি ঘটেনি কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাড়বে কিভাবে, আমরা তো বাঘের সংখ্যা আকাশে তুলে রেখেছিলাম। প্রকৃত সংখ্যা তো নেই। সুন্দরবনে কখনো ২০০ থেকে ২৫০ বাঘের ক্যাপাসিটিও নাই, তাহলে ৪০০ হবে কি করে?
জরিপে যে চিত্র ওঠে এসেছে তা গ্রহণযোগ্য কিনা জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, বাঘের সঠিক চিত্র নির্ধারন করা বিগত সময়ে সম্ভব হয়নি। কেউ কেউ বলছে ২০০ বা বেশি কিন্তু আমরা কখনো সংখ্যার কথা বলিনি। এবার ৩৮টি ছবি পাওয়া গেছে। আমরা ১০ বছর পর যদি আবার আরেকটা পদ্ধতিতে দেখি ৩৮টি বাঘ আছে। তখন আমরা কি বলব।
তাহলে কী করণীয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাঘ বাঁচাতে আমাদের যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। বাঘের ওপর চোরাগোপ্তা হামলা, বাঘের খাদ্য হরিণ শিকার এসব বিষয়ে আমাদের স্বাধীন ও শিকারবিরোধী ইউনিট গড়ে তুলতে হবে। নেপালে যেভাবে আর্মিকে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট দিয়ে দিয়েছে। এভাবেই সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার করে সুন্দরবনকে বাঘের অভয়াশ্রমে পরিণত করতে হবে। বাঘের মতো এমন একটা প্রাণী হারিয়ে যাবে যদি এখনই সংরক্ষণ না করা হয়।
বাঘের প্রজনন প্রসঙ্গে আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, প্রজনন করার প্রয়োজন নেই। তাদের প্রাকৃতিক খাবার দেয়া হোক। হরিণ তাদের মূল খাবার, হরিণ শিকার বন্ধ করা হোক।
বাঘ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মনিরুল হাসান খান বলেন, ‘সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা আগের চেয়ে কমেছে, এটা বোঝাই যাচ্ছে। চোরা শিকারিদের তৎপরতা, নৌযান চলাচল বাঘের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য কয়লাও সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে আনার কথা আমরা শুনছি। এটা আরও ঝুঁকিতে ফেলবে। যে বাঘ আমাদের জাতীয় প্রাণী, আমাদের গর্ব, ক্রিকেট দলের লোগো, সেই বাঘকে বাঁচাতে হলে আমাদের জাতীয়ভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। বর্তমান ধারায় চললে সুন্দরবনে যে কটি বাঘ আছে, তাকে টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।’
ভিডিও :
আপনার মন্তব্য