২১ এপ্রিল, ২০২৬ ১৫:৩৭
সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র থেকে সম্প্রচারিত একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লীগের শাসনামল নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন।
সঞ্চালকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দলটির সবচেয়ে বড় দুটি ভুল ছিল—জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততা কমে যাওয়া এবং দলের একাংশ নেতার চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়া। তার এই বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিলেও, একই সঙ্গে এটি একাধিক কঠিন প্রশ্নও সামনে এনে দিয়েছে।
প্রথম প্রশ্নটি সরাসরি তার নিজের ভূমিকা ঘিরেই। তিনি যে সময়ের সমালোচনা করছেন, সেই সময়েরই একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ছিলেন তিনি। তাহলে সেই সময় এই বাস্তবতাগুলো তার অজানা ছিল—এটা বিশ্বাস করা কঠিন। যদি জানা থাকে, তাহলে কেন তখন তিনি প্রকাশ্যে দৃঢ় অবস্থান নেননি? আর যদি না জানেন, তবে তা তার দায়িত্ব পালনের সীমাবদ্ধতাকেই নির্দেশ করে। দুই ক্ষেত্রেই প্রশ্ন থেকে যায়।
মোমেন তার বক্তব্যে সরকার পরিচালনায় প্রশাসনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কথা বলেছেন এবং ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, এতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব কার্যত দূরে সরে গিয়েছিল। কিন্তু এখানেই আবার দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। তিনি নিজেও তো সেই কাঠামোর ভেতরে ছিলেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিসরের কাছাকাছি অবস্থান করতেন। তাহলে সেই দূরত্ব তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়ায় তার কোনো দায় নেই—এমন দাবি কতটা গ্রহণযোগ্য?
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি যেভাবে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলেছেন, তা নতুন নয়; বরং দীর্ঘদিনের আলোচিত বাস্তবতা। কিন্তু তার বক্তব্যে একটি প্রবণতা স্পষ্ট—দায়টি যেন মূলত “অন্যদের” ওপর চাপিয়ে দেওয়া। বিশেষ করে প্রশাসনের ভূমিকার কথা বলতে গিয়ে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, রাজনৈতিক নেতারা একা দুর্নীতি করতে পারেন না। এই বক্তব্য আংশিক সত্য হলেও, এতে রাজনৈতিক দায়কে আড়াল করার প্রবণতা রয়েছে বলেই মনে হয়। কারণ বাস্তবে ক্ষমতা ও প্রশাসন—দুটির সমন্বয়েই এমন অনিয়মের পরিবেশ তৈরি হয়।
তার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক প্রেক্ষাপটও এই আলোচনায় এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়। বিভিন্ন সময়ে তার স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের অনেকগুলোর আনুষ্ঠানিক প্রমাণ না থাকলেও, জনপরিসরে এগুলো যথেষ্ট আলোচিত। ফলে যখন তিনি নৈতিকতার প্রশ্ন তোলেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তার নিজের পরিসরও আলোচনায় চলে আসে। নৈতিক অবস্থান তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তা ব্যক্তিগত ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রতিফলিত হয়।
তার রাজনৈতিক যাত্রাপথও এখানে প্রাসঙ্গিক। তিনি মূলত একজন আমলা থেকে রাজনীতিতে আসেন এবং সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিত্ব পান। অর্থাৎ, তার অবস্থানটি ছিল নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ফল নয়, বরং আস্থাভিত্তিক নিয়োগের প্রতিফলন। এই বাস্তবতায় তার বর্তমান বক্তব্যকে কেউ কেউ নতুন করে গ্রহণযোগ্যতা তৈরির কৌশল হিসেবেও দেখছেন—এক ধরনের পরিশুদ্ধ ভাবমূর্তি নির্মাণের চেষ্টা।
এছাড়া তার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। যদি তিনি সত্যিই অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে এতটা স্পষ্ট অবস্থানে থাকেন, তাহলে বিতর্কিত নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? সমালোচকদের কাছে এটি একটি স্পষ্ট দ্বৈততার উদাহরণ—একদিকে সমালোচনা, অন্যদিকে সেই ব্যবস্থার অংশ হওয়া।
আরও আলোচনার জন্ম দিয়েছে একটি বিষয়—সর্বশেষ মন্ত্রিসভায় তাকে অন্তর্ভুক্ত না করা। রাজনৈতিক অঙ্গনে ধারণা রয়েছে, তার পরিবার-সম্পর্কিত বিতর্ক এবং বিভিন্ন অভিযোগ এই সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলা হয়নি, তবুও এই প্রেক্ষাপট তার বর্তমান বক্তব্যের পেছনে উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
এখানে আরও একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—তার এই বক্তব্য কি কেবলই আত্মসমালোচনা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো রাজনৈতিক হিসাব রয়েছে? কেউ কেউ মনে করছেন, তিনি নিজেকে একটি “রিফাইন্ড” বা গ্রহণযোগ্য আওয়ামী লীগ ধারার প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছেন। সেই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে—এই অবস্থান কি ভবিষ্যতে দলীয় রাজনীতিতে পুনঃপ্রবেশের পথ তৈরির অংশ? এমনকি কেউ কেউ আরও সরাসরি প্রশ্ন তুলছেন, তিনি কি এই ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে নিজের অবস্থান নরম করে পলাতক জীবন থেকে দেশে ফেরার একটি সুযোগ খুঁজছেন?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সময়কে ঘিরে। ক্ষমতার ভেতরে থাকা অবস্থায় নীরব থাকা এবং বাইরে এসে সরব হওয়া—এই প্রবণতা নতুন নয়। কিন্তু এতে বক্তব্যের গ্রহণযোগ্যতা কমে যায়। কারণ তখন এটি আত্মসমালোচনার চেয়ে বেশি মনে হয় অবস্থান বদলের কৌশল হিসেবে।
তবে তার বক্তব্য পুরোপুরি অগ্রাহ্য করার সুযোগও নেই। জনগণের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়া, দলীয় নেতাদের একাংশের অনিয়মে জড়িয়ে পড়া—এসব বিষয় বাস্তবতার অংশ। ফলে তার মন্তব্যকে একদিকে যেমন কঠোর সমালোচনার আলোয় দেখা দরকার, অন্যদিকে এটিকে একটি দেরিতে আসা স্বীকারোক্তি হিসেবেও বিবেচনা করা যেতে পারে।
সব মিলিয়ে, ড. এ কে আব্দুল মোমেনের এই মন্তব্য একই সঙ্গে দুটি বাস্তবতা সামনে আনে—একদিকে শাসনামলের দুর্বলতা, অন্যদিকে সেই ব্যবস্থার ভেতরে থাকা একজন ব্যক্তির দায়বোধের প্রশ্ন। এটি সত্যিকারের আত্মসমালোচনা, নাকি কৌশলী অবস্থান পরিবর্তন—তা নিয়ে বিতর্ক চলতেই থাকবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, দায় স্বীকারের বিশ্বাসযোগ্যতা তখনই তৈরি হয়, যখন তা সময়োপযোগী এবং ব্যক্তিগত দায়বোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
আকাশ চৌধুরী : সাংবাদিক ও কলামিষ্ট।
আপনার মন্তব্য