দেবকল্যাণ বাপন ও শাকিলা ববি, সিলেট

৩০ জুলাই, ২০২৪ ১৪:৫২

ইন্টারনেটে ধীরগতি: ফ্রিল্যান্সার ও অনলাইন উদ্যোক্তাদের ব্যবসায় বড় ধাক্কা

দেশে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বন্ধ ছিল ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ও মোবাইল ইন্টারনেট সেবার কার্যক্রম। টানা ৭ দিন পর ব্রডব্যান্ড এবং ১০ দিন পর মোবাইল ইন্টারনেট ফিরে এলেও এর ধীরগতি ভোগাচ্ছে ফ্রিল্যান্সারদের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও ইনস্ট্রাগ্রাম ভিত্তিক ব্যবসা পরিচালনাকারী উদ্যোক্তাদের।

দীর্ঘ দুই সপ্তাহ ধরে প্রায় আয় রোজগার বন্ধ রয়েছে ফ্রিল্যান্সারদের। একইসাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিচালনা করা বিভিন্ন উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। এতে বেকার সময় কাটাচ্ছেন নারী উদ্যোক্তাসহ অনলাইন ভিত্তিক ব্যবসায়ীরা। আর ফ্রিল্যান্সাররা ভাবছেন অন্য কোনো দেশে গিয়ে তাদের ব্যবসা পরিচালনার কথা।

এমনটাই জানিয়েছেন ২০০৬ সাল থেকে সিলেটে ব্যবসা করে আসা ফ্রিল্যান্সার মহিউদ্দিন আহমেদ মহসিন। তিনি সিলেটটুডেকে জানান। বর্তমানে দেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের যে অবস্থা তাতে করে এ ব্যবসা ছেড়েই দিতে হবে। নতুবা অন্য কোনো দেশে গিয়ে পুনরায় এ ব্যবসা শুরু করতে হবে।

সিলেটটুডের প্রতিবেদকের সাথে এক কথোপকথনে তিনি জানান, গত ১৮ জুলাই থেকে দেশে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ হয়ে যায়, আর সেদিন থেকেই বেকার হয়ে পড়ি আমি। আমার হাতে যতগুলো কাজ ছিল তা একে একে বাতিল করে দেয় বিদেশী ক্লায়েন্টরা। যা আমি জানতে পারি এক সপ্তাহ পরে, যখন দেশের ইন্টারনেট সেবা সচল হয়। এরপর পেরিয়েছে আরও এক সপ্তাহ, বর্তমানে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা চালু থাকলেও এর ধীরগতির কারণে বিদেশী ক্লায়েন্টদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে না, একইসাথে আমারা যারা ফ্রিল্যান্সিংয়ের সাথে জড়িত তাদের উপর থেকে একরকম বিশ্বাস উঠে গেছে বিদেশী ক্লায়েন্টদের, পাশাপাশি আমাদের কর্ম দক্ষতা এখন সর্বমহলে প্রশ্নবিদ্ধ।

আরেক ফ্রিল্যান্সার পিন্টু ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় নিজের ক্ষতির কথা উল্লেখ করে বলেন, টানা ৭ দিন ইন্টারনেট বিহীন থাকাতে আমার অনেক ক্লায়েন্টের সাথে চুক্তি বাতিল করতে হয়েছে। অনলাইনে না থাকার কারণে মার্কেটপ্লেস নোটিশ দিয়ে কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। আমার সবগুলো দেশের বাইরের ক্লায়েন্ট। নেট না থাকার কারণে অনেক কাজ স্থগিত ছিল, অনেক কাজের জমা দেয়ার তারিখ ছিল কিন্তু দিতে পারিনি। নিয়মিত অনেক ক্লায়েন্ট চলে গেছে। জমা কাজের যাচাই বাছাই করতে পারিনি। যার ফলে কাজ চলে গেছে। এমতাবস্থায় নতুন করে ক্লায়েন্ট যোগাড় করতে হচ্ছে। আমার কাজ থেকে আমি অনেক পিছিয়ে গেছি যা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে। দেশে অনেক ফ্রিল্যান্সার আছে। অনেকের বড় ক্লায়েন্ট চলে গেছে, অর্ডারগুলো বাতিল হয়ে গেছে। কারও কারও সপ্তাহে লাখ টাকাও লোকসান হয়েছে। এখনও স্বাভাবিক ভাবে কাজ করতে পারছিনা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ, সহজে কাজ করা যাচ্ছেনা। ধীরগতির কারণে ফাইল সহজে পাঠানো যাচ্ছেনা। আগের মত যাতে ইন্টারনেট সচল করে দেয়া হয় সে আহ্বান জানান তিনি।

এছাড়া ফেসবুকসহ সামাজিক মাধ্যমগুলো এখনো চালু হয়নি। ভিপিএন দিয়ে বিকল্প উপায়ে কেউ কেউ ফেসবুক চালালেও তাতে কাঙ্ক্ষিত রিচ হচ্ছে না। এতে মুখ থুবড়ে পড়েছে ফেসবুকভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা না গেলেও ব্যবসায়ীরা বলছেন, অন্তত কয়েক মাস পিছিয়ে গেছেন তারা।

এ বিষয়ে একাধিক নারী উদ্যোক্তা জানান, অনলাইনের যারা নিয়মিত গ্রাহক তাদের কারও সাথে যোগাযোগ নেই। অনেকের অর্ডার রয়েছে কিন্তু সেগুলো ডেলিভারি দেয়া সম্ভব হচ্ছেনা। এতে করে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে।

এমনটাই জানিয়েছেন, অনলাইন ভিত্তিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ‘গ্ল্যামডাস্ট’ পরিচালক আমিনা খুশি। তিনি জানান, গত ১৮ জুলাই সন্ধ্যায় সর্বশেষ একটি ড্রেসের অর্ডার নিয়েছিলেন তিনি। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত কোনো অর্ডার নিতে পারেননি তিনি। কারণ ১৮ জুলাই বিকেল থেকে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ হয়ে যায়। আর গত কয়েকদিন ধরে ইন্টারনেট সেবা ফিরলেও বন্ধ রয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও ইনস্ট্রাগ্রাম। যার কারণে তিনি তার ব্যবসায়িক ফেসবুক পেইজে প্রবেশ করতে পারছেন না।

আমিনা খুশি বলেন, কোটা আন্দোলনের কারণে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় কোনো অর্ডার নিতে পারছি না ১৮ জুলাই থেকে। দুদিন হল নেট সংযোগ আসলেও ফেসবুক বন্ধ থাকায় পেইজে ঢুকতে পারছি না, অর্ডার নেব কিভাবে। যারা পণ্য নেবার জন্য আগে অর্ডার করে এডভান্স করেছিলেন তাদের পণ্যও দিতে পারছি না। কারণ বাইরের কোনো সেলারের সাথে যোগাযোগ করতে পারছি না। আমরা যারা অনলাইন কেন্দ্রিক ব্যবসা করি তারা পণ্য আনিও অনলাইনে যোগাযোগ করে। তাই সব বন্ধ এখন। এমন পরিস্থিতি করোনার সময়ও ছিল না। কারফিউ থাকলেও যদি অন্তত ইন্টারনেট সংযোগ স্বাভাবিক থাকতো তাহলে আমাদের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হত না। এখন একটাই চাওয়া তাড়াতাড়ি যেন দেশ স্বাভাবিক হয় ও আমরা সবকিছু স্বাভাবিক ভাবে করতে পারি।

একই অবস্থা সিলেট নগরীর নয়াসড়ক এলাকার আমিনা শরিফ রুম্পা । ‘আমিনা’স ফেন্সি কেক বুক’ নামক একটি ফেসবুক পেজের মাধ্যমে তিনি তার ব্যবসা পরিচালনা করেন। আমিনা শরিফ রুম্পা বলেন, সর্বশেষ অর্ডার নিয়েছিলাম গত ১৮ জুলাই সিলেট উইমেনস জার্নালিস্ট ক্লাবের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কেক। এটি ডেলিভারির পর আর আমার পেইজে ঢুকতে পারিনি। কারণ ইন্টারনেট বন্ধ ছিল। এরপর পূর্বের অর্ডার করা দুটি কেক কারফিউর মধ্যে ডেলিভারি দিয়েছি। কারণ তারা আগেই এডভান্স দিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু এই অস্থির পরিস্থিতিতে ডেলিভারি ম্যানরাও কাজ করতে ভয় পান। তাই যারা ফেসবুক পেইজে না পেয়ে মোবাইল ফোনে কেকের অর্ডার দিচ্ছেন তাদেরও অর্ডার রাখতে পারছি না। তার চাওয়া ইন্টারনেট সেবা ও ফেসবুক ঠিক রেখে তাদের ব্যবসা করার সুযোগ দেওয়া উচিত।

সিলেট বিভাগের চার জেলায় অনলাইন ব্যবসায়ী এবং উদ্যোক্তা সংখ্যার তথ্য সুনির্দিষ্ট নেই। তবে ধারণা করা হয় সারা বিভাগে প্রায় ছয় হাজার মাঝারি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং উদ্যোক্তা আছেন। যার মধ্যে অর্ধেক নারী আছেন যারা বাসায় থেকে অনলাইনে নিজেদের ব্যবসা পরিচালনা করছেন। চলমান এই আন্দোলন পরিস্থিতিতে ইন্টারনেট বন্ধ থাকা ও ধীর গতির কারণে ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখে পড়েছেন এই অনলাইন ব্যবসায়ীরা।

কায়নাত বিডি ফেসবুক গ্রুপ থেকে নারীদের বিভিন্ন দেশী ও বিদেশি পণ্য যেমন শাড়ি, গহনা,  প্রসাধনী ও সালোয়ার-কামিজ বিক্রি করেন শেখ আফসানা রিয়া। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় গত আটদিন ধরে কোনো পণ্য বিক্রি করতে পারেননি রিয়া। শেখ আফসানা রিয়া বলেন, নেট বন্ধ থাকায় আমার ব্যবসাও বন্ধ। কারণ ফেসবুক পেইজের মাধ্যমে আমি আমার পণ্য বিক্রি করি। গত ১৮ জুলাই থেকে নেট বন্ধ। দুদিন হল যে নেট দেওয়া হয়েছে তাতে কোনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রবেশ করা যায় না। তাই কিছু করতে পারছি না। আমরা যারা অনলাইন ব্যবসা করি তারা মূলত ফেসবুক পেইজ, ওয়েবসাইট, হোয়াসটসঅ্যাপের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করি। তাই নেট সংযোগ না থাকায় আমরা অনলাইন ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। এভাবে যদি দীর্ঘদিন নেট স্লো ও বন্ধ রাখা হয় তাহলে ব্যবসা স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে।

দি সিলেট চেম্বার  অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাহমিন আহমেদ বলেন, সহজলভ্য ইন্টারনেটের কারণে বিগত কয়েক বছর যাবত সারা দেশের মতো সিলেটও অনলাইন ভিত্তিক ই-কমার্স ব্যবসার একটি বিশাল বাজার গড়ে উঠেছে। অনলাইন ভিত্তিক ব্যবসার সফলতার কারণে অন্যান্য সব ধরনের ব্যবসায়ীরও এখন তাদের প্রতিষ্ঠানে পণ্য বিক্রির পাশাপাশি অনলাইনেও পণ্য বিক্রি করেন। এই আন্দোলন ও জ্বালও পুড়াও এর কারণে সিলেট বিভাগে ই ট্রেডেই প্রায় শতকোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সবকিছু স্বাভাবিক হওয়া প্রয়োজন।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত