নূরুল মোহাইমীন মিল্টন, কমলগঞ্জ

১০ ফেব্রুয়ারি , ২০১৫ ২০:৪১

শুরু হয়েছে ভাষার মাস ॥ মানা হচ্ছে না উচ্চ আদালতের নির্দেশ

ইংরেজী অভিযোগপত্র নিয়ে ভোগান্তিতে কমলগঞ্জের চা বাগানে নিরক্ষর শ্রমিকরা

শুরু হয়েছে ভাষার মাস। সর্বত্র বাংলা ভাষা ব্যবহারে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকলেও বিভিন্ন চা বাগান সমুহে তা মানা হচ্ছে না। আদালতের নির্দেশনা ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের তাগাদা সত্ত্বেও মৌলভীবাজারের ডানকান ব্রাদার্সের চা বাগান সমুহে নিরক্ষর চা শ্রমিকদের এখনও ইংরেজিতে অভিযোগপত্র প্রদান করা হচ্ছে। ফলে চা বাগানের লেখাপড়া না জানা শ্রমিকরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
    ডানকান ব্রাদাস এর শমশেরনগর, আলীনগর চা বাগানের বিদ্যাবতি রবিদাস, স্বরসতি রবিদাস, দেওরাজ রবিদাস, রাজদেও কৈরী সহ শ্রমিকরা বলেন, চা বাগানে তারা কর্মরত শ্রমিক থাকলেও তাদের প্রাথমিক শিক্ষা টুকুও নেই। কেউ কেউ কোন মতে নাম লিখতে শিখেছে। অন্যরা টিপসহি দিয়ে কাজ চালিয়ে যান। বর্তমানে তাদের সন্তানরা কিছু কিছু শিক্ষা গ্রহণ করছে। তবে ইংরেজি বুঝার মতো চা বাগান খোঁজে দু’একজন লোক পাওয়াও দুরহ ব্যাপার। শ্রমিকরা বলেন, বৃটিশ আমল থেকে এখন পর্যন্ত তাদের ইংরেজিতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেওয়া হচ্ছে। তারা ইংরেজি পড়তে ও লিখতে পারেন না। ফলে ইংরেজিতে দেয়া অভিযোগপত্রের জবাব লিখতে বাগানের বাইরের শিক্ষিত লোকদের কাছে গিয়ে ধর্না দিতে হয়।
    অনুসন্ধানে জানা যায়, কমলগঞ্জ উপজেলার ন্যাশনাল টি কোম্পানী(এনটিসি) ও ব্যক্তি মালিকানাধীন চা বাগান সমুহে অধিকাংশ অফিসিয়েল কাজ ইংরেজিতে হলেও চা শ্রমিকদের চার্জশিট বা কাগজপত্র বাংলায় প্রদান করা হয়। তবে ডানকান ব্রাদার্সের মালিকানাধীন চা বাগান সমূহে উচ্চ আদালতের নির্দেশনার পর এখনও ইংরেজিতে অভিযোগপত্র দিচ্ছে। পূর্বের ধারাবাহিকতায়ও সম্প্রতি শমশেরনগর চা বাগানের ফাঁড়ি দেওছড়া চা বাগানের কয়েকজন শ্রমিককে ইংরেজিতে চার্জশিট প্রদান করেছে। বাগানের শ্রমিক বিদ্যাবতি রবিদাস বলেন, গত ২৮ জানুয়ারীও তদন্তের জন্য তাকে ইংরেজীতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। বাগানের বাইরের শিক্ষিত লোকদের কাছে গিয়ে এটি বুঝতে হয়েছে।
    আদালতে নির্দেশনার পরও ইংরেজিতে অভিযোগপত্র প্রদান বিষয়ে সিলেট আইনজীবি সমিতির সাবেক সভাপতি ইমাদ উল্লাহ শহীদুল ইসলাম শাহীন বলেন, ‘বাংলাদেশের সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী উচ্চ আদালতের সকল আদেশ অধিনস্থ আদালত সহ সর্বোচ্ছ মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের প্রদত্ত আদেশের সুস্পষ্ট লংঘন বলে আমি মনে করি।’ তিনি আরও বলেন, ‘শমশেরনগর সহ দেশের বিভিন্ন চা বাগানে ঔপনিবেশিক আমল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ইচ্ছে করে এই ধারা অব্যাহত রেখেছে।’ বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরী বলেন, ইংরেজি চার্জশিটের ফলে চা শ্রমিকদের অনেক সমস্যা হচ্ছে। চা বাগানে উচ্চ আদালতের এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হওয়া উচিত।
    ইংরেজিতে চার্জশিট প্রদান সম্পর্কে জানতে চেয়ে শমশেরনগর চা বাগান ব্যবস্থাপক মোঃ শাহাদাত হোসাইনের মোবাইল ফোনে কয়েক দফা ফোন করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
    উল্লেখ্য, দেশের সর্বত্র বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করতে গত ১৬ ফেব্রুয়ারী হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন আইনজীবি মো. ইউনুছ আলী আকন্দ। ১৭ ফেব্রুয়ারী হাইকোর্ট বেঞ্চ এক মাসের মধ্যে সব বিদেশি ভাষার বিজ্ঞাপন এবং গাড়ির নম্বর প্লেট বাংলায় পরিবর্তনের জন্য নির্দেশ দিয়ে রুল জারি করেন। রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি কাজী রেজাউল হক ও বিচারপতি এবিএম আলতাফ হোসেন এর সমম্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ পরবর্তী ১৫ মে’র মধ্যে দেশের সব অফিস আদালতে সর্বত্র বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করতে সময় বেঁধে দেন। একই সঙ্গে বাংলা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন ও ইংরেজি পত্রিকায় ইংরেজিতে বিজ্ঞাপন দেয়ার বিষয়েও নির্দেশনা দেয়া হয়।

 

আপনার মন্তব্য

আলোচিত