তপন কুমার দাস, বড়লেখা

২৯ এপ্রিল, ২০১৯ ১৯:৪০

টিনের বেড়া, পাকা ভিটেয় স্বপ্ন পূরণ তাদের

বৃষ্টির সময় ভাঙা টিনের ছাউনি দিয়ে ঘরে পানি পড়েছে। তুফানের সময় অনেক ভয়ে থাকতেন। কতবার ঘরের টিন উড়িয়ে নিয়েছে ঝড়-তুফান। ঝড়-তুফানের সময় কতবার সন্তানদের নিয়ে অন্যের পাকা ঘরে আশ্রয় নিতে হয়েছে, সে হিসেব মনে নেই। কোনোদিন টিনের বেড়া আর নিচ পাকা করা ভিটার একটি ঘর হবে। তাতে বসবাস করতে পারবেন। এ কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি। কারণ সেই সামর্থ্য তার ছিল না। তবে সে স্বপ্ন এখন তার পূরণ হয়েছে। না চাইতেই টিনের বেড়া, ঘরের নিচ ও বারান্দা পাকা করা ঘর হয়েছে। এখন আর ঝড়-তুফানে কষ্ট করতে হবে না সন্তানদের নিয়ে। আর এই স্বপ্ন পূরণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী।

কোনো নাটক বা সিনেমার গল্প নয়, এটি মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়নের পূর্ব দৌলতপুর গ্রামের লাল বিবির একটি স্বপ্নের ঘরের গল্প। শুধু লাল বিবি নন, তার মত বড়লেখা উপজেলার আরো ৪৫টি হতদরিদ্র পরিবার মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়ে খুশিতে আত্মহারা।

‘আশ্রয়নের অধিকার, শেখ হাসিনার উপহার’ আশ্রয়ন-২ প্রকল্পের অধীনে ‘যার জমি আছে ঘর নাই, তার নিজের জমিতে’ গৃহ নির্মাণের আওতায় তিনি একটি সেমি পাকা ঘর পেয়েছেন।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, আশ্রয়ন-২ প্রকল্পের অধীনে বড়লেখা উপজেলায় ৪৬টি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। একটি ঘর নির্মাণ কাজে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ টাকা করে। একটি শৌচাগার, পাকা ভিটা ও বারান্দা, টিনের বেড়াসহ থাকার ঘর। প্রথম ধাপে উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়নে ১৩টি, দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নে ১৬টি, বড়লেখা সদর ইউনিয়নে ১২টি, নিজবাহাদুরপুর ইউনিয়নে ২টি ও দক্ষিণভাগ দক্ষিণ ইউনিয়নে এলাকায় ৩টি পরিবারকে ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়। উপজেলা প্রশাসন এই নির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন করেছে।

বড়লেখা সদর ইউনিয়নের সোনাতোলা গ্রামের হতদরিদ্র বিধবা অনিতা দাস। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে জরাজীর্ণ মাটির ঘরে কোনো রকমে দিন পার করছিলেন তিনি। কিন্তু হঠাৎ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রকল্প তাঁর জীবনে আশীর্বাদ হয়ে আসে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে তাকে একটি সেমি পাকা ঘর ও স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার  নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালানো এই বিধবা নারী মাথা গোঁজার একটু ঠাঁই পেয়ে দারুণ খুশি।

বুধবার (২৪ এপ্রিল) সরেজমিনে কথা হয় অনিতা দাসের সাথে। অনিতা বলেন, ‘চোখে ঘুম আসত না। দিনে রোদ, রাতে বৃষ্টির যন্ত্রণা। কত কষ্ট করেছি। একটা ঘর পাওয়ায় এখন শান্তিতে ঘুমাতে পারছি। কোনো রোদ-বৃষ্টির ঝামেলা নাই। সরকারের কারণে একটা ঘর পাইছি।’

অনিতার মত বক্তব্য একই বাড়ির দিনমজুর দুলন দাসের। তিনিও একটি ঘর পেয়েছেন। তিনি জানান, ভাঙা মাটির ভেড়া। ভাঙা টিনের ঘর ছিল। কত কষ্ট করেছি। কোনোদিন চিন্তা করিনি একটি পাকা ঘর করতে পারব। যেখানে সংসার চালানোই কষ্ট হয়ে যায়। বিনা টাকায় ঘর পেয়েছি। অনেক ভালো লাগছে। এখন সারাদিন কষ্ট করে শান্তিতে ঘুমাতে পারছি।

মহদিকোনা গ্রামের মৎস্যজীবী হাজির আলী বলেন, ‘ছেলে মেয়েদের নিয়ে অনেক কষ্ট করেছি। ভাঙা ঘরে অনেক কষ্ট হয়েছে। তুফানের দিনে ভয় লাগত। মাছ বিক্রি করে সংসার চালাই। আমার জন্য একটি পাকা ঘর বানানো অনেক কঠিন। সরকার ঘর দেওয়ায় আমার কষ্টটা ঘুচেছে। মেঘের (বৃষ্টির) দিনে এখন ঘরে নিরাপদে থাকতে পারব।’

প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. উবায়েদ উল্লাহ খান বলেন, ‘সরেজমিনে তথ্য নিয়ে সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে দরিদ্র পরিবার বাছাই করা হয়। যাদের বাছাই করা হয়, তাদের ঘর নির্মাণের সামর্থ্য ছিল না। প্রথম ধাপের ঘরগুলোতে ভালো কাজ হয়েছে। শ্রীঘ্রই মাননীয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রী মহোদয় আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের কাছে ঘরের চাবি হস্তান্তর করবেন।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শামীম আল ইমরান বলেন, ‘৪৬টি ঘরের কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এবছর নতুন আরো ২২৩টি ঘর বরাদ্দ পেয়েছি। উপকারভোগীদের বাছাই করে তালিকা তৈরির কাজ চলছে। বাছাই শেষ হলে দ্রুত সেগুলোতে কাজ শুরু করা হবে।’

আপনার মন্তব্য

আলোচিত