১০ আগস্ট, ২০১৫ ১২:৫১
দৈনিক জনকণ্ঠের সম্পাদক-প্রকাশক ও নির্বাহি সম্পাদকের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননা সংক্রান্ত রিটের শুনানিতে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের ভূমিকা তথা প্রধানমন্ত্রী দপ্তর থেকে প্রধান বিচারপতিকে বিদেশে যেতে বাধা দেওয়া হয়েছিল কি না- তা জানতে চেয়েছেন আপিল বিভাগ। অ্যাটর্নি জেনারেলকে এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে জানাতে বলেছেন সর্বোচ্চ আদালত।
বিবাদীপক্ষ আপিল বিভাগের বিচারক এএইচএম শামসুদ্দীন চৌধুরীসহ চার জন বিচারককে সাক্ষী করার আবেদন করেছে। এর আগে গতকাল তারা আপিলের শুনানি থেকে প্রধান বিচারপতিকে বাদ দেওয়ার আবেদন করলে আদালত তা খারিজ করে দেন। আজ এ আপিলের শুনানি শেষ হয়েছে, রায় ঘোষণা করা হবে ১৩ আগস্ট।
সোমবার (১০ আগস্ট) জনকণ্ঠের আদালত আবমাননার মামলাটি প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন বৃহত্তর বেঞ্চে শুনানির জন্য প্রথমেই ছিল।
যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর চূড়ান্ত রায় প্রকাশের আগে আদালতের কথিত ভূমিকা নিয়ে দৈনিক জনকণ্ঠে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হলে ২৯ জুলাই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এই রুল জারি করে আপিল আদালত।
জনকণ্ঠ সম্পাদক আতিকউল্লাহ খান মাসুদ এবং নিবন্ধের লেখক নির্বাহি সম্পাদক স্বদেশ রায়কে এর ব্যাখ্যা দিতে ৩ অগাস্ট আদালতে হাজির হতে নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে তাদের আবেদনে বিষয়টি ৯ অগাস্ট শুনানির জন্য আসে।
বিবাদীপক্ষের আইনজীবী সালাউদ্দিন দোলন রবিবার আদালতে একটি আবেদন দাখিল করেন, যাতে প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে বেঞ্চ পুনর্গঠনের অনুরোধ জানানো হয়। আদালত তা নাকচ করে সোমবার বৃহত্তর বেঞ্চে বিষয়টি শুনানির জন্য রাখে।
সোমবার সকাল ৯টায় দুই সাংবাদিক ও তাদের আইনজীবীর উপস্থিতিতে এ বিষয়ে শুনানি শুরু হয়। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নিচ্ছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।
স্বদেশ রায়ের ওই নিবন্ধের একটি অংশে বলা হয়:
“এখানেই কি শেষ ৭১-এর অন্যতম নৃশংস খুনি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী। নিষ্পাপ বাঙালির রক্তে যে গাদ্দারগুলো সব থেকে বেশি হোলি খেলেছিল এই সাকা তাদের একজন। এই যুদ্ধাপরাধীর আপিল বিভাগের রায় ২৯ জুলাই। পিতা মুজিব! তোমার কন্যাকে এখানেও ক্রুশে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। তাই যদি না হয়, তাহলে কিভাবে যারা বিচার করছেন সেই বিচারকদের একজনের সঙ্গে গিয়ে দেখা করে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পরিবারের লোকেরা? তারা কোন পথে বিচারকের কাছে ঢোকে, আইএসআই ও উলফা পথে না অন্য পথে? ভিকটিমের পরিবারের লোকদেরকে কি কখনও কোন বিচারপতি সাক্ষাৎ দেয়। বিচারকের এথিকসে পড়ে! কেন শেখ হাসিনার সরকারকে কোন কোন বিচারপতির এ মুহূর্তের বিদেশ সফর ঠেকাতে ব্যস্ত হতে হয়। যে সফরের উদ্যোক্তা জামায়াত-বিএনপির অর্গানাইজেশান।”
অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আদালতের নির্দেশে এ অংশটি শুনানিতে পড়ে শোনান। প্রধানমন্ত্রী প্রধান বিচারপতিকে বিদেশে যেতে বাধা দিয়েছিলেন কি না- তা শুনানির এক পর্যায়ে অ্যাটর্নি জেনারেলকে জানাতে বলে আপিল আদালত।
এর আগে রবিবার এ রুলের শুনানিতে প্রধান বিচারপতি বলেছিলেন, আইন অনুযায়ী প্রধান বিচারপতির বিদেশ যাওয়ার বিষয়টি একান্তই তার নিজের এখতিয়ার। এমনকি উচ্চ আদালতের বিচারকসহ বিচার বিভাগের কোনো ব্যক্তির বিদেশ যাওয়ার বিষয়টিও প্রধান বিচারপতির এখতিয়ারের অন্তর্ভুক্ত।
“প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর সাবেক একাধিক প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বৈঠক করেছি। তাদের পরামর্শ নিয়েছি কিভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। ..প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়েছে। তিনি বিচার বিভাগ সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করেননি। তিনি বিচার বিভাগের ক্ষেত্রে নাক গলান না।”
প্রধান বিচারপতি বলেন, লন্ডনে বাংলাদেশি ছাত্রদের একটি সংগঠন থেকে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তারা টিকেট দিতে চাইলেও তিনি তা নেননি। সফরের বিষয়ে সব ঠিকঠাক করা হয়েছিল বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে। তবে শেষ পর্যন্ত ওই সফরে তার যাওয়া হয়নি। প্রধান বিচারপতির নির্দেশে তার একান্ত সচিব আনিসুর রহমান ওই সফর সংশ্লিষ্ট নথি রবিবার আদালতে উপস্থাপন করেন।
বিচারপতি এস কে সিনহা সে সময় শুনানিতে বলেন, “সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মামলা থেকে যদি প্রধান বিচারপতি নিজেকে প্রত্যাহার করে নিতেন তবে কারা লাভবান হত? শুনানি শেষে রায়ের আগে যদি প্রধান বিচারপতি সরে যেত তাহলে তো ওই মামলায় রায়ই হত না।”
অ্যাটর্নি জেনারেল তখন বলেন, “জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্যই এ নিবন্ধ লেখা হয়েছে। কাদের মোল্লার মামলায় রায় লিখেছেন আপনি। সাঈদীর মামলার রায়ও লিখেছেন। মুজাহিদ এবং সাকার মামলায় আমরা রায়ের অনুলিপির অপেক্ষায় আছি। আপনি অত্যন্ত সুচারূভাবে সালাউদ্দিন কাদেরের মামলাটি শেষ করেছেন। তারা তো এ মামলায় বিলম্ব করতে চেয়েছিল।”
এ মামলায় রুল দেওয়ার পর আদালতকে প্রভাবিত করার মতো কোন লেখা জনকণ্ঠে প্রকাশিত হয়েছে কি-না তাও সে সময় অ্যাটর্নি জেনারেলকে দেখতে বলেন প্রধান বিচারপতি।
আপনার মন্তব্য