০৪ অক্টোবর, ২০২২ ০৫:৩০
শহিদ মিনার ও শহিদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থান ঢেকে বিলবোর্ড ও ফেস্টুন স্থাপন করায় প্রথমে সিলেটের সংস্কৃতিকর্মীদের প্রতিবাদ এবং পরে অনুমতিপত্র না থাকার কারণে মোবাইল অপারেটর কোম্পানি ‘রবি’র অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে সিলেট সিলেট সিটি কর্পোরেশন। পাশাপাশি মঞ্চ তৈরির জন্য নিয়ে আসা সরঞ্জাম এবং এসব বহনকারী গাড়ি জব্দ করেছে সিসিক।
সোমবার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। এ বিষয়ে রবির কোনো বক্তব্য জানা যায়নি।
জানা যায়, সোমবার সকাল থেকে শহিদ মিনার চত্বরে মঞ্চ নির্মাণ করে রবির ব্যানার ফেস্টুন লাগানো হয়। একপাশে রবির লোগো যুক্ত ব্যানারে লেখা ছিল- সিলেটের সেরা ইন্টারনেট এক্সপেরিয়েন্স। কিছু ফেস্টুনে রবির দূত অভিনেতা সিয়াম আহমদের ছবি ছিল।
শহিদ মিনারের প্রায় পুরোটা অংশ ঢেকে মোবাইল অপারেটর এ কোম্পানির এমন আয়োজন দেখে সিলেটের সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। তারা অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত হয়ে এ আয়োজনের বিষয়ে আপত্তি জানান। পরে সিটি কর্তৃপক্ষ সেখানে গিয়ে তা বন্ধ করে দেয়।
সিসিক সূত্র জানায়, কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠানের আয়োজন হচ্ছে এমন খবর জানতে পেরে সোমবার বিকাল ৪টার দিকে সিসিকের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হানিফুর রহমান সেখানে যান। এ সময় মঞ্চ তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছিল একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা। সিসিক কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানায়- এটি রবির অনুষ্ঠান।
তখন সিসিক কর্মকর্তা হানিফ আয়োজকদের অনুমতিপত্র দেখাতে বললে তারা একটি আবেদনপত্র বের করে দেখান। কিন্তু পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ওই অনুমতিপত্রে সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। পরে হানিফ অনুষ্ঠানের আয়োজন বন্ধ করে দেন এবং মালামাল ও গাড়ি জব্দ করেন।
এ বিষয়ে সিসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত সচিব) বিধায়ক রায় চৌধুরী বলেন, ‘শহিদ মিনারে অনুষ্ঠান করার জন্য সিসিক কোনো অনুমতি দেয়নি। যারা মঞ্চ তৈরি করতে এসেছিলেন- তারা রবি কোম্পানির নাম বলেছে। তারা একটি কাগজও দেখিয়েছে- যেটি ভুয়া। পরে সিসিকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা মঞ্চ তৈরির কাজ বন্ধ করে দিয়ে মালামাল ও গাড়ি জব্দ করেছেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
সোমবার বিকেলেই রবির ইন্টারনেট সুবিধা নিয়ে সিলেটের একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে বক্তব্য রাখেন সিয়াম।
পিআর প্রতিষ্ঠান ওয়েব মেকারের পক্ষে মেহেদী হাসান স্বাক্ষরিত সংবাদ সম্মেলনের চিঠি গণমাধ্যমে পাঠানো হয়।
সোমবার রাতে মেহেদী হাসান বলেন, ‘শহিদ মিনারে আজ রবির কোনো আয়োজন ছিল না। আমাদের সংবাদ সম্মেলন ছিল হোটেলে।’
সম্মিলিত নাট্য পরিষদ সিলেটের সভাপতি মিশফাক আহমদ মিশু বলেন, ‘আমরা শহিদ মিনার ও বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ ঢেকে বিলবোর্ড ও ফেস্টুন স্থাপনের বিরোধিতা করেছি। কোনো কনসার্টে বাধা দিইনি। পরে অনুমতি না থাকার কথা জানিয়ে সিটি কর্পোরেশন এটা বন্ধ করেছে।’
এদিকে, শহিদ মিনার ও বুদ্ধিজীবী কবরস্থান ঢেকে বিজ্ঞাপনী বিলবোর্ড ও ফেস্টুন স্থাপন করার প্রতিবাদ হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে। নাট্যকর্মী নিরঞ্জন দে যাদু ফেসবুকে লেখেন, শহিদ মিনারে এটা কিসের অনুষ্ঠান?? কর্পোরেট ব্র্যান্ডিং? নাকি কোনও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান? এ জায়গাটি নিয়ে আমাদের কতো আবেগ আর শ্রদ্ধা- তাই না?
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সিলেট বিভাগীয় প্রতিনিধি সামসুল আলম সেলিম ঘটনার পূর্বাপর সম্পর্কে জানান, সিটি কর্পোরেশনের ভুয়া অনুমতিপত্র এবং সাক্ষর জালিয়াতি করে একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান শহিদ মিনার এবং শহিদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের পবিত্রতা এবং ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বাণিজ্যিক কনসার্ট আয়োজনের প্রস্তুতির খবর পেয়ে আমরা দ্রুত অনুষ্ঠান বন্ধের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করি। সোমবার সকালে সাংস্কৃতিক সংগঠক নিরঞ্জন দের ফেসবুক পোস্ট দেখে সাথে সাথে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে অনুষ্ঠান বন্ধের পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এ সময় জেলা প্রেসক্লাব সভাপতি আল আজাদ মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং সম্মিলিত নাট্য পরিষদ সভাপতি মিশফাক আহমদ মিশু, সাধারণ সম্পাদক রজত কান্তি গুপ্ত এবং সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের পক্ষে আমি বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ করে বাণিজ্যিক অনুষ্ঠান দ্রুত বন্ধের পদক্ষেপ গ্রহণ করি। এসময় শহিদ মিনারে উপস্থিত হন সাংস্কৃতিক সংগঠক শামসুল বাসিত শেরো, সাংস্কৃতিক সংগঠক এনামুল মুনীরসহ কয়েকজন সংস্কৃতিকর্মী। সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও অন্যান্যরা শহিদ মিনারে এসে মালামাল জব্দ এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
আপনার মন্তব্য