১৯ এপ্রিল, ২০২৬ ১১:১০
ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনিকে নিয়ে ফেসবুকে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রচার ও ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগে করা মামলায় কন্টেন্ট ক্রিয়েটর এ এম হাসান নাসিমকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
শনিবার (১৮ এপ্রিল) শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ পিয়াসের আদালত এই আদেশ দেন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, এদিন আসামি নাসিমকে আদালতে হাজির করে মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও মূল রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য সাত দিনের পুলিশ রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন ডিবি পুলিশের উপপরিদর্শক মো. রায়হানুর রহমান। রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামি ঘটনার সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। ঘটনার পেছনের রহস্য এবং অন্য সহযোগীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে তাঁকে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড প্রয়োজন।
অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবী জহিরুল ইসলাম রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিন আবেদন করেন। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে এর বিরোধিতা করা হয়। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত রিমান্ড ও জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে নাসিমকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। আসামিপক্ষের আইনজীবী জহিরুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে, গত ১৭ এপ্রিল রাত ৮টার দিকে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানা এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে হাসান নাসিমকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১১ এপ্রিল রাত সাড়ে ১১টার দিকে গুলশানে নিজ বাসায় অবস্থানকালে মামলার বাদী মো. নজরুল ইসলাম দেখতে পান, বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনিকে ব্ল্যাকমেইল করার উদ্দেশ্যে একটি পোস্ট করা হয়েছে। সেখানে 'সাগর থেকে ৩টা তিমি মাছ নিয়ে এসেছি, ২টা হাঙর আসতেছে ইনশাআল্লাহ, সবার দাওয়াত: চিফ হুইপ'—এই ক্যাপশনে একটি পোস্ট দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ওই ফেসবুক আইডি থেকে বিভিন্ন সময়ে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রচার করা হয়। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আসামির হোয়াটসঅ্যাপ থেকে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনির ব্যক্তিগত নম্বরে বিভিন্ন স্ক্রিনশট পাঠিয়ে লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে ব্ল্যাকমেইল করারও অভিযোগ করা হয়।
এ ঘটনায় চিফ হুইপের কর্মী মো. নজরুল ইসলাম বাদী হয়ে গুলশান থানায় সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে মামলাটি দায়ের করেন।
উল্লেখ্য, গত ১০ এপ্রিল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৩তম দিনের বৈঠকের বিরতিতে দুপুরে সংসদ সদস্যদের জন্য মধ্যাহ্নভোজের দাওয়াত দেন চিফ হুইপ ও বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম। এমন সময় সংসদ সদস্যরা খাবারের মেন্যু জানতে চাইলে মজার ছলে চিফ হুইপ ‘তিমি ও হাঙর’ পরিবেশনের কথা বলেন। চিফ হুইপ বলেন, ‘আপনারা সবাই অবগত আছেন যে জুমার নামাজের পর আমাদের একটু মধ্যাহ্নভোজের ব্যবস্থা আছে। যেহেতু আমরা বিকেলে আবারও সেশন করব, তাই সবাইকে সংসদ সদস্য ভবনে (এলডি হল) দাওয়াত করছি। নামাজের পর আমরা সবাই সেখানে যাব ইনশাআল্লাহ।’ এ সময় কয়েকজন সদস্য আপ্যায়নের মেন্যু সম্পর্কে জানতে চাইলে মজার ছলে চিফ হুইপ বলেন, ‘ভাই আপ্যায়নে সবই হয়। সদস্যবৃন্দ, আপনাদের জন্য সাগর থেকে তিনটি তিমি মাছ ধরে নিয়ে এসেছি এবং আরও দুটি হাঙর আসতেছে ইনশাআল্লাহ।’ তার এই সরস মন্তব্যে উপস্থিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে হাসির রোল পড়ে। চিফ হুইপের এই বক্তব্যকে উদ্ধৃত করে দেশের অনেকগুলো গণমাধ্যমগুলো খাবারের মেন্যুতে তিমি মাছ ও হাঙর বিষয়ক প্রতিবেদন ও ফটোকার্ডও প্রচার করে।
অ্যাক্টিভিস্ট গ্রেপ্তারে এনসিপির নিন্দা
চিফ হুইপকে নিয়ে কার্টুন প্রচারের অভিযোগে অ্যাক্টিভিস্ট এ এম হাসান নাসিমকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এই অ্যাক্টিভিস্টের অনতিবিলম্বে মুক্তির দাবি জানিয়ে দলটি বলছে, সরকারের দুই মাস পূর্ণ হতেই একজন অ্যাক্টিভিস্ট কার্টুন প্রচারের স্বাধীনতা হারিয়েছে। শনিবার (১৯ এপ্রিল) রাতে এক বিবৃতিতে এমন দাবি জানায় দলটি।
বিবৃতিতে বলা হয়, শুক্রবার রাত ৮টায় কোনো ওয়ারেন্ট ছাড়াই ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ এ এম হাসান নাসিমকে গ্রেপ্তার করে। শনিবার তাকে আদালতে তোলা হলে আদালত জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
ভুক্তভোগী হাসান নাসিমের বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের ২৫ ও ২৭ ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় চিফ হুইপকে নিয়ে কার্টুন প্রচার ও ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগ আনা হলেও এনসিপি এই মামলাকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে।
দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, চিফ হুইপ নিজেই সংসদ অধিবেশনে মজার ছলে কিছু বক্তব্য দিয়েছিলেন যা ভুক্তভোগীর ফেসবুক পেজ থেকে কার্টুন আকারে প্রকাশ করা হয়।
স্রেফ রাজনৈতিক কার্টুন প্রচারের দায়ে চিফ হুইপের একনিষ্ঠ একজন কর্মীর অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছে বলে দাবি এনসিপির।
এনসিপি মামলার আইনি অসঙ্গতি তুলে ধরে জানায়, সাইবার সুরক্ষা আইনের ২৫ ধারা অনুযায়ী ব্ল্যাকমেইলিং বলতে এমন কোনো হুমকিকে বোঝায় যার মাধ্যমে কাউকে বেআইনি সুবিধা দিতে বাধ্য করা হয়। তবে মামলার এজাহারে চিফ হুইপকে ঠিক কোনো ধরনের সুবিধা দিতে বা কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছে তার কোনো সুনির্দিষ্ট বিবরণ নেই।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, তারেক রহমান ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট রাজনৈতিক কার্টুন আঁকার স্বাধীনতা নিয়ে আনন্দ প্রকাশ করে বলেছিলেন— ‘আমি গভীরভাবে আনন্দিত যে বাংলাদেশে রাজনৈতিক কার্টুন আঁকার স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করা হয়েছে’। কিন্তু তার সরকারের দুই মাস পূর্ণ হতেই একজন অ্যাক্টিভিস্ট কার্টুন প্রচারের স্বাধীনতা হারিয়েছে এবং একটি জামিনযোগ্য মামলায় কারাগারে গিয়েছে।
এই ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একজন নাগরিককে বেআইনিভাবে গ্রেপ্তার ও হয়রানির মাধ্যমে চরম অপেশাদারিত্ব ও আইনি জ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছে বলে মনে করছে এনসিপি।
গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতীয় নাগরিক পার্টি হাসান নাসিমের অনতিবিলম্বে মুক্তি দাবি এবং এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানতে চেয়েছে।
আপনার মন্তব্য