নিজস্ব প্রতিবেদক

১৩ আগস্ট, ২০২৬ ১৬:৫৫

ছাত্র ইউনিয়ন নেতা থেকে বঙ্গভবন: মির্জা ফখরুলের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়নের বামপন্থী রাজনীতি, শ্রেণিকক্ষে বিসিএস অধ্যাপকের মার্জিত জীবন, রাজপথের এক দশকেরও বেশি সময়ের লড়াই, তারেক রহমানের মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীত্ব— আর সেখান থেকে বঙ্গভবনের রাষ্ট্রপতির আসনে আসীন হতে যাওয়া- মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবন কেবল কোনো পদপ্রাপ্তির গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতি ও পরিবর্তনের এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক রূপান্তর।

১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম মির্জা ফখরুলের। তার পিতা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী ও একাধিকবারের সংসদ সদস্য। তার চাচা উইং কমান্ডার এস আর মির্জা ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক মুজিবনগর সরকারের 'ডাইরেক্টোরেট অব ইউথ ক্যাম্প'-এর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অপর চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, জিয়াউর রহমানের সরকারের আমলে ভূমিমন্ত্রী এবং পরে হন জাতীয় সংসদের স্পিকার। খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারের আমলে তাকে আইনমন্ত্রী করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়ার সময় মির্জা ফখরুলের রাজনীতিতে হাতেখড়ি। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি এবং এস এম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক হন। ১৯৬৯-এর ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি অংশগ্রহণ করেন।

ছাত্রজীবন শেষে রাজনীতির উত্তাপ থেকে নিজেকে কিছুটা সরিয়ে নেন মির্জা ফখরুল। ১৯৭২ সালে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষা ক্যাডারে ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে দীর্ঘ দিন অধ্যাপনা করেন। মাঝে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এস. এ. বারীর ব্যক্তিগত সচিব (পিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাও সঞ্চয় করেন।

১৯৮৬ সালে শিক্ষকতার নিশ্চিন্ত জীবন ছেড়ে পুরোপুরি রাজনীতিতে নামেন মির্জা ফখরুল। ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে তিনি নিজের জনপ্রিয়তা প্রমাণ করেন। এরপর সামরিক শাসক এরশাদের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) যোগ দেন। ধীরে ধীরে কৃষকদলের সহ-সভাপতি ও ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হয়ে দলের তৃণমূল গোড়াপত্তনে ভূমিকা রাখেন।

২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে বেগম খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় প্রথমে কৃষি এবং পরবর্তীতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

তবে মির্জা ফখরুলের আসল রাজনৈতিক পরিপক্কতা ও ত্যাগের পরিচয় মেলে ২০০৯ পরবর্তী দীর্ঘ কঠিন সময়ে। ২০১১ সালে দলের 'ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব' এবং ২০১৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে মহাসচিব পদে নির্বাচিত হন।

চব্বিশের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ছাব্বিশের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচবের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠন করলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

আজ (২৩ আগস্ট) বিএনপি তাকে রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় মনোনীত প্রার্থী রূপে ঘোষণা করেছে। রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক পদে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ার পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিএনপি মহাসচিব ও দলটির জাতীয় স্থায়ী কমিটি থেকে পদত্যাগ করেছেন। এর মাধ্যমে আপাতত সমাপ্তি ঘটল দীর্ঘ এক রাজনৈতিন অধ্যায়ের, যা ছাত্র ইউনিয়নের নেতা দিয়ে শুরু হয়েছিল, এবং পূর্ণতা পেল বিএনপির মহাসচিব থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার মাধ্যমে।

আগামী ২০ আগস্ট অনুষ্ঠেয় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেবেন তিনি। জাতীয় সংসদে বিএনপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় তার নির্বাচিত হওয়া সময়ের অপেক্ষা মাত্র। এর মাধ্যমে তিনি হতে যাচ্ছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের তেইশতম রাষ্ট্রপতি।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত