সিলেটটুডে ডেস্ক

১৫ আগস্ট, ২০২১ ০১:০১

পাঁচ খুনি এখনও অধরা

বঙ্গবন্ধু হত্যা

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কিছুসংখ্যক বিপথগামী সেনা কর্মকর্তা ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের বাসভবনে সপরিবারে হত্যা করে। নৃশংস এ হত্যার ৩৪ বছর পর ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি মধ্যরাতে দণ্ডপ্রাপ্ত ১২ আসামির মধ্যে পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। ভারতে পালিয়ে থাকা আবদুল মাজেদ নামের এক আসামিকে রায়ের ১০ বছর পর গত বছরের এপ্রিল মাসে ফাঁসি কার্যকর করা হয়। বাকি ছয় আসামির মধ্যে দণ্ডিত আবদুল আজিজ পাশা পলাতক অবস্থায় জিম্বাবুয়েতে মারা গেছে। অন্য পাঁচজন এখনো পলাতক।

পলাতক আসামিরা হলো খন্দকার আবদুর রশিদ, শরিফুল হক ডালিম, এ এম রাশেদ চৌধুরী, এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী ও মোসলেহ উদ্দিন। তাদের গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলের পরোয়ানা রয়েছে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মস্বীকৃত পলাতক পাঁচ খুনির মধ্যে এ এম রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে ও নূর চৌধুরী কানাডায় অবস্থান করছেন। বাকি তিনজন- শরিফুল হক ডালিম, মোসলেম উদ্দিন খান ও খন্দকার আব্দুর রশিদ কোথায় আছেন, সে বিষয়ে সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই।

বঙ্গবন্ধুর খুনি মোসলেম উদ্দিন খান ইউরোপের কোনো দেশে পালিয়ে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। আরেক খুনি শরিফুল হক ডালিম পাকিস্তান, লিবিয়া অথবা স্পেনে এবং খন্দকার আব্দুর রশিদ পাকিস্তান অথবা আফ্রিকার কোনো একটি দেশে পালিয়ে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

খুনিদের অবস্থান প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, ‘আমরা দুজনের অবস্থান জানি। একজন যুক্তরাষ্ট্রে আছেন, আরেকজন কানাডায়। বাকি তিনজনের অবস্থান আমরা জানতে পারিনি। আমরা দেশবাসীকে, আমাদের সব প্রবাসীকেও বলেছি যদি তারা কেউ তাদের তথ্য দিতে পারেন; যদি সঠিক তথ্য দিতে পারেন তবে পুরস্কৃত করব।’

২১ বছর পর মামলা
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত এ ঘটনায় মামলা হয়নি। কেননা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ বিচারের হাত থেকে খুনিদের রক্ষা করতে ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারি করেন। সে কারণে বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ ছিল দীর্ঘদিন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে ১৯৯৬ সালের ১৪ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার তিন প্রধান আসামি লেফটেন্যান্ট কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী তাহের উদ্দিন ঠাকুরকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই বছরের ২ অক্টোবর বঙ্গবন্ধুর একান্ত সহকারী (পিএ) এ এফ এম মোহিতুল ইসলাম ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সংঘটিত নারকীয় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় থানায় একটি এফআইআর করেন।

১৯৯৬ সালের ১৪ নভেম্বর খুনিদের বিচারের হাতে ন্যস্ত করতে পার্লামেন্টে ইনডেমনিটি আইন বাতিল করা হয়। ১৯৯৭ সালের ১৫ জানুয়ারি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এ মামলায় ২০ জনকে অভিযুক্ত করে মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে এবং একই বছরের ১২ মার্চ ছয় আসামির উপস্থিতিতে আদালতে বিচার শুরু হয়।

সেখানে আসামি করা হয় ২৪ জনকে। তখন থেকেই আসামি ফারুক রহমান, শাহরিয়ার রশিদ খান ও মহিউদ্দিন আহমেদকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে রাখা হয়। ১৯৯৮ সালে অপর আসামি বজলুল হুদাকে গ্রেপ্তার করে কনডেম সেলে রাখা হয়। সর্বশেষ বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় পলাতক অপর খুনি এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়।

এর আগে ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর বিচারিক আদালত ওই মামলায় ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন। রায়ের বিরুদ্ধে আপিল হলে হাইকোর্ট ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন।

প্রথম রায়
১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর তৎকালীন ঢাকার দায়রা জজ কাজী গোলাম রসুল মামলার রায়ে ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়ে রায় ঘোষণা করেন।

দ্বিতীয় রায়
নিম্ন আদালতের এ রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের আপিল ও মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিতকরণের শুনানি শেষে ২০০০ সালের ১৪ ডিসেম্বর হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ বিভক্ত রায় দেন। বিচারপতি এম রুহুল আমিন ১৫ আসামির মধ্যে ১০ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। খালাস দেন পাঁচ আসামিকে। অপর বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ১৫ আসামির সবার মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন।

তৃতীয় রায়
২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল হাইকোর্টের তৃতীয় বেঞ্চের বিচারপতি মোহাম্মদ ফজলুল করিম ১২ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। খালাস দেন তিনজনকে। এই ১২ আসামির মধ্যে একজন মারা যায়, ছয়জন পলাতক। অপর পাঁচজন কারাগারে আটক ছিলেন।

দীর্ঘ ছয় বছর পর বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে আপিল বিভাগে বিচারপতি নিয়োগ দেওয়ার পর ২০০৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. তাফাজ্জাল ইসলামের নেতৃত্বে তিন বিচারপতির বেঞ্চ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচ আসামির আপিল শুনানি গ্রহণ করেন।

চতুর্থ রায়
২০০৯ সালের ১২ নভেম্বর ২৯ দিনের শুনানির পর চূড়ান্ত আপিল শুনানি শেষ হয় এবং আদালত ১৯ নভেম্বর রায়ের তারিখ নির্ধারণ করেন। ওই দিন (১৯ নভেম্বর) বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পাঁচ সদস্যের বেঞ্চে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বহাল রেখে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচ আসামির দায়ের করা আপিল আবেদন খারিজ করা হয়।

২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি আপিলের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের রিভিউ খারিজ হয়ে গেলে ২৮ জানুয়ারি পাঁচ আসামির ফাঁসির রায় কার্যকর করে জাতিকে দায়মুক্ত করা হয়।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোররাতে সেনাবাহিনীর কিছুসংখ্যক বিপথগামী সদস্য ধানমণ্ডির বাসভবনে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। ঘাতকরা শুধু বঙ্গবন্ধুকেই হত্যা করেনি, তাদের হাতে একে একে প্রাণ হারিয়েছেন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন শেখ কামাল, মেজ ছেলে বীর মুক্তিযোদ্ধা লেফটেন্যান্ট শেখ জামাল, ছোট ছেলে শেখ রাসেল, পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজি জামাল।

পৃথিবীর এই জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড থেকে বাঁচতে পারেননি বঙ্গবন্ধুর একমাত্র ভাই শেখ আবু নাসের, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মনি ও তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী বেগম আরজু মণি, স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম সংগঠক ও জাতির পিতার ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তাঁর মেয়ে বেবী সেরনিয়াবাত ও ছেলে আরিফ সেরনিয়াবাত, নাতি সুকান্ত আবদুল্লাহ বাবু, ভাইয়ের ছেলে শহীদ সেরনিয়াবাত, আবদুল নঈম খান রিন্টু ও আত্মীয় বেন্টু খান,বঙ্গবন্ধুর প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল জামিল উদ্দিন আহমেদ, সেনা সদস্য সৈয়দ মাহবুবুল হক ও এসবি কর্মকর্তা সিদ্দিকুর রহমান। এ সময় বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশে থাকায় প্রাণে রক্ষা পান।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত