Advertise

মো. মিজানুর রহমান

০৯ এপ্রিল, ২০২০ ১২:৩৮

করোনাভাইরাস সংক্রমণ: বদলে যাবে বৈশ্বিক ব্যবসা-বাণিজ্য

বর্তমানে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯ নতুন এক ধরনের ছোঁয়াচে রোগ। ২০১৯ সালের শেষে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে আবিষ্কৃত এই রোগটি মাত্র তিন মাসের মধ্যে সারা বিশ্বের ২০৯ টি দেশ ও অঞ্চল এবং ২টি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। ইউরোপিয়ান ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) একটি রিপোর্ট বলছে ,করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ফলে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক আক্রান্ত হবে যার মধ্যে প্রায় ১-৩ শতাংশ মৃত্যুবরণ করবে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে দেশের মানুষ, ব্যবসায়-বাণিজ্য তথা অর্থনীতিকে রক্ষার জন্য প্রায় প্রতিটি দেশের সরকার হিমশিম খাচ্ছে।

করোনাভাইরাস ফলে সৃষ্ট হওয়া মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমরা সক্ষমতা প্রকাশ করতে পারলেও, এর প্রভাবে চিরতরে বদলে যাবে বৈশ্বিক ব্যবসায় বাণিজ্যর গতি প্রকৃতি এবং নিশ্চিতভাবে যা আমাদের তীব্রভাবে প্রভাবিত করবে আগামী দিনগুলোতে। এই মহামারী এমন একটা সময়ে এসেছে যখন বিশ্ব বাণিজ্য ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বাণিজ্য যুদ্ধ দ্বারা তীব্রভাবে হুমকির মুখে ও মুক্ত বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ গুরুতর অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।

অতীতে কিছু ঘটনা যা বিশ্ব ব্যবসায় বাণিজ্যকে সাময়িক ভাবে প্রভাবিত করছে উদাহরণ হিসাবে বলা যায় ২০০১ সালের যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে হামলা, ২০১১ সালে জাপানে ভূমিকম্প ও সুনামি। যদিও এগুলো বেশিরভাগই সাময়িক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছিল তথাপি বিশ্বায়ন কখনো হুমকির মুখে পড়েনি। এখন সময়টি একেবারেই আলাদা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে এটিই সম্ভবত সবচেয়ে কঠিন অর্থনৈতিক সময় সমগ্র বিশ্বের জন্য। বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলগুলো প্রচণ্ড চাপের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে যা আগামীতে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যে যুদ্ধের সমাধান হয়নি এবং যে কোনও মুহূর্তে পুনরায় তা তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর আর এটা ভাবার কোন কারণ নেই যে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডাব্লিউটিও) তাদের দেয়া শুল্ক প্রতিশ্রুতি ধরে রাখতে পারবে। বাণিজ্য বিবাদ নিরসনেও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিশেষ কৌশল বা পদ্ধতি পূর্বের ন্যায় কাজ করছে না।

একই সময়ে, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখিয়েছে চীনে অবস্থিত সরবরাহকারীদের উপর বিশ্বের বেশিরভাগ দেশের অত্যধিক নির্ভরতার ফলাফল তাদের জন্য ভালো হয়নি। এখন অনেক দেশ ও প্রতিষ্ঠান স্বাভাবিকভাবেই এই নির্ভরশীলতা পরিহার করার চেষ্টা করবে। হুবেই প্রদেশ যেখানে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের সূচনা হয়েছিল, এটি উচ্চ প্রযুক্তির উৎপাদন কেন্দ্র, দেশি এবং বিদেশি কোম্পানিগুলোর মিলনস্থল যারা মোটরগাড়ি, ইলেকট্রনিক্স এবং ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পগুলিতে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করেছে। হুবেই প্রদেশটি চীনের মোট দেশজ উৎপাদনের ৪.৫ শতাংশ সরবরাহ করে; বিশ্বের শীর্ষ ৫০০টি কোম্পানির ৩০০টির হুবাইয়ের রাজধানী উহান শহরে উৎপাদন কেন্দ্র রয়েছে। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মহামারী হওয়ার পূবেই সবগুলো মহাদেশের সরবরাহ শৃঙ্খলকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছিল।

বিশ্বের অনেক দেশ এখন উপলব্ধি করছে চীন থেকে আসা সরবরাহের উপর তারা কতটা নির্ভরশীল। উদাহরণস্বরূপ, ইতালির আমদানি করা প্রায় তিন চতুর্থাংশ ব্লাড থিনার চীন থেকে আসে। একইভাবে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিকের ৯৭ শতাংশ, জাপান তাদের চাহিদার ৫০ শতাংশ ও জার্মানি, ইতালি এবং ফ্রান্স তাদের প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিকের ৪০ শতাংশ চীন থেকে আমদানি করে। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে বিশ্বব্যাপী মাস্কের চাহিদা বেড়ে যায়। এই মহামারী চলমান সময়ে চীনের দৈনিক মাস্কের চাহিদা ৫০-৬০ মিলিয়ন যেখানে তাদের উৎপাদন ক্ষমতা দৈনিক ২০ মিলিয়ন। একই সাথে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ফলে বিশ্বব্যাপী করোনা টেস্টিং কিটের সংকট তৈরি হয়েছে। এই সংকট থেকে বাদ পড়েনি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ কিংবা দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশ। এর মধ্যে ইউরোপের দেশ নেদারল্যান্ড ও চেক রিপাবলিক চীন থেকে সরবরাহ করা এন৯৫ মাস্ক, পিপিই নিম্নমানের বলে ফেরত পাঠিয়েছে। চীন থেকে সরবরাহ করা মাস্ক নিয়ে বেশ লোক-লজ্জার মুখে পড়েছে পাকিস্তান। বাংলাদেশর গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিগুলো নিজেরাই পিপিই তৈরি করছে সংকটে পড়ে। দীর্ঘ দিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য যুদ্ধ চলছে। সেই চীন থেকে এখন যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি করতে হচ্ছে করোনার চিকিৎসা সামগ্রী। যদিও ট্রাম্প প্রশাসন এই আমদানির বিপক্ষে ছিল তথাপি বিভিন্ন মহলের থেকে অভিযোগ তোলা হয় যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য যুদ্ধের ফলে আমেরিকানদের জীবন হুমকির মুখে। তথাপি দ্বিমুখী চাপে ট্রাম্প প্রশাসন চীন থেকে চিকিৎসা সামগ্রী আমদানি করার জন্য শুল্ক হ্রাস করা হয়। এই সংকট দেশগুলোর রাজনৈতিক নেতাদের অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে যা আগামীতে বাণিজ্য নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলবে।

রেজিলিয়েন্স বা স্থিতিস্থাপকতা এখন কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন ভাবনার বিষয়। করোনা পরবর্তী পৃথিবীতে কোম্পানিগুলো তাদের সরবরাহ শৃঙ্খলা ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনার বিষয়ে কঠোরভাবে চিন্তা করবে যাতে কোন নিদিষ্ট উৎপাদক, ভৌগলিক অঞ্চল, কিংবা বাণিজ্য নীতি তাদের ঋণাত্মক ভাবে প্রভাবিত করতে না পারে। এর ফলে প্রচলিত উৎপাদন ও মজুদ ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটবে এবং নন-জিরো ইনভেন্টরি পদ্ধতি থাকবে না। এর ফলে অবশ্যই ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, তবে করোনাভাইরাস পরবর্তী বিশ্বে ব্যয়ের পর পরই সরবরাহ শৃঙ্খলা ব্যবস্থার বিষয়টি নিয়ে ভাবনা থাকবে। কোম্পানিগুলো তাদের দ্বিতীয় এবং তৃতীয় স্তরের সরবরাহকারীদেরও স্থিতিস্থাপকতার মূল্যায়ন করবে বলে আশা করা যায়।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ “ঘরে থেকে কাজ করা” ধারণাটিকে জনপ্রিয় করে তুলছে। করোনা পরবর্তী বিশ্বে বেশিভাগ কোম্পানি তাদের কার্যক্রম ঘরে থেকে কাজ করুন এই পদ্ধতিতে রূপান্তর করবে বলে আশা করা যায়। যদিও এখন অবধি সবগুলো কোম্পানির জন্য এই ধারণটা প্রযোজ্য নয় কারণ আমরা প্রায় ১২০ বছর সময় ব্যয় করেছি এটা শেখার জন্য যে কীভাবে অফিসে আরও কর্মক্ষম হওয়া যায়। চাকরির অনুসন্ধান ইঞ্জিন অ্যাডজুনার নতুন গবেষণায় ৪.৫ মিলিয়ন মার্কিন জব পোস্টিংয়ের বিশ্লেষণ করা হয়েছে এবং দেখা গেছে ২০১৭ সাল থেকে এখন ঘরে থেকে কাজ করার সুযোগ ২৭০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মহামারীর পর বেশিভাগ কোম্পানিগুলো এখন ভৌগলিক দূরত্বকে বাদ দিয়ে তাদের জন্য কাজের জন্য মেধাবী কর্মী নিয়োগ দিচ্ছে বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে। আমাদের বাংলাদেশেও এটি জনপ্রিয় হচ্ছে এবং বেশ কিছু কোম্পানি এই ধারণটি নিয়ে তাদের ব্যবসায়ী কার্যক্রম চালু রাখছে। যদিও বেশিরভাগ টেক-কোম্পানিগুলো এই পদ্ধতি অনুসরণ করছে তবে মহামারী পরবর্তী সময়ে এটির ব্যাপকতা আরও বৃদ্ধি পাবে এটা নিশ্চিত ভাবে বলা যায়।

২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে চীনের ম্যানুফ্যাকচারিং পারচেজিং ম্যানেজার’স ইনডেক্স (পিএমআই) ১৪.৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। অন্যদিকে, প্রোডাকশন ইনডেক্স কমেছে ২৩.৫ শতাংশ যা ইঙ্গিত করে যে উৎপাদন কার্যক্রম আমূলভাবে হ্রাস পেয়েছে। চীন এমন কিছু পণ্য উৎপাদন (যেমন: হাই-টেক টেকনোলজি, মেডিক্যাল সরঞ্জাম ইত্যাদি) করে যার বিকল্প উৎস খুবই কম। দীর্ঘ লক-ডাউনের ফলে উৎপাদন প্রক্রিয়া বিঘ্ন হচ্ছে প্রায় প্রতিটি দেশেই। উৎপাদন প্রক্রিয়া এভাবে দীর্ঘ দিন বন্ধ রাখার ফলে অর্থনৈতিক মন্দার তীব্রতা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। অটোমেটেশনের মাধ্যমে উৎপাদন ও গ্রাহকের দ্বার প্রান্তে সরবরাহের প্রচেষ্টা করা হবে আগামীতে; ইতিমধ্যে চীনের আলিবাবা, যুক্তরাষ্ট্রের অ্যামাজন অটোমেটেড সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছে। নিশ্চিতভাবে বলা যায় করোনা পরবর্তী পৃথিবীতে চীন এবং অন্য দেশগুলো অটোমেশন প্রক্রিয়াকে দ্রুত গ্রহণ করবে যাতে ভবিষ্যৎতে কোন কারণে উৎপাদন ও সরবরাহ প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন না ঘটে।

ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টিকে নীতি নির্ধারকদের কাছ থেকে অনেকখানি অন্তরালে সরিয়ে দিয়েছে। লক-ডাউনের ফলে পৃথিবী তার জলবায়ুকে ৫০০ বছর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়েছে বলা হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি এখনো বিরাজমান। আগামী দিনগুলোতে বিশ্বব্যাপী সমন্বিত কার্যক্রমের অভাবে চরম বৈরিতা-পূর্ণ আবহাওয়া কিংবা আরও নতুন কোন সংক্রামক প্রকোপ আমাদের প্রচণ্ড ধাক্কা দিতে পারে। যেসব কোম্পানি যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হবে তাদের ধীরে ধীরে ফুটন্ত ব্যাঙের ভাগ্য বরণ করতে ভাবে।

করোনাভাইরাসের মহামারী বিশ্বায়নকে একবারে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাবে না, তবে চিরতরে বদলে দেবে এর গতি প্রকৃতি। কোম্পানিগুলোকে তাদের টিকে থাকার জন্য বাধ্যতামূলকভাবে বদলে ফেলতে হবে তাদের ব্যবসায়ের কৌশল। একইভাবে, আমাদের অর্থনীতিও একবারেই বদলে যাবে এই করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে।

  • মো. মিজানুর রহমান: সহকারী অধ্যাপক, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, নর্থ ইস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত