০৪ মে, ২০১৯ ২০:০৮
শতবর্ষী ভবন আবু সিনা ছাত্রাবাস রক্ষায় এবার প্রতিবাদ হচ্ছে রং-তুলি আর ক্যানভাসে। এছাড়ার কবিতা ও ছাড়ার মাধ্যমেও প্রতিবাদ জানাচ্ছেন সিলেটের নাগরিকবৃন্দ।
শনিবার (৪ মে) বিকেলে ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে আবু সিনা ছাত্রাবাসে একদল চিত্রশিল্পী ও একটি কবিতার সংগঠন তাদের আয়োজনের মাধ্যমে এই ভবন ভাঙার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়।
‘সিলেটের শতবর্ষী আবু সিনা ছাত্রাবাসের ঐতিহ্য রক্ষার্থে - আর্ট ক্যাম্প’ শিরোনামে সিলেটের চারুশিল্পী সমন্বয় পর্ষদ নামের সংগঠনের প্রতিবাদী আর্ট ক্যাম্পের আয়োজন করে। এই সংগঠনের প্রায় ২৫ জন চিত্রশিল্পী ভবনের বিভিন্ন অংশের ছবি এঁকে প্রতিবাদ করেন। ছবি আঁকার মাধ্যমের মধ্যে ছিল এক্রেলিক, জলরং, কলম, পেন্সিল।
চিত্রশিল্পী শাহীন আহমদ বলেন, বেশ কয়েকদিন যাবত আমরা শুনতেছি এই ভবন ভাঙা হবে। এই ভবনটির সাথে শত বছরের ইতিহাস জড়িয়ে আছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের স্মৃতি আছে এই ভবনে। তাই আমরা চিত্র শিল্পী আমাদের ভাষায় প্রতিবাদ জানাচ্ছি। শুধু প্রতিবাদ নয় এই ভবনের স্মৃতি চিহ্ন ছবির মাধ্যমে সংগ্রহ করছি। তিনি বলেন, যদি সরকার এই ভবন ভেঙেই ফেলে তাহলে শেষ স্মৃতিটা সংরক্ষন করা আমাদের দায়িত্ব। সেই দায়িত্ববোদ থেকেই আমরা এসেছি ছবি আঁকতে।
চিত্রশিল্পী ইসমাইল গনি হিমন বলেন, আমরা শিল্পী তাই আমাদের প্রতিবাদের মাধ্যম শিল্প। শৈল্পিক এই প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য রক্ষায় আমরা বেছে নিয়েছি রং, তুলি, ক্যানভাস। এই ভবনটি শিল্পের ভান্ডার। এর মর্ম এখন সবাই না বুঝলেও ভবিষৎতে ঠিকই বুঝবে। আমাদের আগামী প্রজন্ম ভালো কিছু দিতে হলে এই ধরনের ইতিহাসকে রক্ষা করতে হবে। তাই আমরা লাটি হাতে নয় তুলি হাতে নিয়ে এই শতবর্ষী ভবন ধ্বংশ করার প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
একই সময়ে ভবনের অন্য দিকে কবিতা পাঠের আয়োজন করে কবিতার সংগঠন পাক্ষিক ঢালপত্র। ‘এতিহ্য রক্ষায় ছড়াপাঠ’ শিরোনামের এই আয়োজনে কবিতা পাঠ করেন সংগঠনের সভাপতি ছাড়াকার শাহাদাত বখত শাহেদ, কবি এখলাসুর রাহমান, ছড়াকার জয়নাল আবেদিন জুয়েল, কবি দুলাল শর্মা, কবি ধ্রুব দাশ প্রমুখ।
পাক্ষিক ঢালপত্রের সভাপতি ছাড়াকার শাহাদাত বখত শাহেদ বলেন, ঐতিহ্য ইতিহাস রক্ষার জন্য কবিতা ছাড়ার মাধ্যমে প্রতিবাদ জানাতেই আমরা এই আয়োজন করেছি। এই ভবনে অনেক স্মৃতি অনেক ইতিহাস। এগুলো এভাবে ধ্বংশ করা যাবে না। তিনি বলেন আমরা হাসপাতালের বিরুদ্ধে নই। কিন্তু ঐতিহ্য ভেঙে আমরা হাসপাতাল চাই না।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি সিলেট নগরের কেন্দ্রস্থলে ঐতিহাসিক আলিয়া মাদ্রাসা মাঠের দক্ষিণপ্রান্তে দেড়শত বছর প্রাচীন আদি-স্থাপত্য ভেঙ্গে ফেলে ২৫০ শয্যার হাসপাতাল নির্মানের ঘোষনা দেওয়া হয়। এই ঘোষনার পর মাসখানের আগে কাজ ভবন ভেঙে কাজ শুরু করতে গেলে সিলেটর সচেতন নাগরিকরা আন্দোলন শুরু করেন। এবং ভবনটি সংরক্ষণ ও সংস্কারের দাবি তোলেন।
প্রসঙ্গত, ১৮৫০ সালে সিলেট নগরের কেন্দ্রস্থলে ইউরোপিয়ান মিশনারীরা এই ভবনের প্রথমপর্বের নির্মান কাজ শুরু করেন । প্রায় তিন একর জায়গাজুড়ে প্রতিষ্ঠিত এই ভবন আসাম ও ব্রিটিশ স্থাপত্যরীতির নান্দনিক স্থাপনা। এর সাথে দুইটি বিশ্বযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের বুদ্ধিজীবি হত্যার স্মৃতিজড়িত। পুরাতন মেডিকেল ভবন বা 'আবুসিনা ছাত্রাবাস ভবন' নামে পরিচিত এই ভবনটি এ অঞ্চলের শত বছরের ইতিহাস ঐতিহ্যের স্মারক। শুধু তাই নয় সিলেটের প্রথম দৈনিক পত্রিকাও এই ভবন থেকেই প্রকাশিত হয়। সিলেট ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হওয়ায় ১৮৬৯ ও ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে হাজার বছরের পুরনো বিভিন্ন শাসনামালের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস হয়। টিকে থাকা হাতগোনা কিছু প্রতœতাত্তি¡ক নিদর্শন অজ্ঞতা ও অসচতেনতার কারণে বিনষ্ট হতে চলেছে। তাই এই শতবর্ষী আবু সিনা ছাত্রাবাস রক্ষায় মাস বিভিন্ন ভাবে আন্দোলন করছেন সিলেটের সচেতন নাগরিকবৃন্দ।
আপনার মন্তব্য