সিলেটটুডে ডেস্ক

১৩ নভেম্বর, ২০১৫ ০৪:৪৪

দেশে দ্রুত বিচার পাওয়া কি অসম্ভব?

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন

যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার আব্দুল জলিলকে ২০০০ সালে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর ১৫ বছর কেটেছে।

এই সময়ের মধ্যে তার ছেলে শাহেদুর রহমান শিপলু আদালতের দ্বারে-দ্বারে ঘুরেছেন বিচারের আশায়। কিন্তু ১৫ বছর হলেও পিতা হত্যার বিচার এখনো তিনি পাননি।

হতাশ হয়ে তিনি গত বছর খানেক ধরে আদালতে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। বিচারের আশা তিনি এখন ছেড়েই দিয়েছেন। “আমাদের তো ধৈর্য হারিয়ে গেছে। আল্লাহ ছাড়া এই বিচার আর কেউ করবে না।”

শিপলুর মতো এ রকম লক্ষ-লক্ষ মানুষ বাংলাদেশের বিভিন্ন আদালতে বছরের পর বছর বিচারের আশায় আছেন।

হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন এবং জমা-জমা নিয়ে বিরোধ সংক্রান্ত বহু ধরনের মামলা। বছরের পর বছর ধরে এসব মামলার বিচার কাজ চলছে।

বাংলাদেশের আইন মন্ত্রণালয় বলছে বর্তমানে দেশে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ২৮ লাখের মতো। এই সংখ্যা শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটাই বাস্তব।

সম্প্রতি সিলেটে শিশু রাজন এবং খুলনায় রাকিব হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার দ্রুত বিচারের একটি উদাহরণ তৈরি করেছে। কিন্তু রাজন কিংবা রাকিব হত্যাকাণ্ডের মতো দ্রুত বিচার কাজ শেষ করা কি সম্ভব? সেটি একটি বড় প্রশ্ন।

মানবাধিকার সংস্থা ব্লাস্টের ট্রাস্টি এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জেড আই খান পান্না মনে করেন রাজন বা রাকিব হত্যাকাণ্ডের সাথে অন্য হত্যাকাণ্ডের মামলা এক রকম নয়।

তিনি বলেন , “ রাজন হত্যা মামলায় নির্যাতনের ভিডিও ছিল। তাছাড়া সাক্ষীরা সবাই উদ্যোগী হয়ে আদালতে এসে সাক্ষ্য দিয়েছে। অন্য মামলার ক্ষেত্রে বিষয়টি এ রকম নয়।” সাক্ষী না আসলে একতরফা মামলার রায় দেয়া যায় না।

মামলার দীর্ঘসূত্রিতার জন্য আদালতের কার্যক্রমের ধীর গতিকেই অনেক বিচারপ্রার্থি দায়ী করেন। কিন্তু একটি মামলা দ্রুত শেষ হওয়ার জন্য শুধু আদালতের ভূমিকাই যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন সাবেক জেলা জজ ইকতেদার আহমেদ।

ইকতেদার আহমেদ জেলা জজ হিসেবে যেমন কাজ করেছেন তেমনি প্রশাসন এবং সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্টার হিসেবে কাজ করেছেন। বিচারক থাকা অবস্থায় তিনি ২০টির বেশি হত্যা মামলার রায় দিয়েছেন।

একটি মামলা দায়ের করার পর থেকে বিচার হওয়া পর্যন্ত পুলিশ, আইনজীবী এবং আদালতের সমন্বিত ভূমিকা আছে বলে মি: আহমেদ উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, “ বিষয়টি এককভাবে বিচারকের উপর নির্ভর করেনা। সাক্ষীরা আদালতে আসার পর যদি সাক্ষ্য না নেয়া হয় তাহলে তারা সাক্ষ্য দেবার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে বিচারকের চেয়ে প্রসিকিউটরদের ভূমিকা বেশি জোরালো হওয়া উচিত।”

শিশু রাজন এবং রাকিব হত্যা গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল এবং এই মামলাগুলোর প্রতি সবার দৃষ্টি ছিল। যে কারণে পুলিশ যেমন দ্রুত তদন্ত শেষ করেছে তেমনি বিচারকাজ এগিয়েছে দ্রুত গতিতে।

আইন মন্ত্রনালয় বলছে বাংলাদেশে এখন যে ২৮ লক্ষ মামলা বিচারাধীন রয়েছে তার মধ্যে ৬০ শতাংশই হচ্ছে ফৌজদারি মামলা। অর্থাৎ খুন, ধর্ষণ, ডাকতি, রাহাজানিসহ নানা ধরনের মামলা।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের কাছে জানতে চেয়েছিলাম এই সবগুলো মামলার ক্ষেত্রেই রাজন বা রাকিব হত্যা মামলার মতো একইভাবে দ্রুত বিচার করা সম্ভব?

আইনমন্ত্রী বলেন সব মামলাকে একই পন্থায় এবং একই গতিতে নিষ্পত্তি করা সম্ভব নয়। যেসব মামলা আগে থেকেই নিষ্পত্তির অপেক্ষায় জমে আছে সেগুলোর জন্য একটি কর্মপন্থা ঠিক করতে হবে।

আর নতুন মামলার ক্ষেত্রে প্রসিকিউশন তৎপর হলে সেগুলো দ্রুত শেষ করা যাবে। শুধু ফৌজদারি মামলাগুলোর জন্য আলাদা পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব কিনা?

সে প্রশ্নে আইনমন্ত্রী বলেন , “ শুধু ফৌজদারি মামলায় গুরুত্ব দেবার পক্ষে আমি না। অনেক সময় দেওয়ানী মামলার দীর্ঘসূত্রিতা ফৌজদারি মামলার জন্ম দেয়।”

সেজন্য দুই ধরনের মামলাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে বলে আইনমন্ত্রী উল্লেখ করেন।

রাজন এবং রাকিব হত্যার বিচারের পর সাধারণ মানুষ অনেকের মনে এই ধারনা জন্ম নিয়েছে যে, সরকার এবং আদালত চাইলেই মামলার দ্রুত বিচার সম্ভব।

অনেকে মনে করেন বিচার বিলম্বিত হবার বিষয়টি চাইলেই দ্রুত সুরাহা করা যায়।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং মানবাধিকার সংস্থা ব্লাস্টের ট্রাস্টি জেড আই খান পান্না বলছেন অধিকাংশ মামলার বিচারের ক্ষেত্রেই সময়ের প্রয়োজন।

জেড আই খান পান্না বলেন , “ একজন বিচারক দিনে কয়টা মামলার জাজমেন্ট দিতে পারবে? একটা মামলার রায় লিখতেও সময় লাগে। প্রত্যেকটা সাক্ষীকে জেরা করে সত্য বের করে আনতে হয়। ইটস অ্যা টাফ ম্যাটার (এটা কঠিন কাজ)।”

আইনজীবীরা বলছেন বাংলাদেশে সাধারণ আদালতে একটি ফৌজদারি মামলা নিষ্পত্তি হতে গড়ে চার থেকে পাঁচ বছর সময় বছর সময় লাগে।

দেওয়ানী মামলার ক্ষেত্রে এই সময়ের পরিমাণ আরো বেশি। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পুলিশ তদন্তের মাধ্যমের যাদের অভিযুক্ত করে তারা খালাস পেয়ে যায় বলে আইনজীবী ও সাবেক বিচারক বলছেন।

অনেক সময় পুলিশের অভিযোগপত্র নিয়ে বাদী বা বিবাদী পক্ষের আদালতে নারাজি দরখাস্ত করে।

সেক্ষেত্রে আদালতকে আবারো তদন্তের নির্দেশ দিতে হয়। এসব কারণে মামলা এগুতে অনেক সময় লাগে। সাবেক জেলা জজ ইকতেদার আহমেদ মনে করেন বিদ্যমান ব্যবস্থার কারণেই অনেকে ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

ইকতেদার আহমেদ বলেন , “ একটা মামলা অভিযোগপত্র দেবার পরে যখন বিচার কাজ হয়, তখন কনভিকশন রেট ( দোষী সাব্যস্ত) মাত্র পাঁচ শতাংশ। যেভাবে মামলার তদন্ত হচ্ছে, যেভাবে আইনজীবীরা মামলা পরিচালনা করছেন এবং যেভাবে বিচারকরা বিচারকার্য পরিচালনা করছেন – এই তিনটার মধ্যেই আমার মনে হয় ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন। ”

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন মামলার ভারে তারাও জর্জরিত। অপরাধের হার এবং জনসংখ্যার তুলনায় পুলিশের সংখ্যা অনেক কম।

একজন পুলিশ কর্মকর্তা একই সাথে অনেকগুলো মামালার তদন্ত করতে হয়। সেজন্য অনেক সময় চাইলেও সময়মতো তদন্ত শেষ করা সম্ভব হয় না।

কিন্তু আদালতের সামনে মামলা আসলে সেটি যেন দ্রুত নিষ্পত্তি হয় সেজন্য আরো বিচারক নিয়োগ প্রয়োজন বলে আইনজীবীরা মনে করেন।

আইনমন্ত্রণালয় বলছে বাংলাদেশে এখন নিম্ন আদালতে বিচারকের সংখ্যা প্রায় ১৭০০ । একটি –দুটি হত্যা মামলার গুরুত্ব দেয়ার পাশাপাশি দেশের সার্বিক বিচারব্যবস্থার দিকে সরকার কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে?

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলছেন বিচারক নিয়োগ এবং অবকাঠামো নির্মাণের জন্য সরকার কাজ করছে।

আইনজীবীরা বলছেন সবক্ষেত্রে অতিদ্রুত বিচার যেমন হলে সেটি অনেক সময় ন্যায় বিচার নাও হতে পারে। আবার বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতা মানুষকে ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত করতে পারে।

আইনমন্ত্রী বলছেন সরকার এই দুটো পরিস্থিতির মাঝামাঝি কাজ করতে হবে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত