১৬ অক্টোবর, ২০১৫ ০০:১২
অবশেষে ফিরিয়ে আনা হলো শিশু সামিউল আলম রাজন হত্যা মামলার প্রধান আসামী কামরুল ইসলামকে। বৃহস্পতিবার বিকেলে কামরুলকে নিয়ে সৌদি থেকে ঢাকায় পৌছেন তিন পুলিশ কর্মকর্তা। আলোচিত এই হত্যার ৩ মাস ৭ দিন পর অবেশেষে দেশে ফিরিয়ে আনা হলো প্রধান অভিযুক্তকে।
বৃহস্পতিবার বিকেল ২ টা ৫৭ মিনিটে বাংলাদেশ বিমানের ০৪০ উড়োজাহাজে করে পুলিশের তিন কর্মকর্তা হজরত শাহজালার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফেরেন। কাস্টমস ও ইমেগ্রেশনের প্রক্রিয়া শেষ করে বিকাল চারটার দিকে কড়া পুলিশি পাহারায় তাকে নিয়ে সিলেট চলে যায়। শুক্রবার তাকে আদালতে হাজির করা হতে পারে। রাজন হত্যার পর কয়েকজন অসাধু পুলিশ কর্মকর্তার সহায়তায় সৌদি আরবের জেদ্দায় পালিয়ে যান মামলার অন্যতম আসামি কামরুল ইসলাম। বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে বন্দিবিনিময় চুক্তি না থাকায় তাকে ফিরিয়ে আনা নিয়ে বিভিন্ন মহলে শঙ্কার সৃষ্টি হয়। তবে, হাল ছাড়েনি বাংলাদেশ পুলিশ। শেষ পর্যন্ত ইন্টারপোলের মাধ্যমে তাকে দেশের আনার প্রক্রিয়া শুরু করে তারা। এতে সার্সবিক হযোগিতা করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) নজরুল ইসলাম এ ব্যাপারে বলেন, ‘কামরুলকে ফেরত আনা নিয়ে অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। তবে ইন্টারপোলের সহযোগিতায় সেই সন্দেহ দূর হয়ে গেছে। সৌদি সরকার ইন্টারপোলের মধ্যস্থতায় ও বাংলাদেশের অনুরোধকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। তারা কামরুলকে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে প্রথম থেকেই ইতিবাচক ছিল। তবে বন্দিবিনিময় চুক্তি না থাকায় তারাও একটি ফরম্যাটের মাধ্যমে কাজটি সম্পন্ন করতে চেয়েছে।’
এআইজি বলেন, ‘গত ১২ জুলায় গ্রেফতার হওয়ার পর কামরুলকে আদালতের মাধ্যমে রিয়াদের একটি কারাগারে রাখে সৌদি পুলিশ। এতদিন সেখানেই ছিলেন কামরুল।’
সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের উপ-মিশন প্রধান নজরুল ইসলাম বলেন, ‘কামরুলকে ফেরত আনার জন্য ইন্টারপোলকে ব্যবহার করা হয়েছে। কারণ, বাংলাদেশ-সৌদি আরব দুদেশই সংস্থাটির সদস্য। কিন্তু গোটা ব্যাপারটি দুদেশের কর্মকর্তাদের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়।’ তিনি বলেন, ‘কামরুলকে বাংলাদেশের যে প্রতিনিধি দল তাকে ফেরত আনার জন্য গিয়েছিল তার কাছে হস্তান্তর করা হয়।’
পুলিশের একটি ঊর্ধ্বতন সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছে, সৌদিতে তার ওয়ার্কপারমিটের (কাজের বৈধতা) মেয়াদ শেষ হওয়ার সুযোগটিও তাকে ফেরত আনতে সহায়তা করেছে। আগামী ১৮ অক্টোবর তার ওয়ার্কপারমিটের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। কামরুলের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে শিশু হত্যার মামলা, ইন্টারপোলের নোটিশ ও তাকে ফেরত পাঠাতে বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধ ইতিবাচকভাবে বিবেচনায় নিয়েছে সৌদি। এ সব কারণেই নতুন করে আর তার ওয়ার্কপারমিটের মেয়াদ বাড়াবে না সৌদি সরকার। এর ফলে সৌদি অবস্থানই অবৈধ হয়ে যাবে কামরুলের। এমন সুযোগেই ইন্টারপোলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের হাতে তাকে তুলে দেয় সৌদি সরকার। বিষয়টিকে সরকারের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবেও বিবেচনা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পুলিশ সদর দফতরের এই আইজি নজরুল ইসলাম জানান, গত পাঁচ বছরে ইন্টারপোলের সহায়তায় বাংলাদেশ ১০ আসামিকে দেশে ফেরত নিয়ে এসেছে। তাদের মধ্যে কামরুল অন্যতম ও আলোচিত হত্যা মামলার আসামি।
উল্লেখ্য, গত ৮ জুলাই সিলেট সদর উপজেলার টুকের বাজার ইউনিয়নের কুমারগাঁওয়ে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয় পার্শ্ববর্তী কান্দিগাঁও ইউনিয়নের বাদেয়ালি গ্রামের শেখ আজিজুর আলমের বড় ছেলে শেখ সামিউল আলম রাজনকে। এরপর হত্যাকারীদের ধারণ করা ২৮ মিনিটের একটি ভিডিওচিত্র ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয় নিজেরাই। নির্যাতনের লোমহর্ষক সেই ভিডিও নজরে আসার পর তোলপাড় শুরু হয় সারাদেশে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও নির্যাতনের ঘটনাটি গুরুত্ব পায়। এরপর একে-একে এই ঘটনায় জড়িত সব আসামিকে আটক করে পুলিশের কাছে দেয় স্থানীয় জনতা।
৮ জুলাই সকালে হত্যার পর দুপুরে লাশ গুম করতে গিয়ে আটক হন কামরুলের ভাই মুহিত আলম। অভিযোগ রয়েছে, একইদিন কামরুলকেও আটক করে সিলেট মহানগরীর জালালাবাদ থানায় দিয়েছিলেন স্থানীয় জনতা। কিন্তু মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে কামরুলকে ছেড়ে দেয় পুলিশ। এরপরই সৌদি আরবে পালিয়ে যান কামরুল।
এই ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার কারণে জালালাবাদ থানার ওসি (তদন্ত) আলমগীর হোসেনসহ তিন পুলিশ সদস্যকে বরখাস্ত করা হয়। ১৩ জুলাই প্রবাসী বাংলাদেশিরা কামরুলকে আটক করে সৌদি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন। ২১ জুলাই ইন্টারপোল তার বিরুদ্ধে নোটিশ জারি করে।
এদিকে, কামরুল সৌদি আরবে পালিয়ে যাওয়ার পর সেখানে বসবাসরত বাঙালিরা তাকে আটক করেন। এরপর তারা বাংলাদেশ দূতাবাসকে জানান। বাংলাদেশ দূতাবাস কামরুল যে প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন, সেই প্রতিষ্ঠানকে জানায়। তখন ওই প্রতিষ্ঠান আটকের জন্য সৌদি পুলিশকে অনুরোধ করে। এরপর সৌদি পুলিশ তাকে আটক করে। আটকের পর বাংলাদেশ তাকে ফেরত চায়। এ সময় সৌদি সরকার কাগজপত্র চায় বাংলাদেশ সরকারের কাছে। এরপর বাংলাদেশ পুলিশ ইন্টারপোলের মাধ্যমে কামরুলের বিরুদ্ধে ২১ জুলাই রেড এলার্ট জারি করে। এই রেড এলার্টের বিষয়ে সৌদি সরকারের উচ্চ পর্যায়ে কামরুলকে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়।
১৬ আগস্ট মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিলেট মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ইন্সপেক্টর সুরঞ্জিত তালুকদার সৌদি আরবে আটক কামরুল ইসলামকে পলাতক দেখিয়ে ১৩ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। আদালতের নির্দেশে ২৫ আগস্ট পলাতক কামরুল ও তার ভাই শামীমের মালামাল জব্দ করে পুলিশ। চার্জগঠন শেষে ১ অক্টোবর থেকে এই মামলার বিচার কাজ শুরু হয়েছে।
কামরুল ছাড়া বিচারাধীন অন্য আসামিরা হলেন, সিলেট সদর উপজেলার কুমারগাঁও শেখপাড়ার মৃত আব্দুল মালেকের ছেলে সৌদি আরবে আটক কামরুল ইসলামের ভাই মুহিত আলম, আলী হায়দার ওরফে আলী ও শামীম আলম, দিরাইয়ের বাসিন্দা পাভেল ইসলাম, চৌকিদার ময়না মিয়া ওরফে বড় ময়না, জালালাবাদ থানার টুকেরবাজার ইউনিয়নের পূর্ব জাঙ্গাইল গ্রামের মোহাম্মদ নিজাম উদ্দিনের ছেলে ভিডিওচিত্র ধারণকারী নূর আহমদ ওরফে নূর মিয়া, দুলাল আহমদ, আয়াজ আলী, তাজ উদ্দিন বাদল, ফিরোজ মিয়া, আছমত আলী ওরফে আছমত উল্লাহ ও রুহুল আমিন ওরফে রুহেল।
সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন
আপনার মন্তব্য