ইয়াকুব শাহরিয়ার, শান্তিগঞ্জ

২০ ডিসেম্বর, ২০২৪ ০১:৩৭

শান্তিগঞ্জে শত্রুতার বিষে মরল ২০ লাখ টাকার মাছ

◾ পথে বসবে ২৫ জেলে পরিবার

ছবি: সংগৃহীত

মেনি, মলা-ঢেলা, টেংরা, পুটি, শোল, বোয়াল, কই, কার্প, বাইম ও ফলি (কাংলা) মাছ মরে ভেসে আছে পানির উপরে। হঠাৎ করে দেখলে মনে হবে কোনো মাছের আড়ৎ থেকে এনে মৃত মাছগুলো ফেলে রেখেছেন কেউ। অসংখ্য কাক, চিল, বকসহ নানা ধরণের পাখি মাছগুলো ঠোকরে নিয়ে যাচ্ছে। এ যেনো পাখিদের আনন্দ। কিন্তু বিপরীতে ভীষণ ক্ষতি ও দুঃখের মুখে পড়েছেন শান্তিগঞ্জ উপজেলার শিমুলবাঁক ইউনিয়নের জীবদারা গ্রামের জীবদারা আদর্শ মৎস্য সমবায় সমিতির ২৫ মৎস্যজীবী। এতে সমিতির মৎস্যজীবীদের প্রায় ১৫ থেকে ২০ লক্ষ টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন মৎস্যজীবীরা।

গত মঙ্গলবার দিবাগত রাতে এই সমিতি কর্তৃক ইজারা আনা জীবদারা বাজার সংলগ্ন সুরাইয়া বিলে এই বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে বলে ধারণা করছেন তারা। তাদের অভিযোগ পার্শ্ববর্তী নাইরা ও ফাটা বিলের সাব-লিজকারী সেন্টু দাশ ও চয়ন দাশ তার সহকারিদের নিয়ে এই গর্হিত কাজ করেছেন। সেন্টু ও চয়ন একই ইউনিয়নের কেশবপুর গ্রামের বাসিন্দা ও মৃত চিত্তরঞ্জন দাশের ছেলে। অপর দুই অভিযুক্ত হচ্ছেন একই গ্রামের বাসিন্দা মৃত জহুর আলীর ছেলে চকর আলী ও মৃত মনছুর আলীর ছেলে আলমগীর হোসেন।

সুরাইয়া বিলের ইজারাদার জীবদারা আদর্শ মৎস্য সমবায় সমিতির সভাপতি সাজিরুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক সাফির উদ্দিন অভিযোগ করে বলেন, আমাদের পূর্ণ ধারণা যে, নাইরা ও পাটা বিলের সাবলিজকারী সেন্টু দাশ গংরা আমাদের বিলে বিষ প্রয়োগ করেছে। তাদের ও আমাদের বিল একসাথে হওয়ায় এবং সীমানা পাড় না থাকায় আমাদের বিলের মাছ তাদের বিলে নেওয়ার অপচেষ্টা করেছে। তারা আমাদের বিলের অংশে বিষ প্রয়োগ করেছে যেনো এ অংশের সব মাছ তাদের অংশে অর্থাৎ পাটা বিলে চলে যায়। যা মাছ মারা গেছে সব মাছ আমাদের অংশে মারা গেছে। তাদের অংশে একটি মাছও মারা যায়নি। কারণ তাদের বিলে বিষের প্রভাব পড়েনি। এ থেকে পরিষ্কার বুঝা যায় যে, তারা দেখেশুনে, বুঝে আমাদের অংশে বিষ দিয়েছে। আমাদের এখানকার (সুরাইয়া বিলের) সব মাছ মরে শেষ হয়ে গেছে।

তারা বলেন, আমাদের সাথে শত্রুতা থাকতে পারে কিন্তু মাছের প্রতি কিসের এতো নৃশংসতা? আমরা এর বিচার চাই। দেশের প্রচলিত আইনে এর সর্বোচ্চ শাস্তি চাই। এছাড়াও আমরা মাছের অভয়ারণ্য কখনোই শুকিয়ে মাছ ধরি না। তারা শুকিয়ে মাছ ধরে। তারা অবৈধ রিং জাল পাতিয়ে মাছ শিকার করছে। মৎস্য ও জলাশয়ের কোনো আইনই তারা মানছেন না। নিয়ম অনুযায়ী সমবায় সমিতির নামে ইজারাকৃত কোনো জলাশয় বা বিল সাবলিজ দেওয়ার কোনো সুযোগ না থাকলেও আইনের তোয়াক্কা না করে সেন্টু গংদের কাছে নাইরা ও পাটা বিল বিক্রি করেছে মুর্তাখাই উত্তরপাড়া সমবায় সমিতি। এহেন কর্মকাণ্ডেরও তীব্র নিন্দা জানাই। উপজেলা সমবায় অফিস ও উপজেলা প্রশাসন এর যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন বলে আমরা আশাবাদ ব্যক্ত করি।

সরেজমিনে জীবদারা বাজার সংলগ্ন সুরাইয়া বিল ঘুরে ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়।

দেখা যায়, বিলের প্রত্যেকটি বাঁকে বাঁকে ভাসছে অসংখ্য মরা মাছ। অসংখ্য মৃত মাছে সাদা হয়ে আছে বিলের পানি। আকাশে অগণিত চিল, কাক ও বক উড়ছে মাছ খাওয়ার জন্য। মৎস্যজীবীরা হাহাকার করছেন। অনেক মানুষ পানিতে ভেসে থাকা মাছ কুড়িয়ে নিচ্ছেন। কেউ হয়তো খাবেন, কেউ শুটকি দিবেন। এ দৃশ্য চোখে পড়তেই অনেক মৎস্যজীবীর চোখ ভিজে আসে চোখের পানিতে। মাছের সাথে এমন নৃশংসতার বিচার দাবি করেন তারা। জীবদারা গ্রামের সাধারণ মানুষেরাও বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারছেন না।

পলিথিনের ব্যাগে করে আধা ব্যাগ মরা মাছ নিয়ে যাচ্ছেন কৃষক জাকির হোসেন। তার সাথে জিয়াবুর রহমান। জাকির বলেন, এতো মাছ মরেছে যে, চোখকে বিশ্বাস করাতে পারছি না। পানিতে ভেসে উঠায় কিছু মাছ ব্যাগে করে নিয়ে আসলাম। খাওয়া গেলে খাবো না হলে শুটকি দেবো। যে বা যারা এ কাজ করেছে তারা মানুষ নয়, পশু। তাদের বিচার হওয়া উচিৎ। এদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হোক।

জীবদারা বাজারের পল্লী চিকিৎসক আজমত শাহ বলেন, প্রায় ১৩ একর বিলে ৫০ মনের বেশি মাছ মরে ভেসে আছে। আমার ৩৫ বছরের জীবনে মাছের সাথে এমন নৃশংসতা দেখিনি। এটা একেবারে বেমানান। মানুষে মানুষে বিবেদ থাকতে পারে। মাছের সাথে কেনো এতো অমানুষী? এর বিচার চাই। জেলে পরিবারগুলো একেবারে পথে বসে যাবে।

অভিযুক্ত সেন্টু দাশ বলেন, আমার উপর আনিত অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমি একজন শ্রমিক। মাছ ধরে টাকা পাই। আমি কোনো বিল সাবলিজ নেইনি। এটা উত্তরপাড়া সমিতির বিল। আমি মালিক হবো কেনো? আমি হিন্দু মানুষ। আমি এতো সাহস কেনো করবো। আমি কারো বিলে বিষ প্রয়োগ করিনি।

শান্তিগঞ্জ উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা রুহুল হাসান বলেন, জলমহাল নীতিমালা অনুযায়ী একটি সমিতি কখনোই বিল ইজারা নিয়ে সাবলিজ বা বিক্রি করতে পারবেন না। এটা সুস্পষ্ট জলমহাল নীতিমালা লঙ্ঘন। যদি এটা প্রমাণিত হয় যে, মুক্তাখাই উত্তরপাড়া সমবায় সমিতি তাদের ইজারাকৃত বিল কারো কাছে সাবলিজ দিয়েছেন তাহলে বিধি অনুযায়ী প্রথমেই তাদের ইজারা বাতিল হবে। আমরা বিষয়টি খুঁজ নিয়ে দেখবো।

শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুকান্ত সাহা বলেন, এরকম একটি অভিযোগ আমি পেয়েছি। অচিরেই একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দেবো। যদি অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয় তাহলে সাবলিজ দেওয়া সমিতির ইজারা বাতিল হবে। বিষ প্রয়োগকারী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত