৩০ মে, ২০২৬ ১৪:৩২
মৌলভীবাজারে কোরবানির পশুর চামড়া কিনছেন না কেউ।। অন্যান্য বছর এতিমখানা কিংবা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে চামড়া সংগ্রহ কররলেও এবার তারাও বাড়ি বাড়িবাড়ি যাচ্ছেন না। ফলে বিক্রি করতে না পেরে অনেকে চামড়া মাটি চাপা দিয়েছেন। কেউ কেউ আবার নদনদীতে ভাসিয়ে দিয়েছেন।
এদিকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা চামড়া কিনে আরও বড় বিপদে পড়েছেন। কেনা দামের চেয়ে অনেক কম দাম বলছেন আড়তদাররা। তারা না পারছেন চামড়া বিক্রি করতে, না পারছেন ফেরত নিয়ে যেতে।
সদর উপজেলার আমতৈল গ্রামের নওয়াব আলী বলেন, ‘দুখান চামড়া তিন শ টাকায় কিনেছিলাম আর ১০ খান চামড়া কোরবানিদাতারা দান করেছিলেন। শহরের পৌর বাস টার্মিনালে বিক্রি করতে এসেছিলাম। কোনো ক্রেতা এক টাকাও দাম দিতে রাজি নন। আসা-যাওয়ার রিকশা ভাড়া গচ্চা, সাথে একদিনের রোজ গেল। আমের সাথে ছালাও হারালাম।’
নওয়াব আলীর মতো অনেকেই একই ধরনের কথা বলেছেন। শুক্রবার বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত জেলার প্রধান চামড়ার হাট বালিকান্দিসহ প্রায় সব জায়গায় একই চিত্র দেখা গেছে।
মনু নদীর তীরে কথা হলে চামড়া ব্যবসায়ী হাফিজ এনামুল হক শাহনুর বলেন, “লবণ সংকটের কারণে আমরা চামড়া নষ্ট ঠেকাতে পারিনি। এ কারণে আমি ৪০০-৫০০ চামড়া নদীতে ফেলে দিচ্ছি।”
চামড়া শ্রমিক আল-আমিন বলেন, “প্রতিবছর কোরবানির ঈদ আসলে লবণের দাম বেড়ে যায়। চামড়ার প্রাথমিক প্রক্রিয়া করতে না পারায় আমি মালিকের ৪০০ চামড়া নদীতে ফেলে দিচ্ছি।”
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বালিকান্দি গ্রামের হাটে প্রায় দুই শ বছর ধরে চামড়া বেচাকেনা হয়। গ্রামের সৈয়দ মুজাহিদ আলী (এক সময়ের চামড়া ব্যবসায়ী) জানান, এই গ্রামের মানুষ বংশ পরম্পরায় কাঁচা চামড়ার ব্যবসা করে আসছেন। গত ১০-১২ বছর ধরে চামড়ার বাজারে ধস নেমেছে। ফলে অনেকে বাপ-দাদার ব্যবসা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন। তাদের কারো লাখ, কারো কোটি টাকা ট্যানারি মালিকরা আটকে রেখে পথে বসিয়েছেন।
সত্তরোর্ধ চামড়া ব্যবসায়ী সুলেমান মিয়া শুক্রবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে জানান, এখন পর্যন্ত ৫ শর বেশি চামড়া কেনা হয়েছে। ১০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত দাম পড়েছে। শেষ পর্যন্ত কটা কিনতে পারবেন আগেই বলা যাবে না। তিনি জানান, লবণের অভাবে ক্রয় করা সব চামড়া প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হবে না। ফলে নষ্ট চামড়া নিয়ে বিপাকে পড়তে হবে।
বালিকান্দিবাজার চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি শওকত আলী বলেন, ট্যানারি মালিক ও আড়তদারদের কাছে গত বছরের ৯৫ লাখ টাকা এখনও বকেয়া। এ বছর দুই হাজারের মতো চামড়া কিনে লবণ লাগানো হয়েছে। তিনি জানান, প্রয়োজন তিন-চার শ মণ লবণ। মজুত আছে মাত্র দেড় শ মণ। লবণের অভাবে দুর্গন্ধ ধরা চামড়া ও বর্জ্য মাটি চাপা দিতে হবে। অথবা মনু নদে ভাসিয়ে দিতে হবে, এছাড়া উপায় নেই।
চামড়া থেকে মাংস আলাদা করা শ্রমিক মাহমদ আলী জানান, যেসব চামড়া কেনা-বেচা হচ্ছে সবই এক-দেড় শ টাকায়। চামড়া ব্যবসায়ীরা গল্প মারেন ৬-৭ শ টাকায় চামড়া কিনেছেন।
তিনি বলেন, কিছু এতিমখানার হুজুর চামড়া নিয়ে অমুক-তমুকের কাছে ধর্ণা দিলেও কেউ কিনতে রাজি হচ্ছে না।
সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার আব্দুস শহীদ বলেন, ৩০টি চামড়া ৬ হাজার টাকায় কিনে এনে বিপদে পড়েছেন। ক্রেতারা একেকটি চামড়ার দাম বলছেন মাত্র ৩০-৪০ টাকা।
চামড়া ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলী জানান, আগে সারা বছর বালিকান্দির অন্তত ২৫-৩০ জন চামড়া কেনাবেচা করতেন। এখন শওকত মেম্বার, সুলেমান মিয়া, আনেয়ার মিয়া, জামাল মিয়া ও সানুর মিয়া নিয়মিত এই ব্যবসা করেন। আরও ২০-২৫ জন মৌসুমী ব্যবসায়ী রয়েছেন।
আপনার মন্তব্য