১৫ জুলাই, ২০২৬ ১৪:০০
মঙ্গলবার সকালটা যেন অন্য দিনের মতো ছিল না। শ্রীমঙ্গলের বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের আঙিনায় ছিল এক অদ্ভুত নীরবতা। যেখানে প্রতিদিন আহত পাখির ডানা ঝাপটানি, বানরের চঞ্চলতা কিংবা উদ্ধার হওয়া বন্য প্রাণীদের জীবন ফিরে পাওয়ার গল্প শোনা যেত, সেখানে শুধু শোকের ভারী নিস্তব্ধতা। চলে গেলেন সেই মানুষটি, যিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন নির্বাক প্রাণীদের জন্য।
বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও দেশের বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ সিতেশ রঞ্জন দেব, সবার প্রিয় 'সিতেশ বাবু', মঙ্গলবার সকালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি ১৯৪৯ সালের ৯ অক্টোবর ন্মগ্রহন করেন।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, সকালে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিসসহ বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। মঙ্গলবার দুপুর ২টায় শ্রীমঙ্গলের নোয়াগ্রামে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
জানা যায়, বাবা শ্রীশ দেব ছিলেন শৌখিন বন্যপ্রাণী সেবক। আহত ও অসুস্থ বিভিন্ন প্রাণী ধরে বাড়িতে নিয়ে আসতেন, সেগুলোর যত্ন করতেন। ১৯৬২ সাল থেকেই বাবা শ্রীশ দেব প্রাণীসেবা শুরু করেন। প্রাণীর প্রতি বাবার সেই ভালোবাসা ও সেবা দেখে ছোট সিতেশ বাবুর মধ্যেও বন্যপ্রাণীর প্রতি ভালোবাসার জন্ম হয়। সেই ভালোবাসা তার জীবনে বড় ক্ষতি নিয়ে এলেও এখনো প্রাণীসেবা করে যাচ্ছেন। ৭৪ বছর বয়সী সিতেশ বাবু নিজ উদ্যোগে অসুস্থ বন্যপ্রাণীর সেবা ও লালন-পালনের জন্য গড়ে তুলেছেন চিড়িয়াখানা। এসব প্রাণীর সেবা ও লালন-পালন শেষে আবার বনে অবমুক্ত করেন তিনি।
সেই উপলব্ধিই বদলে দেয় তাঁর পুরো জীবন। হাতে বন্দুকের বদলে উঠে আসে সেবার হাত। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে।
মানুষের হাতে নির্যাতিত, বৈদ্যুতিক তারে জড়িয়ে আহত, অ্যাসিডে ঝলসে যাওয়া, সড়ক দুর্ঘটনায় জখম কিংবা পাচারকারীদের কবল থেকে উদ্ধার হওয়া অসংখ্য বন্য প্রাণীর শেষ ঠিকানা ছিল শ্রীমঙ্গলের বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন।
নিজ বাড়ির ছোট্ট একটি প্রাণী সেবাকেন্দ্র থেকে শুরু হয়েছিল এই যাত্রা। পরে রুপসপুর বাগানবাড়িতে স্থানান্তরিত হয়ে সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন।
গত কয়েক দশকে তাঁর হাত ধরে চিকিৎসা ও পরিচর্যা পেয়ে হাজার হাজার বন্য প্রাণী সুস্থ হয়ে আবার ফিরে গেছে প্রকৃতির কোলে।
দেশের যেকোনো প্রান্তে লোকালয়ে বন্য প্রাণী ঢুকলেই বন বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিভিন্ন উদ্ধারকারী সংগঠন কিংবা সাধারণ মানুষের প্রথম ভরসা ছিলেন সিতেশ বাবু। বন্য প্রাণী উদ্ধারে তাঁর নিরলস পরিশ্রম, দক্ষতা ও মানবিকতা তাঁকে দেশের সবচেয়ে বিশ্বস্ত প্রাণীসেবকদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। শুধু প্রাণী উদ্ধার নয়, বন্য প্রাণী হত্যা ও পাচার রোধ, পরিবেশ সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ এবং জনসচেতনতা তৈরিতেও তিনি রেখে গেছেন অসামান্য অবদান।
জানা যায়, ১৯৬২ সাল থেকে শখের বশে বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ শুরু করেন সিতেশ রঞ্জন দেবের বাবা শ্রীশ দেব। বিভিন্ন প্রাণী ধরে এনে বাড়িতে সেবা করতেন তিনি। প্রাণী ধরার কৌশল এবং তাদের প্রতি বাবার এমন মমত্ববোধ দেখে সিতেশ দেবও তা শেখেন। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় নিজ বাড়িতে গড়ে তোলেন পশুপাখি সেবাশ্রম।
১৯৭১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে গড়ে তোলা হয় সিতেশ রঞ্জন দেবের পশুপাখি সেবাশ্রম। ২০১১ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তায় গড়ে ওঠে বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন ।
ভালুকের থাবায় চোখ হারান
১৯৯১ সালের জানুয়ারি। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার ধলই ভেলীর পাত্রখলা চা বাগানের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কিছু মানুষ আসেন সিতেশ রঞ্জন দেবের কাছে। বন্য শূকর তাদের জমির ফসল নষ্ট করে ফেলছে। শূকরের হাত থেকে ফসল রক্ষার কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছেন না তারা। এ কারণে শূকরের হাত থেকে ফসল রক্ষার জন্য দ্বারস্থ হন সিতেশ বাবুর। ঘটনা বিস্তারিত শুনে শূকরের উৎপাত থেকে ফসল রক্ষার সিদ্ধান্ত নেন সিতেশ বাবু।
১৪ জানুয়ারি ভোরবেলা ঘন কুয়াশায় ঢাকা পাত্রখলা চা বাগানের নলখাগড়ার বনে কাঁধে বন্ধুক নিয়ে ছুটে যান সিতেশ বাবু। চা বাগানের কয়েকজন শ্রমিককে সঙ্গে নিয়ে খুঁজতে থাকেন বন্য শূকর। প্রখর দৃষ্টি রেখে সামনে এগোতে এগোতে কখন যে শ্রমিকদের থেকে অনেক দূরে চলে যান টেরই পাননি তিনি। সমান্তরাল পথে চলতে চলতে হঠাৎ অনুভব করেন উঁচু কোনো কিছুতে পা ফেলেছেন। আর পা ফেলার সঙ্গে সঙ্গে সেটি তাকে ফেলে দেয়। সেই মুহূর্তে হঠাৎ এক ভালুক সিতেশ বাবুর মুখের এক পাশে থাবা বসিয়ে দেয়। সঙ্গে সঙ্গেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি।
প্রাণে বাঁচতে তৎক্ষণাৎ এক হাতে থাকা বন্দুক দিয়ে ভালুকটি লক্ষ করে গুলি করেন গুরুতর আহত সিতেশ বাবু। গুলির আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে ভালুকটি, একপর্যায়ে মৃতুও হয়। সেসময় সিতেশ বাবুর ওপর ভালুকের আক্রমণের খবর জানতে না পারলেও গুলির শব্দে তার সঙ্গে যাওয়া শ্রমিকরা ছুটে আসেন। মৃত ভালুকের পাশে গুরুতর আহত অবস্থায় তারা দেখতে পান সিতেশ বাবুকে। তার এক চোখ, নাক ও মুখের একাংশ পুরোটাই তুলে নেয় ভালুকটি।
পরে গুরুতর আহত সিতেশ বাবুকে পাত্রখলা চা বাগানের ব্যবস্থাপকের গাড়িতে হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থা বেশি গুরুতর হওয়ায় সেখান থেকে তাকে পাঠানো হয় ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে। পরে পঙ্গু হাসপাতাল থেকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেওয়া হয়। এরপর নিয়ে যাওয়া হয় ভারতের কলকাতায়।
চিকিৎসকদের প্রাণান্তকর চেষ্টা ও বন্ধুদের সহায়তায় প্রাণে বেঁচে যান সিতেশ বাবু। তবে ফিরে পাননি মুখের আগের অবয়ব। সাতবার অপারেশন আর মুখে প্লাস্টিক সার্জারি শেষে এখন এক চোখ, মুখে কৃত্রিম দাঁত ও নাকের একটু ছিদ্র দিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস চালিয়ে বেঁচে আছেন তিনি।
আদর্শ রেখে গেলেন উত্তরসূরিদের হাতে
শারীরিক অসুস্থতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে তাঁর দুই ছেলে সজল দেব ও সঞ্জিত দেব বাবার দেখানো পথেই বন্য প্রাণী উদ্ধার ও সেবার দায়িত্ব পালন করে আসছেন। মৃত্যুর আগেই তিনি নিশ্চিত করে গেছেন, এই মানবিক দায়িত্ব যেন থেমে না যায়।
স্তব্ধ ফাউন্ডেশন, যেন নির্বাক প্রাণীরাও শোকাহত
সিতেশ বাবুর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই শোকের ছায়া নেমে আসে পুরো শ্রীমঙ্গলে। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ শ্রীমঙ্গল শাখার সভাপতি ডা. হরিপদ রায় বলেন, "সিতেশ বাবুর মতো মানুষ যুগে যুগে জন্ম নেন না। তিনি নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন নির্বাক প্রাণীদের জন্য। তাঁর চলে যাওয়া শুধু শ্রীমঙ্গলের নয়, পুরো দেশের অপূরণীয় ক্ষতি।"
শ্রীমঙ্গল প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির নেতা জহর তরফদার ও একরামুল কবির বলেন, "আজ যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন। যে মানুষটির স্নেহ-ভালোবাসায় প্রতিদিন মুখর থাকত অসংখ্য উদ্ধার হওয়া পশু-পাখি, সেই অভিভাবককে হারিয়ে যেন তারাও নিস্তেজ। খাঁচায় বন্দী কিংবা চিকিৎসাধীন প্রাণীগুলোর চোখেও যেন প্রশ্ন, কোথায় আমাদের সেই সিতেশ বাবু?"
সিতেশ রঞ্জন দেবের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী, বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং প্রকৃতিপ্রেমীরা।
আপনার মন্তব্য