নিজস্ব প্রতিবেদক

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ১৮:০৮

এমসি কলেজে ধর্ষণ: ২ বছরেও শুরু হয়নি সাক্ষ্যগ্রহণ

সিলেটের ঐতিহ্যবাহী মুরারিচাঁদ (এমসি) কলেজ ছাত্রাবাসে এক নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনার দুইবছরেও শুরু হয়নি এ ঘটনায় হওয়া মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ।

২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর কলেজের একটি ছাত্রাবাসে স্বামীর সঙ্গে ঘুরতে আসা নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে।

ঘটনার দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু না হওয়ায় বিচারে দীর্ঘসূত্রিতার আশঙ্কা করছে বাদীপক্ষ। তাদের অভিযোগ, আসামিরা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় বিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কিত তারা।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর অভিযোগ, বাদীপক্ষের কারণেই মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুতে দেরি হচ্ছে।

এ বিষয়ে সিলেটের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের স্পেশাল পিপি রাশিদা সাঈদা খানম বলেন, ‘মামলার কার্যক্রম নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালে শুরু হওয়ার কথা ছিল। আমরাও প্রস্তুত ছিলাম, কিন্তু বাদীপক্ষ এটি দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনালে নিয়ে যেতে চান। এ ব্যাপারে বাদী উচ্চ আদালতে একটি রিটও করেছেন।

‘উচ্চ আদালত এ ব্যাপারে একটি আদেশ দিয়েছেন শুনেছি, তবে পূর্ণাঙ্গ আদেশের কপি এখনও পাইনি। এ কারণে মামলার কার্যক্রম আটকে আছে। উচ্চ আদালতের আদেশের আলোকে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।’

সাক্ষ্যগ্রহণ আটকে কেন

সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনার পরদিন ওই নারীর স্বামী বাদী হয়ে সিলেটের শাহপরান থানায় মামলা করেন। এ ছাড়া ওই রাতে ছাত্রাবাস থেকে অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় চাঁদাবাজি ও অস্ত্র আইনে আরেকটি মামলা করে পুলিশ।

২০২০ সালের ২২ নভেম্বর অস্ত্র ও চাঁদাবাজি মামলার অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ। এরপর ধর্ষণ মামলায় ওই বছরের ৩ ডিসেম্বর ৮ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা হয়।

২০২১ সালের ১৭ জানুয়ারি সিলেটের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মোহিতুল হক চৌধুরী মামলার অভিযোগ গঠন করে বিচারকাজ শুরু করেন। আর চলতি বছরের ১১ মে একই আদালতে অস্ত্র ও চাঁদাবাজির মামলার অভিযোগ গঠন করে আদালত।

ধর্ষণ মামলার অভিযোগ গঠনের পর ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ঠিক করেছিলেন আদালত, তবে ওই বছরের ২৪ জানুয়ারি আদালতে দুটি মামলার বিচার কার্যক্রম একসঙ্গে শুরুর আবেদন করেন বাদীপক্ষ। শুনানি শেষে বিচারক আবেদনটি খারিজ করে দেন।

এরপর বাদীপক্ষ এই আবেদন জানিয়ে উচ্চ আদালতে ফৌজদারি বিবিধ মামলা করে। গত বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের ভার্চুয়াল বেঞ্চ মামলা দুটির বিচার কার্যক্রম একসঙ্গে একই আদালতে সম্পন্নের আদেশ দেয়। এরপর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বদলে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলা দুটির কার্যক্রম চালানোর আবেদন করে বাদীপক্ষ।

বাদীর আইনজীবী সূত্রে জানা যায়, অভিযোগ গঠনের দীর্ঘদিন পরও সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু না হওয়ায় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলা দুটির কার্যক্রম চালানোর জন্য গত ১ আগস্ট বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি আহমেদ সোহেলের হাইকোর্ট বেঞ্চে বাদী একটি রিট করেন। ১৬ আগস্ট রিটের শুনানি শেষে দুই মামলার কার্যক্রম দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বদলির প্রক্রিয়া গ্রহণে কেন নির্দেশনা দেয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করে হাইকোর্ট।

হাইকোর্টের এই আদেশের কপি এখনও হাতে আসেনি বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্র ও বাদীপক্ষের আইনজীবীরা।

এর আগে ২৭ জুলাই আসামি রবিউল ইসলামের জামিন শুনানিতে মামলার বিচার বিলম্বিত হওয়ায় উষ্মা প্রকাশ করেন বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামান ও বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ার কাজলের হাইকোর্ট বেঞ্চ।

আদালত সূত্রে জানা জানা যায়, মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করা হয় না মর্মে রাষ্ট্রপক্ষকে গত ২১ আগস্ট কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন সিলেটের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহিতুল হক। ১৬ অক্টোবর এ বিষয়ে শুনানির পরবর্তী তারিখ ঠিক করেন বিচারক।

এ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী রাশিদা সাঈদা খানম বলেন, ‘আদালতের কারণ দর্শানোর নোটিশের বিষয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ট্রাইব্যুনালে জমা দেয়া হয়েছে।’

আর বাদীপক্ষের আইনজীবী শহীদুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘মামলার দুই বছর পেরিয়েছে। অভিযোগ গঠনেরও অনেক দিন চলে গেছে। এখনও সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু না হওয়ায় বিচার পাওয়া নিয়েই শঙ্কা দেখা দিয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘একই ঘটনায় পুলিশের দুটি অভিযোগপত্র দেয়ায় বাদীপক্ষের সন্দেহ সৃষ্টি হয়। এতে ন্যায়বিচার ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সাক্ষীদের জন্যও বিষয়টি বিড়ম্বনার। কারণ চাঞ্চল্যকর এ মামলার সাক্ষীরা দুই আদালতে দুই দিন আসবেন কি না, এ নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।

‘কারণ ধর্ষণকারীরা সবাই নানাভাবে প্রভাবশালী। এ জন্য বাদীপক্ষ উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন। উচ্চ আদালত ইতোমধ্যে সংক্ষিপ্ত আদেশও দিয়েছেন। পূর্ণাঙ্গ আদেশের কপি পাওয়ার পর মামলার ভবিষ্যৎ করণীয় ঠিক করা হবে।’

সে রাতে যা ঘটেছিল

২০২০ সালের ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় স্বামীর সঙ্গে প্রাইভেটকারে করে শাহপরান মাজারে বেড়াতে গিয়েছিলেন ২০ বছর বয়সী ওই নারী। ফেরার পথে টিলাগড় এলাকায় এমসি কলেজের ফটকের সামনে গাড়ি থামিয়ে পাশের দোকানে প্রবেশ করেন তার স্বামী।

ওই সময় পাঁচ থেকে ছয়জন তরুণ এসে তাদের জিম্মি করে প্রাইভেটকারসহ বালুচর এলাকায় এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে নিয়ে যান। এরপর স্বামীকে মারধর করে বেঁধে রেখে ওই তরুণীকে ছাত্রাবাসের ভেতর সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়। পরে স্বামীর টাকা পয়সা ও প্রাইভেটকার রেখে দিয়ে তাদের ছেড়ে দেয় ধর্ষণকারীরা।

ছাত্রাবাস থেকে বেরিয়ে এসে তরুণীর স্বামী ঘটনাটি পুলিশকে জানান, তবে অভিযুক্তরা ছাত্রলীগের কর্মী হওয়ায় পুলিশ প্রথমে ছাত্রাবাসে প্রবেশে গড়িমসি করে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। এ সুযোগে ছাত্রাবাস থেকে পালিয়ে যায় ধর্ষণকারীরা। এরপর রাতভর ছাত্রাবাসে অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন কক্ষ থেকে অস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ।

এ ঘটনায় ওই নারীর স্বামী বাদী হয়ে শাহপরান থানায় ছয়জনের নাম উল্লেখ করে এবং দুজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা করেন।

ঘটনার পর পালিয়ে গেলেও তিন দিনের মধ্যে ছয় আসামি ও সন্দেহভাজন দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ও র‌্যাব। গ্রেপ্তারের পর তাদের পাঁচ দিন করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। পরবর্তী সময়ে সবাই আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

নমুনা পরীক্ষায় আট আসামির মধ্যে ছয়জনের ডিএনএর মিল পাওয়া যায়।

মামলার বাদী ওই তরুণীর স্বামী বলেন, ‘ঘটনার দুই বছর পেরিয়ে গেল। এখনও বিচার (সাক্ষ্যগ্রহণ) শুরু হলো না। দীর্ঘসূত্রিতায় বিচার পাওয়া নিয়েই আমরা শঙ্কিত। এদিকে অভিযুক্তরা বিষয়টি আপসে শেষ করার জন্য নানা চাপ দিচ্ছে।’

অভিযুক্ত যারা

সংঘবদ্ধ ধর্ষণের মামলায় ২০২০ সালের ৩ ডিসেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা ও সিলেটের শাহপরান থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য।

অভিযোগপত্রে সাইফুর রহমান, শাহ মাহবুবুর রহমান ওরফে রনি, তারেকুল ইসলাম ওরফে তারেক, অর্জুন লস্কর, আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল ও মিসবাউল ইসলাম ওরফে রাজনকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের জন্য অভিযুক্ত করা হয়। আসামি রবিউল ইসলাম ও মাহফুজুর রহমান ওরফে মাসুমকে ধর্ষণে সহায়তা করার জন্য অভিযুক্ত করা হয়।

আট আসামিই বর্তমানে কারাগারে। তারা সবাই ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে পরিচিতি।

অভিযুক্ত আটজনকেই কলেজ কর্তৃপক্ষ স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে। এরপর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও তাদের ছাত্রত্ব ও সনদ বাতিল করে।

ছাত্রাবাস থেকে অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় সাইফুর রহমান ও শাহ মাহবুবুর রহমান রনিকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত