২৯ মার্চ, ২০২৬ ২৩:৫৫
বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ, যেখানে সীমিত কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং আর্থিক অনিশ্চয়তা বহু মানুষকে বিদেশমুখী করে তুলছে। উন্নত জীবনের আশায়, পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির লক্ষ্যে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ বিদেশে পাড়ি জমাতে চান। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এদের একটি বড় অংশ অবৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করে এবং এর ফলে ভয়াবহ প্রতারণা ও দুর্ভোগের শিকার হয়।
অবৈধ পথে বিদেশযাত্রার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে দারিদ্র্য, বেকারত্ব, দ্রুত অর্থ উপার্জনের আকাঙ্ক্ষা এবং সঠিক তথ্যের অভাব। অনেক সময় গ্রামাঞ্চলের সহজ-সরল মানুষজন দালালদের মিথ্যা প্রলোভনে পড়ে যায়। এসব দালাল উন্নত দেশের চাকরি, উচ্চ বেতন, আরামদায়ক জীবনযাপনের স্বপ্ন দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়। বাস্তবে দেখা যায়, এই প্রতিশ্রুতির অধিকাংশই ভুয়া, এবং বিদেশে পৌঁছানোর পর তাদের জন্য অপেক্ষা করে অমানবিক জীবনযাপন।
প্রতারণার শিকার হওয়া ব্যক্তিদের অনেকেই নিজেদের সর্বস্ব বিক্রি করে বিদেশ যাওয়ার টাকা জোগাড় করেন। কেউ বাড়ি-জমি বিক্রি করেন, কেউ আবার উচ্চ সুদে ঋণ নেন। ফলে তারা শুধু নিজেরাই নয়, পুরো পরিবারকে আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেন। বিদেশে গিয়ে কাজ না পেলে বা প্রতারণার শিকার হলে তাদের পক্ষে সেই ঋণ শোধ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এতে পরিবারে নেমে আসে চরম দুর্দশা।
অবৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার আরেকটি বড় সমস্যা হলো প্রশিক্ষণের অভাব। অনেকেই কোনো প্রকার কারিগরি দক্ষতা বা ভাষাগত জ্ঞান ছাড়াই বিদেশে যান। ফলে সেখানে গিয়ে তারা কাজ খুঁজে পান না বা পেলেও কম বেতনের, ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে বাধ্য হন। আবার ভাষা না জানার কারণে তারা সহজেই শোষণের শিকার হন এবং নিজেদের অধিকার সম্পর্কে অজ্ঞ থাকেন।
মানবপাচারকারীরা প্রায়ই বিপজ্জনক রুট ব্যবহার করে মানুষ পাচার করে থাকে। সমুদ্রপথে বা দুর্গম স্থলপথে যাত্রাকালে অনেকেই প্রাণ হারান। যারা বেঁচে থাকেন, তাদের অনেককে বিদেশে গিয়ে অবৈধভাবে আটক করা হয় বা জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োজিত করা হয়। এদের কেউ কেউ কারাগারে বন্দি জীবন কাটান, আবার কেউ মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হন।
এই সমস্যার সমাধানে সরকার ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। প্রথমত, জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে এগিয়ে এসে মানুষকে অবৈধ পথে বিদেশযাত্রার ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। দালালদের মিথ্যা প্রলোভন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে সহজ ও স্বচ্ছ করতে হবে। সরকারকে দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাড়াতে হবে এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সরবরাহ করতে হবে। এতে মানুষ প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকি কমবে এবং তারা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বিদেশে কাজ করতে পারবে।
তৃতীয়ত, দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। মানবপাচারকারীদের চিহ্নিত করে দ্রুত শাস্তির আওতায় আনতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের অপরাধ করার সাহস না পায়। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।
সবশেষে, বিদেশে যাওয়ার আগে প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা এবং বৈধ পদ্ধতি অনুসরণ করা। স্বল্প সময়ে বেশি লাভের আশায় অবৈধ পথে পা বাড়ানো কখনোই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অর্জিত কোনো সাফল্যই প্রকৃত সাফল্য নয়।
অতএব, অবৈধ পথে বিদেশযাত্রা একটি জাতীয় সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এটি শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সম্মিলিত সচেতনতা ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে আমরা এই সমস্যা মোকাবিলা করতে পারি এবং নিরাপদ ও সম্মানজনক কর্মসংস্থানের পথ সুগম করতে পারি।
লেখক: প্রভাষক, অর্থনীতি বিভাগ, শাহজালাল কলেজ জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ।
আপনার মন্তব্য