নিজস্ব প্রতিবেদক:

২৬ ডিসেম্বর, ২০২১ ০২:১৭

বিদ্রোহীতে বিপাকে আওয়ামী লীগ

আজ রোববার চতুর্থ ধাপে সিলেট বিভাগের ৮২টি ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এই ইউনিয়নগুলোতে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৪২৭ জন প্রার্থী। সকল ইউনিয়নেই আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী আছেন। দলীয় এসব প্রার্থীদের চ্যালেঞ্জ করে বিভিন্ন ইউপিতে ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হয়েছেন দলটির ১০৫ জন নেতা।

দলীয় প্রার্থীর বিজয়ে এসব বিদ্রোহীরাই বড় রকমের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন; এমনটি মনে করছেন আওয়ামী লীগের তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকরা। তাদের আশঙ্কা সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বেশিরভাগ ইউপিতে নৌকার প্রার্থীদের ভরাডুবি হবে।

জানা গেছে, চতুর্থধাপে সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ উপজেলার বাঘা, গোলাপগঞ্জ, ফুলবাড়ী, লক্ষীপাশা, বুধবারিবাজার, ঢাকা দক্ষিণ, লক্ষণাবন্দ, ভাদেশ্বর, পশ্চিম আমুড়া, উত্তর বাদেপাশা, শরীফগঞ্জ ইউনিয়ন ও বিয়ানীবাজার উপজেলার আলীনগর, চারখাই, দুবাগ, শেওলা, কুড়ারবাজার, মাতিউরা, তিলপাড়া, মুল্লাপুর, মুড়িয়া, লাওতা ইউনিয়ন। মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার ফতেহপুর, উত্তরভাগ, মুনশীবাজার, পাঁচগাঁও, রাজনগর, টেংরা, কামারচাক, মনসুরনগর ইউনিয়ন ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলার খলিলপুর, মনুমুখ, কামালপুর, আপারকাবাগলা, আখাইলকুড়া, একাটুনা, চাদনীঘাঁট, কনকপুর, আমতৈল, নাসিরাবাদ, মুস্তফাপুর, গিয়াসনগর ইউনিয়ন। হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার লাখাই, মুড়াকুড়ি, মুড়িয়াউখ, বামৈ, করাব, বুল্লা (ইভিএম) ইউনিয়ন ও বানিয়াচং উপজেলার বানিয়াচং উ.পূ, বানিয়াচং উ.প, বানিয়াচং দ.পূ, দৌলতপুর, খাগাপাশা, বড়ইউড়ি, খাগাউড়া, পুকড়া, সুবিদপুর, মকরমপুর, সুজাতপুর, মন্দরি, মুরাদপুর, পৈলারকন্দি ইউনিয়ন। সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার কলকলিয়া, চিলাউড়া হলদিপুর, রাণীগঞ্জ, সৈয়দপুর শাহারপাড়া, আশারকান্দি, পাইলগাঁও, পাটলি ইউনিয়ন ও দিরাই উপজেলার রফিনগর, ভাটিপাড়া, রাজানগর, চরনারচর, দিরাই সরমঙ্গল, করিমপুর, জগদল, তাড়ল, কুলঞ্জ ইউনিয়ন ও বিশ্বম্বরপুর উপজেলার ফতেহপুর, বাধাঘাট দক্ষিণ, পলাশ, ধনপুর ও সলুকাবাদ ইউনিয়নে ভোট হচ্ছে।

সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলায় ৫৪ জন, বিয়ানীবাজার উপজেলায় ৪৭ জন, মৌলভীবাজার সদর উপজেলায় ৬০ জন, রাজনগর উপজেলায় ৩২ জন, সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই, বিশ্বম্ভরপুর ও জগন্নাথপুর—এই ৩ উপজেলায় ১৩২ জন, হবিগঞ্জের লাখাই ও বানিয়াচং উপজেলায় ১০২ জন প্রার্থী আছেন।

বিয়ানীবাজার ও গোলাপগঞ্জে চ্যালেঞ্জের মুখে নৌকার প্রার্থীরা

বিয়ানীবাজার ও গোলাপগঞ্জে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মোট ৬ জন। কিন্তু এসব ইউনিয়নগুলোতে স্বতন্ত্র (বিএনপি ও জামায়াত) প্রার্থীদের কারণে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও ভোটারের সাথে বলে জানা গেছে, ইউনিয়নগুলোতে প্রার্থী বাছাইয়ে আওয়ামী লীগের বেশ দুর্বলতা ছিল। যার ফলে ভোটের ফলাফলে একটা প্রভাব পড়বে। এছাড়া দলীয় প্রার্থীদের বিরুদ্ধে গিয়ে অনেক নেতার ‘গোপনে অন্য প্রার্থীর পক্ষে কাজ’, বিরোধীদের নৌকা বিরোধী প্রচারণাও তাদের পরাজয়ের কারণ হতে পারে।

সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও আওয়ামী লীগের সাবেক সাংসদ শফিকুর রহমান চৌধুরী জানিয়েছেন, বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

লাখাই ও বানিয়াচংয়ে বিদ্রোহীতে কোনঠাসা নৌকার প্রার্থীরা

দুই উপজেলায় ৩১ জন নেতা বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন। এসব (বিদ্রোহী) প্রার্থীর কাছে অনেকটা কোনঠাসা অবস্থানে রয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। ইউনিয়নগুলোর বেশিরভাগেই আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের ভরাডুবির শঙ্কা আছে। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় ইতিমধ্যে লাখাইয়ে ১৪ জন ও বানিয়াচংয়ে ১৭ জন নেতাকর্মীকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে জেলা আওয়ামী লীগ।

আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা-কর্মী জানিয়েছেন, দলীয়ভাবে বারবার নিষেধ করা সত্ত্বেও অনেকে বিদ্রোহী প্রার্থী হচ্ছেন। এমনকি এসব প্রার্থীর সঙ্গে দলের নেতা-কর্মীরাও নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন। অনেক স্থানে ত্যাগী ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত অনভিজ্ঞ ব্যক্তিও নৌকার মনোনয়ন পেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সেখানে বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় দলের প্রার্থীদের কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে হবে।

মৌলভীবাজারে বিদ্রোহী ও প্রবাসী দাপটে কোণঠাসা নৌকা

বিদ্রোহী আর প্রবাসীদের দাপটে কোণঠাসা নৌকার প্রার্থীরা। জনপ্রিয়তা ও ভোটের রাজনীতিতে বিদ্রোহী প্রার্থী এবং প্রবাসী প্রার্থীদের টাকার কাছে অসহায় নৌকা। নৌকার এই অবস্থার জন্য জেলা ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নেতাদের দায় দেখছেন দলটির নেতা ও ভোটাররা।

মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগর উপজেলার ২০টি ইউপির ১৯টিতে ভোটগ্রহণ হবে। এতে ৯২ জন চেয়ারম্যান প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ২৭ এবং প্রবাসী প্রার্থী রয়েছেন ১৩ জন। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ১২টি ইউপিতে চেয়ারম্যান প্রার্থী ৬০ জন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী ১৫ ও স্বতন্ত্র ৩৩ জন। এখানে প্রবাসী প্রার্থীর সংখ্যা ৫।

রাজনগর উপজেলার ৭ ইউপিতে চেয়ারম্যান প্রার্থী ৩২ জন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ বিদ্রোহী ১২ ও স্বতন্ত্র ১৩ জন। প্রবাসী প্রার্থী ৮ জন। রাজনগর উপজেলার কামারচাক ইউপিতে নৌকার প্রার্থী বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন।

নৌকার প্রার্থীদের এ অবস্থার জন্য সমন্বয়হীনতাকে দায়ী করছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা। তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা মনে করেন, যোগ্য ব্যক্তিকে আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দেয়নি।

সুনামগঞ্জে বিদ্রোহী নিয়ে দুশ্চিন্তায় আ.লীগ

সুনামগঞ্জের দিরাই, বিশ্বম্ভরপুর ও জগন্নাথপুর—এই ৩ উপজেলার ১৮টি ইউপিতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন ৪১ জন।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও ভোটার সূত্রে জানা যায়, তৃতীয় ধাপে সুনামগঞ্জ জেলা সদর ও দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার ১৭টি ইউপিতে ২৮ নভেম্বর ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে চেয়ারম্যান পদে মাত্র দুটিতে আওয়ামী লীগ প্রার্থী জয় পান। বাকি ১৫টিতেই নৌকার প্রার্থীরা পরাজিত হন। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ৯টি ইউপির সব কটিতেই নৌকা হেরেছে। এই ভরাডুবির পেছনে বিদ্রোহী প্রার্থীদের মূল ভূমিকা ছিল বলে দলের ভেতরে-বাইরে আলোচনা চলছে। তাই চতুর্থ ধাপের নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের জয় নিশ্চিত করতে বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেয় আওয়ামী লীগ। তারপরও ‘বিদ্রোহী’ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আওয়ামী লীগ।

সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এনামুল কবির ইমন জানিয়েছেন, গত নির্বাচনগুলোতে দেখা গেছে, বিদ্রোহীদের কারণে অনেক ইউপিতে দলের প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন। তাই এবার তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হয়নি।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত