নিজস্ব প্রতিবেদক

২৭ মে, ২০২৬ ২০:১৩

‘গেল ঈদেও মেয়েটি আমার হাত ধরে হেঁটেছে, এবার সে নেই’

ঈদের আনন্দ নেই হামে মারা যাওয়া শিশুদের পরিবারে

গেল ঈদে (রমজানের ঈদে) মেয়েটি আমার হাত ধরে হেঁটেছে। বড় বোনের বাড়ি বেড়াতে নিয়ে গিয়েছিলাম। বাবা এটা দাও, ওটা দাও, কত কী চাওয়া তাঁর। এবারতো সে নেই, আমাদের পরিবারেও নেই ঈদের আনন্দ। ঈদ নিয়ে কোনো আয়োজনও নেই।

হামের উপসর্গ নিয়ে গত বৃহস্পতিবার মারা যাওয়া সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের মনিপুর হাটির শিশু শামীমা বেগমের বাবা মো. আজিজুল হক মেয়ে হারানোর কষ্ট বর্ণনা করার সময় কথাগুলো বলছিলেন।

আজিজুল হক জানান, তাঁর তিন সন্তান। ছোট সন্তান শামীমাকে পাঁচ মাস বয়সের রেখে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। ওখানে যা উপার্জন করেছেন নিয়মিত বাড়িতে পাঠাতেন। আর স্ত্রীকে বলতেন, আমার ছোট মেয়ে যা চাইবে, সব কিনে দিও। তিন বছর পাঁচ মাস পর বাড়ি এসে দেখেন মেয়ে আব্বা ডাকতে শিখেছে। মেয়ে হারানোর কষ্ট ভুলতে পারছেন না তিনি। পরিবারের কেউই পারছে না তাকে (শামীমাকে) ভুলতে। ওর মা (নাজমিন বেগম) এখনও স্বাভাবিক হতে পারেনি।

আজিজুল বলেন, জন্মের পরে টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে শারীরিক সমস্যা দেখা দেয় শামীমার। পরে কয়েক দফায় সিলেট চিকিৎসা করান তারা। এতে হামের দুটি টিকা দেওয়া হয়নি। কয়েক দিন আগে পাতলা পায়খানাজনিত সমস্যায় আক্রান্ত হলে শামীমাকে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে তার শরীরে র‍্যাশ দেখা দিলে চিকিৎসকরা তাকে হাম আক্রান্ত বলে সন্দেহ করেন। মেয়ে মারা যাওয়ার প্রায় এক ঘণ্টা ২০ মিনিট আগে তাকে আইসিইউতে রাখতে সিলেটে নেওয়ার কথা বলা হয়। সাধারণ অক্সিজেন দেওয়ার পরও মেয়ের শ্বাসকষ্ট কমেনি। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, জেলার সবচেয়ে বড় হাসপাতাল হলেও এখানে আইসিইউ নেই। দ্রুত এখানে আইসিইউ সুবিধা চালু হোক, যাতে আর কোনো শিশুর এমন পরিণতি না হয়।

শিশুটির মা মোছা. নাজমিন বেগম আক্ষেপ করে বলেন, ‘চিকিৎসকরা যদি আগে বলতো এখানে (সুনামগঞ্জ) আইসিইউ নেই, তাহলে আমরা সিলেট নিয়ে যেতাম। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় অবস্থার অবনতি হলে সিলেটে নিতে বলে। কিছুক্ষণ পরই বাচ্চা মারা যায়।’

আজিজুল হক বলেন, দুদিন পর ঈদ। প্রতিটি মূহূর্তে মেয়েটির কথা মনে হচ্ছে। ওর মায়ের কান্নাও থামেনি। কী বলে সান্ত্বনা দিই তাকে, টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়েও তো সুস্থ হয়েছিল মেয়েটি। এবার আর বাঁচল না।

সিলেটে এ পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গে মারা গেছে ৫৪ শিশু। এদের পরিবারে এবার নেই ঈদের আনন্দ।

আজিজুল হকের পরিবারসহ সুনামগঞ্জের হাম সন্দেহে মারা যাওয়া ২০ শিশুর পরিবারে শোকের মাতম চলছে। কোরবানির ঈদ তাদের জন্য কষ্টের হয়ে এসেছে।
গেল আট এপ্রিল থেকে ২৫ মে পর্যন্ত হাম সন্দেহে যেসব শিশু মারা গেছে এরা হলো– শান্তিগঞ্জ উপজেলার সুন্নাহ মিয়ার ছেলে মুসতাকিন (৬ মাস), সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার আব্দুল মালিকের ছেলে আব্দুর রহমান (১০ মাস), জগন্নাথপুর উপজেলার সরল মিয়ার ছেলে ওয়াজিহা (১ বছর ৬ মাস), দিরাই উপজেলার জাহির মিয়ার ছেলে আরিফ (১০ মাস), দিরাই উপজেলার টুটুল সরকারের ছেলে প্রিয়ম সরকার (৫ মাস), শান্তিগঞ্জ উপজেলার মিজানুর রহমানের ছেলে সাজু (২ বছর), সুনামগঞ্জের রিপনের ছেলে আব্দুল্লাহ (১০ মাস), আনসারের ছেলে তউফিক (৫ মাস), ছাতক উপজেলার ইব্রাহিমের মেয়ে আরিশা (২৯ দিন), বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ধনপুর ইউনিয়নের সুরেশনগর গ্রামের জাকারিয়ার মেয়ে জারা (৭ মাস), জগন্নাথপুর উপজেলার বিল্লালের মেয়ে রাইসা (১ বছর ৫ মাস), ছাতক উপজেলার আবুল হোসাইনের মেয়ে রাফা আক্তার (৮ মাস), ছাতক উপজেলার ইছহাক আলীর ছেলে আলী আফসান (৬ বছর ২৭ দিন), জগন্নাথপুর উপজেলার নিজামের ছেলে মহিবুর (৯ মাস) ও দিরাই উপজেলার নিপেশ রায়ের ছেলে নিলয় রায় (৬ মাস)। এরা সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা গেছে।

এদিকে সিলেটের শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে দিরাই উপজেলার রাসেল আহমদের মেয়ে রায়হানা (৮ মাস), ছাতক উপজেলার তোফায়েল আহমেদের মেয়ে আয়রা জান্নাত (৮ মাস), দিরাই উপজেলার জগদল ইউনিয়নের মোসাদ্দেক মিয়ার মেয়ে মুসলিমা (১০ মাস), দোয়ারাবাজার উপজেলার রমজান আলীর ছেলে মহসিন (১ বছর ২ মাস) মারা যায়। এ ছাড়া গত ২২ মে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার আজিজের মেয়ে শামীমা (৪ বছর ২ মাস) মারা যায়।

এদের মধ্যে স্বাস্থ্য বিভাগের রিপোর্টে বলা হয়, নিশ্চিত হামে একজনের ও সন্দেহজনক হামে ১৯ জনের মৃত্যু ঘটেছে।

সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, হামে আক্রান্ত রোগীর অবস্থা খারাপ হলে আমরা সিলেটে রেফার করি। হাসপাতালে আইসিইউ চালু করা গেলে রোগীদের আরও ভালো সেবা দেওয়া সম্ভব হতো।
সিভিল সার্জন ডা. জসিম উদ্দিন বলেন, সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায় সোমবার পর্যন্ত ১৯ শিশুর হাম আক্রান্ত সন্দেহে মৃত্যু ঘটেছে, একজনের হামে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

তিনি জানান, তারা এখন টিকার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী সব শিশুকে কেন্দ্রে টিকা দেওয়া হচ্ছে। কেউ কেন্দ্রে না আসতে পারলে বাড়িতে গিয়েও দেওয়া হচ্ছে টিকা। মায়েদের সন্তান জন্মের পর প্রথম ছয় মাস বুকের দুধ এবং শিশুদের পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানোর জন্য সচেতন করা হচ্ছে।

সূত্র: সমকাল

আপনার মন্তব্য

আলোচিত