নিজস্ব প্রতিবেদক:

১৮ ডিসেম্বর, ২০২১ ২২:১৫

মন্দায় আগর-আতর কারবার

মৌলভীবাজারের বড়লেখায়

বড়লেখা: আগর গাছের পুরোনো ক্ষতের অংশটুকু আলাদা করছেন শ্রমিকেরা। এগুলো জ্বাল দিয়ে আতর তৈরি করা হয়। সম্প্রতি সুজানগর এলাকা থেকে তোলা।

প্রায় ৩০০ বছর ধরে এলাকায় আগর-আতর একটি বুনিয়াদি ব্যবসা। কখনও জমজমাট, কখনও ভাটা। এভাবেই বংশপরম্পরায় এই ব্যবসা চলে আসছে। কিন্তু করোনা ভাইরাসের প্রভাবে টানা প্রায় দুবছর ধরে ব্যবসাটিতে মন্দা চলছে। উৎপাদিত পণ্য বিক্রি হচ্ছে না। বর্তমানে ব্যবসায়ীদের কাছে কোটি কোটি টাকার আগর-আতর পড়ে আছে। এতে বিপাকে পড়েছেন তারা। বেকার হয়ে পড়েছেন অনেক শ্রমিক। কবে এই ব্যবসাটিতে আগের প্রাণ ফিরবে, এ নিয়েই এখন সবার নীরব অপেক্ষা।

মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর আগর-আতর সুগন্ধির এই ব্যবসাটি মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার সুজানগরের প্রাণভোমরা। ব্যবসাটি করোনার থাবায় স্থবির হয়ে পড়েছিল। এখন সবকিছু ধীরে ধীরে সচল হলেও এই স্থবিরতা কাটছে না। সুজানগরে ফিরেনি হারানো প্রাণ।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে এই শিল্পের সঙ্গে ওই ইউনিয়নের প্রায় ৩০০ পরিবার জড়িত রয়েছে। কারো আছে আগরের গাছ। কেউ আগর গাছ কেনা-বেচা করেন। কেউ আগর কাঠ পৃথক করেন। কেউ চুল্লি ব্যবস্থাপনার সাথে যুক্ত। কেউ প্রক্রিয়াজাত আগর কাঠ ও আতর স্থানীয় উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে কিনে বিদেশে রপ্তানি করেন। এভাবে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার মানুষ আগর-আতরকেন্দ্রিক কাজে সংযুক্ত। ঘরে ঘরে আগরের কারবার। বিভিন্ন সময় নানা কারণে ব্যবসায় ভাটা পড়েছে। আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এই ধারাবাহিকতায় সুজানগরে গড়ে ওঠেছে ছোটবড় প্রায় ৩০০ কারখানা। এসব কারখানায় প্রায় ৫ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। সুজানগর ইউনিয়নের উৎপাদিত আগর-আতর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, মালয়েশিয়া, ওমান, ইয়েমেনসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে আগর-আতর রপ্তানি হয়ে থাকে।

বড়লেখা থেকে প্রতিমাসে প্রায় ১ হাজার লিটার শুধু আতর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়। পাশাপাশি আগরের কাঠও রপ্তানী হয়। প্রতি লিটারের আতরের বাজার মূল্য বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৮ লাখ টাকা। সেখানে চাহিদা ভালো থাকলে সুজানগরেও ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো চলে। বেশ কয়েক বছর ধরে ভালোই চলছিল। কিন্তু করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরু হলে সুজানগরেও তার ছায়া পড়ে। ব্যবসাতে ভাটা নামে। বিভিন্ন দেশের ক্রেতার আসা বন্ধ হয়ে যায়।

মধ্যপ্রাচ্যের বাজার বন্ধে সুজানগরও স্থবির হয়ে পড়ে। এতে কোটি কোটি টাকার আগর কাঠ ও আতর ঘরে ঘরে আটকা পড়েছে। প্রায় পাঁচ হাজারের মতো নারী-পুরুষ শ্রমিকের বেশির ভাগই বেকার হয়ে পড়েন। বেশিরভাগ কারখানাই বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় দুই বছর ধরে এই স্থবিরতা চলছে। সম্প্রতি করোনার প্রভাব কমে এসেছে। সবকিছু সচল হয়ে ওঠছে। কিন্তু আগর-আতরের ব্যবসার মন্দা এখনও কাটেনি। এর বড় কারণ, মধ্যপ্রাচ্যের বাজার এখনও খুলেনি। চাহিদা নেই। উৎপদিত পণ্যের বিক্রিও নেই।

সরেজমিন সুজানগর ইউনিয়নে গিয়ে দেখা গেছে, অধিকাংশ কারখানা বন্ধ। কয়েকটি কারখানা খোলা আছে। এসব কারখানায় শ্রমিকরা কাজ করছেন।

আগর-আতর শ্রমিক রুবেল আহমদ বলেন, আগে আগর-আতর ভালোই বেচাকেনা হত। আমাদের কাজ ছিল। করোনা শুরু থেকেই আগর-আতর বিকিকিনি নেই। অনেক কারখানাও বন্ধ। আমরাও বেকার। অনেক ব্যবসায়ীরা রীতিমতো গ্যাস বিলও দিতে পারছেন না।

ব্যবসায়ী আব্দুল বাতিন বলেন, প্রায় ১২-১৩ বছর থেকে আমি আগর-আতর ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। আমার কারখানায় প্রায় ১৫ জন শ্রমিক কাজ করেন। করোনার শুরু হওয়ার পর থেকে ফ্লাইট বন্ধ থাকায় আগর-আতর রপ্তানি কমতে শুরু করে। করোনার কারণে বিদেশেও এর চাহিদা কমেছে। আমার কাছে এখনও ১৫ লাখ টাকার আগর-আতর রয়েছে। আগর কাঠও আছে। বিক্রি করতে পারছি না। আগে আগর কাঠ, আতর বের হওয়ার আগেই বিক্রি হয়ে যেত। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা কিনে সৌদি, দুবাই, কাতারসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করেছে। এখন তারা রপ্তানি করতে পারে না। মধ্যপ্রাচ্যের বাজার নেই।

বাংলাদেশ আগর অ্যান্ড আতর ম্যানুফ্যাকচারার্স এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সভাপতি আনছারুল হক বলেন, করোনার প্রভাবে আগর-আতর ব্যবসা মন্দা চলছে। সব ব্যবসায়ীর কাছে প্রচুর আগর-আতর জমা আছে। বিক্রি করতে পারছেন না। তবে এই অবস্থা থাকবে না। এটি একটি সম্ভাবনাময় পণ্য। এটার ভবিষ্যৎ আছে। করোনা ওঠে গেলে আবার নতুনভাবে এই ব্যবসা জমে ওঠবে। সরকারও আগর-আতরকে শিল্প হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। বিশেষ বিসিক শিল্পনগরী তৈরির উদ্যোগ নিচ্ছে। প্রণোদনা দিচ্ছে। আবার ঘুরে দাঁড়াবে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত