১২ জুলাই, ২০২৪ ২৩:৫২
শিশুদের পাঠদান করছেন হাকালুকি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিধান চন্দ্র দাস। সম্প্রতি তোলা
অবিরত হালকা ও ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি এবং ভারত থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে টইটম্বুর এখন হাকালুকি হাওর। পানি বেড়ে যাওয়ায় হাওরপারের গ্রামগুলো ডুবেছে। তলিয়ে গেছে রাস্তাঘাট। বন্যায় কারো বসত ঘরে হাঁটুজল, কারো ঘরে কোমরসমান পানি। বাড়ি ঘরে টিকতে না পেরে কেউ ছুটে গেছেন আশ্রয়কেন্দ্রে। কেউবা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে গেছেন। তবে ঝুঁকি জেনেও ঘরে-বাইরে পানির মধ্যেই বেশিরভাগ রয়ে গেছেন ঘরে। ভোগান্তির মধ্যে লড়াই করছেন টিকে থাকার। গত প্রায় ২৫দিন ধরে এই অবস্থা মৌলভীবাজারের বড়লেখায়।
উপজেলার ২৫২টি গ্রাম বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। ৩০টি আশ্রয় কেন্দ্রে প্রায় ৫০০ পরিবারের বানভাসি মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। এতে এসব গ্রামের মানুষেরা নিজেদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতে পারলেও তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ছেদ পড়েছে।
এসব আশ্রয়কেন্দ্রে বাবা-মায়ের সাথে তাঁদের স্কুল ও মাদ্রাসা পড়ুয়া সন্তানেরাও আছে। এরকমই একটি আশ্রয়কেন্দ্র হচ্ছে হাকালুকি হাওর পারের ‘হাকালুকি উচ্চ বিদ্যালয়’। এখানে আশ্রয় নিয়েছে বানভাসি ৩২টি পরিবারের মানুষ। তাঁদের পরিবারের বিভিন্ন শ্রেণিতে পড়ুয়া ২৫ জন শিক্ষার্থী আছে। বন্যার পানিতে তাদের অনেকের বই, খাতা-কলম ভেসে গেছে। বন্যার এই দীর্ঘ সময়ে তাদের পড়াশোনায় ছেদ পড়তে পারে। এ পরিস্থিতিতে এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক বিধান চন্দ্র দাস স্বেচ্ছায় আশ্রয়কেন্দ্রে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করছেন। শুধু পাঠদানই নয়, শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বই, খাতা, কলমও কিনে দিয়েছেন। একবেলা তাদের নাস্তারও ব্যবস্থা করেছেন। এমন উদ্যোগে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা শিশুদের পাশপাশি তাদের অভিভাবকরাও খুশি।
শুক্রবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা গেছে, গত কয়েদিনে বৃষ্টি না হওয়ায় পানি কিছুটা কমেছে। তবে আশ্রয় কেন্দ্রে থাকা মানুষজনের এখনও বাড়ি ফেরার মতো যথেষ্ট পরিমাণ পানি কমেনি।হাকালুকি উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণও এখনো জলমগ্ন। আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা শিশুদের বিদ্যালয়ের ভবন ছাড়া ঘোরাফেরা-খেলাধুলারও জায়গা নেই। বিদ্যালয়ের নতুন একাডেমিক ভবনের একটি কক্ষে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করাচ্ছেন প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক বিধান চন্দ্র দাস। আশ্রয়কেন্দ্রে শিশু শ্রেণি থেকে স্কুল ও মাদ্রাসার সপ্তম শ্রেণির ২৫ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। গত ২০ জুন থেকে ধারাবাহিকভাবে বানভাসি এসব শিক্ষার্থীরা পাঠের সুযোগ পেয়েছে।
প্রধান শিক্ষক বিধান চন্দ্র দাস তাদের বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞান বিষয়ে পড়াচ্ছেন। শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যেই তাদের পাঠদান আটকে রাখছেন না। সচেতনতামূলক ক্লাস ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করছেন।
শুরু থেকেই এ আশ্রয়কেন্দ্রে আছেন মুর্শিবাদকুরা গ্রামের খালেদা বেগম নামের এক গৃহিণী। তিনি শিক্ষকের প্রশংসা করে বলেন, বাড়ি-ঘর বন্যায় ডুবে গেছে। ছেলে-মেয়েদের নিয়ে স্কুলে আইছি। হেড স্যার তাদের পড়াইরা, খাতা-কলম দিরা। মনে করছিলাম বন্যার কারণে ছেলে-মেয়েদের পড়াইতাম পারতাম নায়। কিন্তু স্কুলে আইয়া সুবিধা অইছে, ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া শিখাইতাম পাররাম।
আশ্রয়কেন্দ্রে পড়ছে ৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থী মোহাম্মদ আলী। আলী জানায়, বন্যায় আমাদের ঘর ভেঙে গেছে। মা-বাবা স্কুলে লইয়া আইছন। এখানেও আমরা পানিবন্দী। মাঠে পানি। হেড স্যারে (প্রধান শিক্ষক) আমারারে পড়াইরা। আনন্দে আমরা পড়রাম। অনেক কিছু শিখেছি।
এমন উদ্যোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক বিধান চন্দ্র দাস বলেন, দিনের বেলা সব সময় আশ্রয়কেন্দ্রে থাকি। স্কুলের চারপাশে বন্যার পানি। খোঁজ নিয়ে দেখলাম এখানে বেশ কিছু শিক্ষার্থী আছে। কয়েকজন আমার স্কুলের। অন্য স্কুলেরও আছে। পানিবন্দী অবস্থায় তাদের পড়ালেখায় যাতে বিঘ্ন না ঘটে; এই চিন্তা থেকে পাঠদান শুরু করি। তাদের বিষয়ভিত্তিক পাঠদানের পাশাপাশি সচেতনতামূলক ক্লাস নিচ্ছি। এতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরাও খুশি।
তাদের পাঠ্যসূচির বইয়ের পাশাপাশি খোলা জায়গায় পায়খানা না করা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার বিষয়েও সচেতন করার চেষ্টা করেন। এর সুফলও পাচ্ছেন। ছোট বাচ্চাদের সঙ্গে সময় কাটাতে নিজেরও ভালো লাগে।
দুই সপ্তাহের ওপরে স্কুলে আছে সবাই। তবে দুই সপ্তাহ ধরে ক্লাস চলছে। পানি কিছুটা কমে স্কুলের মাঠ শুকিয়ে গিয়েছিল। বৃষ্টি হওয়ায় আবার আগের জায়গায় পানি ফিরে এসেছে। ফলে বানভাসি লোকজনকে বেশ কিছুদিন আশ্রয়কেন্দ্রে থাকতে হবে।
প্রধান শিক্ষক বলেন, গতবার (২০২২) যে রকম অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন করা হয়েছিল, এবার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন স্কুল দেখলে তা কেউ অনুমান করতে পারবে না। আমি নলকূপ থেকে পানি তুলে দিই। সবাই খুব সুশৃঙ্খলভাবে বসবাস করছে।
আপনার মন্তব্য