শাকিলা ববি, হবিগঞ্জ

২৬ মে, ২০১৬ ১৪:৩০

শুধু অত্যাচার আর লাঞ্ছনা সহ্য করেছেন 'মধুর মা'

'মা' দশ মাস দশ দিন গর্ভে রেখে আমাদেরকে যিনি পৃথিবীর আলো দেখান। শত অন্যায়, অপরাদ, ভুল করেও যার কাছে আমরা নিরাপদ থাকি, তিনি হলেন মা। মায়ের সঙ্গায়ন করতে গেলে লাইনের পর লাইন লিখা যাবে কিন্তু সঙ্গায়ন শেষ হবে না।

গত ২১ মে সিলেট টুডে টুয়েন্টিফোরে ‘ছেলের বউ মারে’, তাই বৃষ্টির মধ্যে রাস্তায় বৃদ্ধা এই সংবাদটি প্রকাশিত হয় এবং ওই রাতেই বৃদ্ধাকে পুলিশের সহযোগিতায় সমাজসেবা অধিদপ্তরের সেইভহোমে পাঠানো হয়।

'মধুর মা' নামে সেই বৃদ্ধার বিস্তারিত তথ্য জানতে মাধবপুর উপজেলার চৌমুহনী ইউনিয়নের তার গ্রাম নয়নপুরে গিয়ে জানা যায় ছেলে ও ছেলের বউদের কাছে নির্যাতিত হওয়ার আরো করুন ইতিহাস।

'মধুর মা”নামক এই বৃদ্ধার জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী নাম মোছাঃ নূর চাঁন, স্বামী মৃতঃ সফর আলী, জন্ম তারিখ ৮ ফেব্রুয়ারি ১৯১৬। এ তারিখ অনুযায়ী এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের ৮ তারিখে ১০০ বছর পার করেছেন এই বৃদ্ধা। গ্রামবাসীরা জানান তার ৩ ছেলে ১ মেয়ে। ছেলেদের নাম আব্দুল সালাম, আব্দুল কালম ও আব্দুল মালেক।

নয়নপুর গ্রামে গিয়ে মধুর মা নাম বলতেই তার বাড়িতে নিয়ে গেলেন এলাকার কয়েকজন কিন্তু তার বাড়িতে কোনো ঘরের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। খালি জায়গায় ময়লা আবর্জনা ছাড়া কিছুই নেই তার ভিটায়। তার প্রতিবেশিরা জানান, অনেক বছর হয়ে গেছে তার ভিটার ঘরটি ঝড়- তুফানে ভেঙ্গে গেছে। আর এ জায়গাটি তার ছেলে সালাম ও মালেক জালিয়াতি করে তার কাছ থেকে রেজিস্ট্রারি করে নিয়েছে।

তার প্রতিবেশি সকিনা, খুদেজা ও মিনারা বেগম জানান, মধুর মা-র স্বামী শফর আলী ছেলে-মেয়েদের ছোট রেখেই মারা যান। তখন থেকেই তিনি মানুষের বাড়িতে কাজ করে সন্তানদের বড় করেন। ছেলেরা প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পর বিয়েও করান তিনি। ছেলেদের বিয়ে করানোর পরই শুরু হয় তার র্দূগতি। বিয়ের পরই তার ছেলেরা বউদের কথামত চলতে শুরু করে। প্রায় ২০ বছর আগে তার তিন ছেলে গ্রাম ছেড়ে সিলেটে চলে যায়। সিলেটে যাওয়ার পর তারা মায়ের কোনো খোজঁ খবর রাখেনি এমনকি ৩ ছেলে তার সাথে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ রাখে। এর পর থেকে তিনি চৌমুহনী ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে ভিক্ষা করে জীবিকা নির্বাহ করা শুরু করেন। এ পর্যায়ে তিনি মানসিক ভাবে অসুস্ত হয়ে পরেছেন বলে এলাকাবাসী বুঝতে পারেন। তখন তিনি বিভিন্ন মানুষের বাড়িতে বিভিন্ন মেয়াদে বসবাস করেছেন।

নয়নপুর গ্রামের জাহানার, জোৎসনা বেগম ও মালেকা বেগমের বাড়িতে র্দীঘ দিন বসবাস করেন তিনি। তারা জানান, উনি (মধুর মা) অনেক দিন আমাদের বাড়িতে থাকছেন। ৩টা যোগ্য ছেলে থাকতেও উনি অসহায় হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতেন তাই আমাদের বাড়িতে যতদিন ছিলেন আমরা আমাদের সাধ্যমত যত্ন করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তার মানসিক সমস্যা থাকায় এক জায়গায় বেশিদিন থাকতেন না। যখন যেখানে মন চায় সেখানে যেতেন।

তার প্রতিবেশিরা জানান, তার ছেলে ছেলের বউরা অনেক অত্যাচার করেছে তার উপর। একবার তার ছোট ছেলে মালেকের আতপ ও বিন্নি ধানের খুব ভালো ফলন হয়। তিনি রুটি খাওয়ার জন্য কিছু আতপ চাল দেয়ার অনুরুধ করেন ছেলেকে কিন্তু তারা ছেলে আর ছেলের বউ চাল না দিয়ে আটা কিনে রুটি খাবার কথা বলে বাড়ি থেকে বের করে দেন।

তার সমবয়সী সখি ছমন বিবি জানান, মধুর মা তার জায়গা জমি বিক্রি করে তার ছেলেদের বড় করেছেন। আমাদের সাথে কথা বলার সময় চোখে অশ্রু ধরে রাখতে পারেনি ছমন বিবি। কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন আজকাল বৃদ্ধ বাবা মাকে সন্তানরা দেখাশুনা করে না। আমি দেখেছি স্বামী মারা যাওয়ার পর মধুর মা কত কষ্টে ছেলেদের লালন পালন করেছেন। এখন ছেলেরা বউ পাইলে মা লাগে না। আজকে মধুর মারে আপনারা পাইছেন, আগামিকাল যে আমার সাথে এমন আচরন হবে না তার কোনো নিশ্চয়তা নাই।

গ্রামবাসী জানান, সিলেটে যাওয়ার বছর খানেক আগে তিনি তার ভাইয়ের ছেলে আব্দুল হাইয়ের বাড়িতে থাকতেন।

তার ভাইয়ের ছেলে আব্দুল হাই জানান, আমার ফুফুর ছেলেরা অমানুষ। এই ছেলেদের জন্য কি না করেছেন, জায়গা জমি বিক্রি করেন টাকা দিয়েছেন ছেলেদের এমনকি উনার বয়স্ক ভাতার টাকাও তারা মাসে মাসে নিয়ে যেত। উনি মানসিক ভাবে অসুস্ত হয়ে পড়ায় কারো কথা শুনতেন না। আবোল তাবোল কথা বলতেন তাই আমি ও আমার ছেলেরা তাকে আমাদের বাড়িতে রাখি। সিলেট যাবার আগে প্রায় ১ বছর তিনি আমাদের কাছেই থাকছেন। উনার শারীরিক অবস্থার অবনতি দেখে অনেকবার তার ছেলেদের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে ব্যার্থ হয়েছি। শেষ পর্যন্ত ১ বছর আগে তাদের মায়ের মিথ্যা মৃত্যুর খবর দিয়ে তার ছেলেদের গ্রামে আনি। তারপরও তারা মায়ের দায়িত্ব নিতে অপারগতা জানায়। পরে গ্রামবাসী ও আমার চাপে তারা তাদের মাকে সিলেট নিয়ে যান।

গত ৭মে আমি তার ছোট ছেলে মালেকের বাসায় যাই ফুফুর সাথে দেখা করার জন্য। আমি গিয়ে জিজ্ঞাস করি ফুফু কই? মালেকের বউ হাজেরা বলে কই চলে গেছে জানি না। মনে হয় হারাইয়া গেছে। আমি বলি তাকে খোজেঁ বের করার জন্য কিন্তু তাকে খোজাঁর ব্যাপারে তারা অনিহা প্রকাশ করে। আমি বুঝতে পারি তারা তাদের মায়ের দেখাশুনা করছে নিজেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাই ফুফুকে তারা ৩ ভাই পর্যায়ক্রমে তাদের বাসায় রাখেন। তিনি নিখোজঁ হওয়ার আগে তার ছোট ছেলে মালেকের কলাপারা বাসায় ছিলেন।

তার ফুফুকে আবার তিনি আশ্রয় দিবেন কিনা জানতে চাইলে আব্দুল হাই বলেন,আপনার চেষ্টা করে দেখেন ফুফুর আপন ছেলেরা তার দায়িত্ব নেয় কিনা। কারন তারা এমন গরিব না যে নিজের মাকে লালন পালন করতে পারবে না। তারা যদি দায়িত্ব না নেয় তাহলে আমার সাথে যোগাযোগ কইরেন। তবে আমি চাই তার ৩ ছেলের আর তার বউদের শাস্তি হোক, প্রশাসনের সহযোগিতায় তার ৩ ছেলে ও বউদের শাস্তির ব্যবস্থা করেন। এই শাস্তি যেনো বাংলাদেশে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে ঐ সব পাষন্ড কুলাঙ্গার ছেলেদের জন্য।

সিলেট টুডে টুয়েন্টিফোর তার ছোট ছেলে আব্দুল মালেকের সাথে মোবাইলে যোগযোগ করেলে আব্দুল মালেক বলেন, তিনি সময় পাচ্ছেন না মাকে নিয়ে আসার জন্য বলে মোবাইলের লাইন কেটে দেন।

গত ২১ মে বৃদ্ধার ঠিকানা খোঁজতে নয়নপুর গ্রামের ইকবাল হোসেনের সাথে কথা হয়। ইকবাল হোসেন সিলেট টুডে টুয়েন্টিফোরকে জানান আমি ঐ দিন মালেকের সাথে যোগাযোগ করার জন্য মোবাইলে কল দেই ঐ সময় তার বউ হাজেরা কল ধরলে তাকে বলি তার শ্বাশুরীকে পাওয়া গেছে। হাজেরা বলে ‘তাই হারাইছে ভালো হইছে, বিপদ গেছে, আমরা আনতামনা এই বিপদরে।’

নয়নপুর গ্রামের সবাই জানে মধুর মা’র এই করুন কাহিনী। গ্রামবাসী বলেন, তার ছেলে ছেলের বউরা অনেক অত্যাচার করেছে তার উপর। তাই আমাদের কাছে গ্রামবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এই কুলাঙ্গার ছেলেদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান তারা। তাদের শাস্তি দেখে যেন মা বাবার উপর অত্যাচারকারী অন্য কুলাঙ্গারদের শিক্ষা হয়ে যায়।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত