সিলেটটুডে ডেস্ক

২৫ জুন, ২০২২ ০৩:৫১

স্বপ্নের গৌরবের পদ্মা সেতু

স্বপ্নের গৌরবের পদ্মা সেতুর উদ্বোধন আজ। প্রমত্ত পদ্মার বুকে সেতু নির্মাণ করে এক সময় অসম্ভব হয়ে ওঠা স্বপ্নকে সম্ভব করে ফেলেছে বাংলাদেশ। আজ তার উদ্বোধন। উদ্বোধন করবেন সেতু নির্মাণের মুখ্য ব্যক্তিত্ব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

শনিবার সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বহুল প্রত্যাশার পদ্মা সেতুতে যান চলাচল উদ্বোধন করবেন।

পদ্মা সেতু বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রতীক। বাংলাদেশের কারিগরি সামর্থ্যের প্রতীক। এতদিন ধনী দেশগুলো বিশাল বিশাল সেতু, টানেল, বাঁধের মতো অবকাঠামো নির্মাণ করে বিশ্বকে চমক দিয়েছে। নিজের শ্রেষ্ঠত্ব ও সামর্থ্যের জানান দিয়েছে। পদ্মা সেতু সারা দুনিয়ায় বার্তা দিয়েছে, বাংলাদেশও পারে।

যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, পাকিস্তানসহ বহু দেশ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন পদ্মা সেতুর মতো বিশাল স্থাপনা সফলভাবে নির্মাণ করতে পারায়।

পদ্মা সেতুর উদ্বোধনে সারাদেশ উৎসবে মেতেছে। রাজধানী ঢাকা থেকে সেতু এলাকা পর্যন্ত সড়ক সেজেছে। উদ্বোধন স্মরণীয় করে রাখতে নবনির্মিত পদ্মা সেতু সাজানো হয়েছে বর্ণিল সাজে। তবে ভয়াল বন্যার কারণে সব এলাকায় উৎসব হচ্ছে না। তার পরও বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লাখো মানুষ এরই মধ্যে হাজির হয়েছেন পদ্মা সেতু এলাকায়, উদ্বোধন উৎসবে শামিল হতে।

গত দুই যুগে পদ্মা সেতু নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা, বিতর্ক হয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগ তুলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এ প্রকল্প থেকে সরে যাওয়ায়, পদ্মা সেতু নির্মাণ আর সম্ভব নয় বলে ধরে নিয়েছিলেন অনেকে। এর আগে হাজার কোটি টাকার প্রকল্পও নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা বা সক্ষমতা ছিল না বাংলাদেশের। সেখানে ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের পদ্মা সেতু কীভাবে বিদেশি ঋণ ছাড়া নির্মাণ সম্ভব! দেশি বিদেশি বিশেষজ্ঞরা সেই প্রশ্নও তুলেছিলেন। আশঙ্কা ছিল ঋণ ছাড়া পদ্মা সেতু নির্মাণের কারণে বাংলাদেশ বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে পড়তে পারে। তবে এসব আশঙ্কা ও হিসাব উল্টে দিয়ে বাংলাদেশ সেতু নির্মাণ করে দেখিয়েছে।

২০০৫ সালে প্রকাশিত পদ্মা সেতুর সম্ভাবত্য যাচাই সমীক্ষাও একই কথা বলছে। ২ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ পদ্মা সেতুর সুফলভোগী হবেন। তবে বাস্তবতা বলছে, দক্ষিণবঙ্গের প্রায় চার কোটি মানুষের জীবনকে সহজ করবে পদ্মা সেতু। ইতিহাসের প্রথমবার দেশের রাজধানীর সঙ্গে সরল পথে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হবে। এতে খুলবে অমিত সম্ভাবনার দুয়ার। দক্ষিণবঙ্গে কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, পর্যটন সর্বক্ষেত্রের উন্নতিতে ভূমিকা রাখতে পদ্মা সেতু।

সমীক্ষা অনুযায়ী, ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বাড়াবে ১ দশমিক ২৩ শতাংশ। তবে দক্ষিণাঞ্চলের জিডিপি বাড়বে ২ দশমিক ৩ শতাংশ। তবে ২১ জেলার মানুষের যে স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে, তার মূল্য অর্থনৈতিক হিসাবের চেয়ে ঢের বেশি।

১৯৯৮ সালে পদ্মা সেতুর পরিকল্পনা হলেও দুই বছরের প্রাক-সমীক্ষা শেষে ২০০১ সালের ৪ জুলাই এই সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন শেখ হাসিনা। পদ্মা সেতু বাংলাদেশের দীর্ঘতম এবং দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় দীর্ঘতম সেতু। এই সেতুর গভীরতম পাইল ১২৫ দশমিক ৪৫ মিটার, যা এক বিশ্বরেকর্ড। কোনো সেতুর জন্য এত গভীর পাইলিং করতে হয়নি। সেতুর জন্য নদীর বুকে ২৬২টি পাইলিং করতে হয়েছে, যা ছিল প্রধান চ্যালেঞ্জ। নদীর ১৩০ মিটার গভীরেও পাথরের স্তর না পাওয়ায়, প্রকল্পের মাঝপথে নকশা বদল করতে হয়েছে। ২২টি পিলারে একটি করে বাড়তি পাইল করতে হয়েছে। এই কঠিন পথ বাংলাদেশ পাড়ি দিয়েছে। বিদেশি পরামর্শকদের সহযোগিতা থাকলেও মূল কাজটি বাংলাদেশের প্রকৌশলীরাই করেছেন।

২০১৪ সালের ডিসেম্বরে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ৩৭ ও ৩৮ নম্বর খুঁটিতে প্রথম স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান হয় স্বপ্নের পদ্মা সেতু। এরপর একে একে ৪২টি পিলারে ১৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের ৪১টি স্প্যান বসিয়ে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়েছে ২০২০ সালের ১০ ডিসেম্বর।

একই সাথে চলতে থাকে রোডওয়ে, রেলওয়ে স্ল্যাব বসানো সহ অন্য কাজ। সেতুর মূল আকৃতি দোতলা। কংক্রিট ও স্টিল দিয়ে নির্মিত হচ্ছে এ সেতুর কাঠামো। মূল সেতু নির্মাণের জন্য কাজ করছে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি (এমবিইসি) ও নদীশাসনের কাজ করছে দেশটির আরেকটি প্রতিষ্ঠান সিনো হাইড্রো করপোরেশন। দুটি সংযোগ সড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণ করেছে বাংলাদেশের আবদুল মোমেন লিমিটেড।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত