২১ আগস্ট, ২০২৬ ১২:৫০
সিলেট নগরের রায়নগরে চাঞ্চল্যকর ট্রিপল মার্ডার নিয়ে এবার নতুন তথ্য মিলেছে। প্রেম বা শারিরীক সম্পর্ক নয়, চুরি করতে গিয়ে দেখে ফেলার কারণেই তিনজনকে হত্যা করেন এই মামলায় গ্রেপ্তার বাবুল।
রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদকালে ও আদালতে জবানবন্দিতে বাবুল মিয়াই এমন তথ্য দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশের একটি সূ্ত্র। যদিও এরআগে পুলিশ বলেছিলো, গৃহকর্মীর সাথে প্রেম ও শারিরীক সম্পর্ক গড়তে ব্যর্থ হয়ে তিনজনকে খুন করেন বাবুল।
এ হত্যাকান্ডের দায় ঘটনায় দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন আসামি বাবুল মিয়া। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সন্ধ্যায় সিলেটের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ফারহানা সুলতানার আদালতে তিনি এই জবানবন্দী দেন।
বাবুল মিয়ার দায় স্বীকার করে জবানবন্দির তথ্য নিশ্চিত করে সিলেটের কোর্ট ইন্সপেক্টর সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, আসামি আদালতে দোষ স্বীকার করেছে। তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। তবে স্বীকারোক্তির বিস্তারিত তথ্য তিনি জানাতে পারেননি।
এরআগে ৪ দিনের রিমান্ড শেষে বৃহস্পতিবার দুপুরে বাবুল মিয়াকে আদালতে তুলে পুলিশ। তবে গ্রেপ্তারের পরপরই পুলিশের কাছে গৃহপরিচারিকার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের কথা বললেও রিমান্ডে বলেছেন ভিন্ন কথা।
বাসা ভাড়ার টাকা জোগাড়ে চুরি করতে গিয়ে দেখে ফেলায় প্রথমে গৃহপরিচারিকা, তারপর গৃহকর্ত্রী ও গৃহকর্তাকে একাই খুন করার কথা রিমান্ডে জানান বাবুল মিয়া। জবানবন্দি শেষে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের এক কর্মকর্তা এসব তথ্য জানান।
পুলিশের ওই সূত্র জানায়, রিমান্ডের সময় পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল জানিয়েছিল, বাসা ভাড়ার জন্য সে অনেক চাপের মধ্যে ছিলেন। এই টাকা জোগাড় করতেই তিনি এই বাসায় চুরি করতে যান। চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে একাই ৩টি খুন করে বাবুল।
পুলিশের সূত্র জানিয়েছে, কিন্তু বাসায় ঢোকার পর গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমের কাছে ধরা পড়ে যান বাবুল। এরপর একে একে গৃহকর্মী তাহমিনা বেগম, গৃহকর্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্তা প্রবীণ ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তারকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন । আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতেও বাবুল একই রকম বক্তব্য দিয়েছেন বলে পুলিশের এই সূত্রটি দাবি করেছে।
বাবুলের বরাত দিয়ে ওই পুলিশ কর্মকর্তা জানন, আব্দুস সাত্তারের বাসায় ঢোকার পরপরই গৃহকর্মী তাহমিনার মুখোমুখি হন বাবুল। তাকে দেখে তাহমিনা দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। এ সময় পেছন থেকে তাহমিনাকে ধরে ফেলেন বাবুল এবং হাতে থাকা ছুরি দিয়ে একের পর এক আঘাত করেন। তাহমিনা মেঝেতে পড়ে যাওয়ার পরও তার মৃত্যু নিশ্চিত করতে ছুরিকাঘাত চালিয়ে যান বাবুল।
তাহমিনার চিৎকার শুনে পাশের কক্ষ থেকে গৃহকর্ত্রী সুরাইয়া বেগম সেখানে ছুটে আসেন। তিনি বাবুলকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং তার পিঠে হাত দিয়ে আঘাত করতে থাকেন। এ সময় পেছনে না তাকিয়েই ছুরি চালান বাবুল। ছুরিটি সুরাইয়া বেগমের গলায় বিদ্ধ হয়। তিনি মেঝেতে পড়ে গেলে পরে আরও কয়েকবার ছুরিকাঘাত করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করেন বাবুল।
এরপর একইভাবে গৃহকর্তা আব্দুস সাত্তারকেও ছুরিকাঘাত করে হত্যা করেন বলে বাবুল জানায়। আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতেও একই বক্তব্য দিয়েছেন বলেও পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান।
বাবুল মিয়া তার জবানবন্দিতে বলে, তিনজনকে খুনের পর সে তার শরীরে লেগে থাকা রক্ত পরিষ্কার করার জন্য বাথরুমে যায়। সেখান থেকে বেরিয়ে একটি কক্ষে টাকা-পয়সা খুঁজতে থাকে। একপর্যায়ে কিছু ৫০০ টাকার নোট পায় যা পরে গুনে দেখে ১৫ হাজার টাকা। বাসার আরও কিছু নেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও বাসার মোবাইল ফোন বেজে ওঠা ও মূল দরজার পাশে কেউ কথা বলার কারণে দ্রুত সেই বারান্দা দিয়েই নিচে নেমে যান বলে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বাবুল মিয়া উল্লেখ করেছে বলে এই পুলিশ কর্মকর্তা বর্ণনা করেন।
কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খান মুহাম্মদ মাইনুল জাকির বৃহস্পতিবার জানান, চার দিনের রিমান্ড শেষে বাবুল মিয়াকে আদালতে হাজির করা হয়। পরে তাকে অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ফারহানা সুলতানার আদালতে তোলা হয়।
এ সময় বাবুল ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিতে আগ্রহ প্রকাশ করে। পরে ম্যাজিস্ট্রেট ফারহানা সুলতানা তার জবানবন্দি রেকর্ড করেন। সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। পরে আদালত তাকে জেলহাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেন।
তবে এসএমপি পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, জবানবন্দি দেওয়ার সময় বাবুল মিয়া শান্ত ছিল। এই পুলিশ কর্মকর্তার মতে বাবুল মিয়া এই তিন খুনের সাথে নিজেকে জড়িয়ে তার জবানবন্দিতে বলে, আগের দিন রাতে তার বাসা ভাড়ার জন্য বাসার মালিক চাপ দেয় এবং বাসা ছেড়ে যেতে বলে।
সে সিদ্ধান্ত নেয় পূর্বপরিচিত রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসা 'নিকুঞ্জ ভিলা'য় সব সময় টাকা-পয়সা থাকে, সেখানেই সে চুরি করবে। ১২ আগস্ট সকাল ৯টা ২৫ মিনিটের দিকে সে সেই বাসায় যায়। বাসার সিঁড়িতে সিসি ক্যামেরা আছে তা আগেই সে জানত, তাই সে বেলকনিতে উঠে যে কক্ষ খোলা পায় সেখানে ঢুকে পড়ে।
প্রসঙ্গত, ১২ আগস্ট সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে নগরীর রায়নগর মিতালি আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসা নিকুঞ্জ ভিলায় তিনজনকে হত্যার ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন- ব্যবসায়ী মো. আব্দুস সাত্তার (৮২), তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) এবং গৃহপরিচারিকা তাহমিনা (২৫)।
পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডের পরপরই ওই দিন বিকেল আনুমানিক সাড়ে ৩টার দিকে রায়নগর রাজবাড়ী এলাকার একটি কলোনিতে অভিযান চালিয়ে বাবুল মিয়াকে (৪০) গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের দাবি, গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছোরা উদ্ধারের অভিযান চালানো হয়। পরে ১৩ আগস্ট সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে বাবুল মিয়ার দেখানো স্থান থেকে ছোরাটি উদ্ধার করা হয়।
পিলিশের দাবি, গৃহপরিচারিকা তাহমিনার সঙ্গে বাবুল মিয়ার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। পূর্বপরিচিত হওয়ায় ঘটনার দিন তিনি ওই বাড়িতে যান। দরজায় নক করলে তাহমিনা দরজা খুলে তাকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেন। পরে একটি কক্ষে গিয়ে বাবুল তাহমিনার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করলে তিনি এতে অমত প্রকাশ করেন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়।
একপর্যায়ে বাবুল তাহমিনাকে ছুরি দিয়ে আঘাত করেন বলে পুলিশ জানায়। এ সময় সুরাইয়া বেগম এগিয়ে এলে তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে আব্দুস সাত্তার এগিয়ে এলে তার সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। এরপর বাবুল বারান্দা দিয়ে পালিয়ে রায়নগর এলাকায় নিজের বাড়িতে ফিরে যান বলে পুলিশের দাবি। পরে পুলিশের বিশেষ টিম সেখানে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে।
হত্যাকান্ডের তিনদিন পর গত ১৪ আগস্ট রাতে সাত্তার-সুরাইয়া দম্পতির প্রবাসী মেয়ে সেলিনা সুলতানা বাদী হয়ে কতোয়ালি থানায় এ মামলা দায়ের করেন। তবে মামলার এজাহারে বাবুল মিয়ার নাম ছিলো না।
১৬ আগস্ট সকালে বাবুল মিয়াকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করে পুলিশ। এ সময় তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে আদালতের বিচারক ফারহানা সুলতানা চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
গ্রেফতারকৃত বাবুল মিয়া রায়নগর রাজবাড়ি এলাকার আখতার মিয়ার কলোনির বাসিন্দা ছিলেন। তার বাবার নাম মৃত নূর মিয়া।
জানা যায়, নিহত আব্দুস সাত্তার সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক পরিচালক ছিলেন। একসময় তিনি কয়লা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এছাড়া তিনি সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের উপদেষ্টা ছিলেন।
আপনার মন্তব্য