১৭ আগস্ট, ২০১৫ ২১:০৫
বাবার মুক্তির জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেই শেষ ভরসা হিসেবে মনে করছেন প্রবীর সিকদারের ছেলে সুপ্রিয় সিকদার। নিজের ফেসবুক একাউন্টে তিনি তার বাবাকে ফিরিয়ে দিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর ওপর ভরসা করে সুপ্রিয় সিকদার লিখেন- ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি ব্যক্তিগতভাবে প্রবীর সিকদারকে চিনেন। শেষ ভরসা আপনি। আপনি চাইলেই হয়তো রহস্যের বেড়াজাল থেকে মুক্তি পাবে প্রবীর সিকদার।
যদি কিছু করতে না পারেন, তাহলে আমার মা, আমি, আর আমার ভাইকেও একটি মামলা দিয়ে কারাগারে প্রেরণ করেন।’
সুপ্রিয় প্রশ্ন রেখে লিখেন-‘আর কতো নির্যাতিত হবে সাংবাদিক প্রবীর সিকদার?? ৭১'এ বাবা-কাকাসহ হারিয়েছেন ১৩ জন নিকটাত্মীয়। ২০০১ সালে হারিয়েছেন নিজের একটি পা, বাম হাতের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা। সারা শরীরে বয়ে নিয়ে বেড়াতে হয় শত শত বোমার স্প্লিন্টার।’
আক্ষেপ করে সুপ্রিয় সিকদার লিখেন- ‘দেশ কি দিয়েছে প্রবীর সিকদারকে ?? কেউ কি জানাবেন ??? হয়তো এটাও প্রবীর সিকদারের দেশকে ভালোবাসার ফসল।’
উল্লেখ্য, তথ্য প্রযুক্তি আইনের মামলায় গ্রেফতার সাংবাদিক প্রবীর সিকদারকে ফরিদপুর কারাগারে পাঠানো হয়েছে। সোমবার তাকে ফরিদপুর ১ নং আমলি আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানায় পুলিশ।
ম্যাজিস্ট্রেট শুনানি না করে তাকে জেল হাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রিমান্ড আবেদনের শুনানি হবে।
এর আগে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সাব ইন্সপেক্টর মুনির হোসেন প্রবীর সিকদারের ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করেন। রবিবার (১৬ আগস্ট) রাতে পত্রিকার অফিস থেকে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। এরপর ঢাকা থেকে ফরিদপুরের নিয়ে যাওয়া হয় তাকে।
জীবনহানির আশঙ্কা প্রকাশ করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রীসহ ৩ জনের নাম উল্লেখ করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ায় সাংবাদিক প্রবীর সিকদারের বিরুদ্ধে ফরিদপুরে তথ্য প্রযুক্তি আইনে মামলা করেন এডভোকেট স্বপন পাল। পরে ওই মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে ফরিদপুর পাঠানো হয়।
প্রবীর সিকদারের ছেলে সুপ্রিয় সিকদার রবিবার অভিযোগ করেছেন- স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মোশাররফ হোসেন প্রভাব খাটিয়ে স্বপন পাল নামক এক আইনজীবিকে দিয়ে মামলা করিয়েছেন। মন্ত্রী প্রবীর সিকদারকে অকথ্য ভাষায় গালগালও করেছেন বলে জানান তাঁর ছেলে।
রবিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে শেরে বাংলা নগর থানার এসআই জলিলের নেতৃত্বে একদল সাদা পোশাকের পুলিশ তাকে তুলে নিয়ে যায়। তখন তিনি তার নিজ দৈনিক বাংলা ৭১ ও অনলাইন পত্রিকা উত্তরাধিকার ৭১ নিউজ এর অফিসে কাজ করছিলেন। এরপর তাকে মিন্টু রোডের ডিবি কার্যালয়ে রাখা হয়। পরে গভীর রাতে তাকে নিয়ে ফরিদপুর রওয়ানা হয় পুলিশ।
আটকের পর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার (পশ্চিম) সাজ্জাদুর রহমান সন্ধ্যায় জানিয়েছিলেন, “প্রবীর সিকদারকে কোনো কারণে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়নি।”
“তিনি তার জীবন নিয়ে শঙ্কায় আছেন এবং পুলিশ তাকে সহায়তা করছে না এমন একটি ফেইসবুক স্ট্যাটাসের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে ডেকে আনা হয়েছে। পুলিশ তার কাছে জানতে চাইছে, কী কারণে তার জীবন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।”
তিনি ধনকুবের মুসা বিন শমসেরের যুদ্ধাপরাধে সম্পৃক্ততা এবং বাচ্চু রাজাকারকে নিয়ে অনেকগুলো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেন। লেখালেখির কারণে ২০০১ সালে আক্রমনের শিকার হয়ে তিনি পা হারাতে হয় প্রবীর সিকদারকে।
এছাড়াও তিনি ফরিদপুরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেয়াই (মেয়ের শ্বশুর) এলজিআরডি মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন কর্তৃক হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বাড়িঘর দখলের বিরুদ্ধে লেখালেখি করে আসছিলেন, যে অভিযোগটি প্রথমে করেছিল বৌদ্ধ খ্রীষ্টান ঐক্য পরিষদ। তাঁর এ লেখালেখির পর মন্ত্রী নিজেই বলেছিলেন- হিন্দু ঐ পরিবারটি ভারত চলে গেছে।
এর বাইরেও প্রবীর সিকদার সাম্প্রতিক সময়ে এমজিআরডি মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফের নির্বাচনী এলাকা ফরিদপুরের মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর সাম্প্রতিক সময়ের নির্যাতন নিপিড়নের বিরুদ্ধে লেখালেখি করে আসছিলেন।
সাম্প্রতিক সময়ে নিজের জীবন নিয়ে শঙ্কিতও ছিলেন প্রবীর সিকদার। গত ১০ আগস্ট এ নিয়ে ফেসবুকে দেয়া এক স্ট্যাটাসে প্রবীর সিকদার লিখেন-
“আমার জীবন শংকা তথা মৃত্যুর জন্য দায়ী থাকবেন :
১. এলজিআরডি মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন এমপি
২. রাজাকার নুলা মুসা ওরফে ড. মুসা বিন শমসের
৩. ফাঁসির দণ্ডাদেশ প্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী বাচ্চু রাজাকার ওরফে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এবং এই তিন জনের অনুসারী-সহযোগীরা।”
২০০১ সালে দৈনিক জনকণ্ঠের ফরিদপুর প্রতিনিধি থাকাকালে সন্ত্রাসীদের হামলায় মারাত্মক আহত হন তিনি। সেসময় একটি পা হারান প্রবীর সিকদার। এরপর দেশে বিদেশে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে দৈনিক সমকালে যোগ দেন প্রবীর সিকদার। এরপর তিনি কালেরকন্ঠে যোগ দেন।
বর্তমানে তিনি একটি দৈনিক ও একটি অনলাইন পত্রিকা চালান। জনকণ্ঠে থাকাকালীন তিনি ‘তুই রাজাকার’ শিরোনামে একটি ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। সেই প্রতিবেদেন তিনি বিশেষ কিছু ব্যক্তির মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার বিষয়ে লেখার কারণে তার উপর হামলা হয়।
আপনার মন্তব্য