০৬ ডিসেম্বর, ২০১৫ ২৩:০৬
একাত্তরের গণহত্যার অপরাধ অস্বীকার করায় পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে ভাবা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী।
রোববার (৬ ডিসেম্বর) বিকেলে ধানমণ্ডিতে ডব্লিউভিএ মিলনায়তনে এক আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন। বাংলাদেশকে ভারতের কূটনৈতিক স্বীকৃতির ৪৪তম বার্ষিকী উপলক্ষে ‘কালে কষ্টি পাথরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক’ শীর্ষক এ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
আলোচনা সভায় তিনি বলেন, “কিছুই করেনি তারা, এটা বলা হাস্যকর। তাদের সঙ্গে সম্পর্ক আমরা অ্যাসেসমেন্ট করছি, আমরা অবশ্যই মূল্যায়ন করছি। কী করা দরকার, সেটা নিয়ে ভাবছি।”
কূটনৈতিক সম্পর্ক ‘একটি চলমান প্রক্রিয়া’ মন্তব্য করে মন্ত্রী বলেন, “পাকিস্তানের সাবেক সামরিক শাসক, প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ তো ক্ষমাও চেয়েছেন; যদিও ভাষাটা অতো শক্ত ছিল না। আসমা জাহাঙ্গীর ও সাংবাদিক হামিদ মীরের মতো স্বাধীনচেতা ও মানবাধিকারকর্মীরা এটা নিয়ে কথা বলেছেন। হামুদুর রহমান কমিশনের প্রতিবেদনেও কিন্তু বিষয়টা আছে।”
মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ২২ নভেম্বর প্রথম প্রহরে বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মৃতুদণ্ড কার্যকর করার পর এক বিবৃতিতে উদ্বেগ জানায় পাকিস্তান। এরপর ঢাকায় দেশটির হাই কমিশনারকে তলব করে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কথা বলার কড়া প্রতিবাদ জানায় বাংলাদেশ সরকার।
এর এক সপ্তাহ পর ইসলামাবাদে বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত হাই কমিশনারকে তলব করে দেশটি। একাত্তরের গণহত্যার অপরাধও অস্বীকার করা হয়।
এরপর সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম, গণজাগরণ মঞ্চসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবি ওঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে পাকিস্তানের যে কোন সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা বলেছেন।
পাকিস্তানের বহু লোক গণহত্যার বিষয়টি ‘স্বীকার করেছেন’ মন্তব্য করে মাহমুদ আলী বলেন, “যুদ্ধাপরাধীদের, বিশেষ করে জামায়াত-বিএনপির অনেক টাকা। সারা পৃথিবীতে অনেক টাকা খরচ করেছে কিন্তু বিশেষ কিছু করতে পারেনি এবং কোনো আন্তর্জাতিক জনমত সৃষ্টি করতে পারেনি।”
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, একাত্তরে পাকিস্তানের যে ভূমিকা ছিল তার জন্য দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। সেটা এক ধরনের ক্ষমা চাওয়াই। কিন্তু তার ভাষা জোরালো ছিল না।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিষয়ে তিনি বলেন, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক দু’দেশের জনগণের হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত। এটা প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্ম চলতে থাকবে। এই সম্পর্ক কোনভাবেই নষ্ট করা যাবে না।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক খারাপ হতে শুরু করে। স্বাধীনতা যুদ্ধে পরাজিত শত্রুরা ভারতবিরোধিতা এবং জনগণের সঙ্গে শত্রুতা ও চক্রান্ত শুরু করে। তারা স্বাধীন বাংলাদেশের ধ্যান ধারণা নষ্ট করে দেয়। জিয়াউর রহমান থেকে শুরু করে খালেদা জিয়া পর্যন্ত সময়ে সেই সম্পর্ক অব্যাহত থাকে।
মন্ত্রী আরো বলেন, ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর সম্পর্কের আবার উন্নতি ঘটতে থাকে। তিনি ২০০৮ সালে ২য় দফায় ক্ষমতায় আসার পর সম্পর্ক এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে। বর্তমান বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে গুণগত পরিবর্তন এসেছে।
সমুদ্রসীমা বিজয়ের কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এখানে বন্ধুত্বের বিজয় হয়েছে। কেউ হারেনি কেউ জেতেনি। উভয়ে জয় লাভ করেছে। ছিটমহল সমস্যার সমাধানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইন্দিরা গান্ধী সরকার ও মুজিব সরকার এই সমস্যা সমাধানে অনেকখানি এগিয়েছিলেন, চুক্তিও করেছিলেন। বর্তমানে শেখ হাসিনা সরকার সেই সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান করেছেন।
তিনি আরো বলেন, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে ভ্রাতৃত্ববোধ সহমর্মিতা উত্তর উত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগামী দিনে এই সম্পর্ক আরো এগিয়ে যাবে। আজ ত্রিপুরায় বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। শিগগিরই গৌহাটিতেও হাইকমিশনার স্থাপন করা হবে। তবে এখনো কিছু সমস্যা রয়েছে সেগুলো সমাধানে কাজ চলছে।
ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি আয়োজিত এই আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন, সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক মুনতাসির মামুন। কমিটির উপদেষ্টা বিচারপতি সৈয়দ আমিরুল ইসলামের সভাপতিত্বে আলোচনায় অংশ নেন- হিউম্যান রাইটস কংগ্রেস অব বাংলাদেশ মাইনোরিটির সভাপতি অধ্যাপক অজয় রায় ও শহিদ জায়া শ্যামলি নাসরিন চৌধুরী।
আপনার মন্তব্য