রিপন দে, মৌলভীবাজার

০১ জুলাই, ২০২৩ ২০:৪১

বড়লেখায় স্বস্তিতে জামায়াত, অস্বস্তি আওয়ামী লীগে

প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখছেন ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এসহানুল মাহবুব জুবায়ের

আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত মৌলভীবাজার জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলা বড়লেখা। এই উপজেলায় দীর্ঘদিন ঘরোয়া পরিবেশে সভা-সমাবেশ করতে গিয়ে পুলিশের বাধার মুখে পড়ত নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নিবন্ধন বাতিল হওয়া সংগঠন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তবে রাজধানীতে গেল ১০ জুনের সমাবেশের পর থেকে পাল্টেছে দৃশ্যপট।

সীমান্তবর্তী এ উপজেলায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা এখন বেশ উৎফুল্ল। অনেকটা ‘চাপমুক্ত’ পরিবেশেই তারা তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

এরই ধারাবাহিকতায় বড়লেখা উপজেলা যুব ফোরামের ব্যানারে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় জামায়াত-শিবিরের সহস্রাধিক নেতাকর্মীর উপস্থিতিতে বড়লেখায় ঈদ উৎসব ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। গত ৩০ জুন শুক্রবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বড়লেখার স্থানীয় আব্দুর রহমান কনভেনশন হলে এই অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এসহানুল মাহবুব জুবায়ের।

শুধু ঈদ উৎসব ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আড়ালে সাংগঠনিক কার্যক্রম নয়, সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্র শিবির বলতে গেলে প্রকাশ্যেই বড়লেখায় তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কোনো বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে না তাদের। বরং এতদিন যারা পলাতক বা প্রকাশ্য রাজনীতির বাইরে ছিলেন, তাদের এই সরব উপস্থিতি উল্টো আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিষয়টি কিছুটা হলেও অস্বস্তি আর বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের।

খোলস পাল্টে আওয়ামী লীগে ভিড়েছে জামায়াত-শিবির:
বড়লেখায় ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে ও পরে সহিংসতায় জড়িত জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা তাদের কার্যক্রমে কৌশল পাল্টেছে। তাদের অনেকে একাধিক সামাজিক সংগঠন তৈরি করে প্রকাশ্যে কাজ করছেন। আর তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করছেন খোদ আওয়ামী লীগের উপজেলা, পৌর এবং যুবলীগের কয়েকজন নেতা। কেউ কেউ খোলস পাল্টে আওয়ামী লীগের বড় সমর্থকও বনে গেছেন। এতে ক্ষোভ বাড়ছে তৃণমূল আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনে।

পৃষ্টপোষকতায় আওয়ামী লীগ-যুবলীগ:
জামায়াত-শিবির নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছে এমন একটি সংস্থার তথ্যমতে, জেলার সীমান্তবর্তী এই উপজেলায় জামায়ত-শিবির শক্ত ঘাঁটি গড়তে কাজ করছে। এই জন্য তারা নানা কৌশল নিয়েছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে ও পরে সহিংসতায় জড়িত অনেক শিবির কর্মীকে বড়লেখা উপজেলা আওয়ামী লীগের মূল কমিটিতে থাকা ২জন গুরুত্বপূর্ণ নেতা, পৌর আওয়ামী লীগের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও উপজেলা যুবলীগের দায়িত্বে থাকা একজন বড় নেতা নানাভাবে পৃষ্টপোষকতা করছেন। মূলত এ নেতারা তাদের জনবল দেখানো এবং স্থানীয় নির্বাচনে ভোটে কাজে লাগানোর জন্যই তাদের কাছাকাছি রাখেন।

৩০ জুন শুক্রবার যুব ফোরাম বড়লেখা উপজেলা শাখার তত্ত্বাবধায় ও উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আব্দুল্লাহ আল মাহফুজ সুমনের পরিচালনায় এবং সংগঠনের প্রধান পৃষ্টপোষক ও উপজেলা জামায়াতের আমির মুহাম্মদ এমাদুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উৎসবে প্রধান অতিথি জামায়াতে ইসলামী কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এসহানুল মাহবুব জুবায়ের ছাড়াও বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামী মৌলভীবাজার জেলা শাখার আমীর ইঞ্জিনিয়ার এম সাহেদ আলী, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কলেজ কার্যক্রম সম্পাদক আরিফুর রহমান, জেলা কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা ইসলাম উদ্দিন।

অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন জুড়ী উপজেলা কমিটির আমীর হাফেজ নাজমুল ইসলাম, বড়লেখা উপজেলা শাখার নায়েবে আমীর ফয়ছল আহমদ, জুড়ী উপজেলা শাখার নায়েবে আমীর আব্দুল হাই হেলাল, জূড়ী উপজেলা সেক্রেটারি আজিম উদ্দিন, বড়লেখা উপজেলা কর্মপরিষদ সদস্য হেলাল উদ্দিন, দেলাওয়ার হোসাইন, মুজাহিদুল ইসলাম, আলিম উদ্দিন, ডা. কামাল উদ্দিন, রবিউল ইসলাম, আব্দুল বাছিত ও আব্দুস সামাদ, ছাত্রশিবির নেতা সুজাউল মাদ্রাসা সভাপতি আব্দুল ওয়াহিদ, বড়লেখা উপজেলা দক্ষিণ সভাপতি মূসা আহমদ প্রমুখ।

প্রধান অতিথি অ্যাডভোকেট এসহানুল মাহবুব জুবায়ের তার বক্তব্যে বলেন, ‘‘দেশ আজ গভীর সংকটে নিমজ্জিত। দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নেই। আইনের শাষন নেই। সর্বত্র দূর্নীতি আর লোটপাটের রাজত্ব চলছে। বর্তমান সরকারের অনিয়ম ও সীমাহীন দূর্নীতির ফলে আমেরিকা যে সেংশন প্রদান করেছে তাতে শুধু সরকারের ক্ষতি হবে তা নয় বরং দেশ ও দেশের জনগণই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই আওয়ামী লীগ সরকারকে অবশ্যই জনতার কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে জবাবদিহি করতে হবে।

‘‘প্রধান অতিথি জামায়াতের কেন্দ্রীয় আমীর ডা. শফিকুর রহমানসহ কারাগারে আটক সকল নেতৃবন্দকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার দাবী জানান। কেয়ারটেকার সরকার ছাড়া বাংলাদেশে কখনোই অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে পাওে না বলেও তিনি বলেন।’’

মৌলভীবাজার জেলা জামায়াতের আমীর ইঞ্জিনিয়ার সাহেদ আলী বলেন, ‘‘এটি জামায়াতের কোন প্রোগ্রাম নয়। ঈদ উপলক্ষে যুব ফোরামের উদ্যোগে ঘরোয়া পরিবেশে কনভেনশন হলে পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। কিন্তু নেতৃবৃন্দ জামায়াতের আদর্শিক বক্তব্য দিয়েছেন। এতে কোন ধরণের বাধা বিপত্তি কেউ করেনি।’’

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বড়লেখা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) রফিকুল ইসলাম সুন্দরের মুঠোফোনে কল করা হয়। তিনি ফোন না ধরায় তার বক্তব্য জানা যায়নি। তবে তিনি অসুস্থ্য বলে তার পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে পৌর শহরের মধ্যে জামায়াতের বড় সভার বিষয়ে বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হয় উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও পৌর মেয়র আবুল ইমাম মো. কামরান চৌধুরীর সাথে। জামায়াত ইস্যুতে বক্তব্য দিতে তিনি কিছুটা বিব্রতবোধ করে বলেন, ‘‘এখানে আমাদের আওয়ামী লীগের সভাপতি মন্ত্রী মহোদয় আছেন, সাধারণ সম্পাদক আছেন এই বিষয়ে উনাদের বক্তব্য নেন। সাংগঠনিকভাবে উনারা দলের মূল দায়িত্বে, উনারাই বলবেন।’’

তবে আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রত্যক্ষ মদদে সামাজিক সংগঠনের ব্যানারে জামায়াত-শিবির তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে এমন অভিযোগের বিষয়ে কামরান চৌধুরী বলেন, ‘‘আমাদের উপজেলা গ্রাম নির্ভর। যারা রাজনীতি করেন অনেকেই পরিচিত। সামাজিক সংগঠনগুলোতে জমায়াত আছে, এমনটা জানা নেই।’’

তবে আওয়ামী লীগের অপর সাংগঠনিক সম্পাদক ও বড়লেখা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সোয়েব আহমদ বলেন, ‘‘আমরা জানতাম না। সভা শেষে ফেসবুক পোস্ট করায় দেখেছি। এটা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছি। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে হঠাৎ তাদের বড় সভা, চিন্তার বিষয়। প্রশাসনের উদাসীনতাও রহস্যজনক। প্রশাসনের গোয়েন্দা রিপোর্টে তো আগে জানার কথা। কিন্তু তারা কেনো আগে জানেন-নি? সেটাই বড় প্রশ্ন।’’

সামাজিক সংগঠনের ব্যানারে জামায়াত-শিবির তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং তাতে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার পৃষ্টপোষকতার বিষয়ে তিনি সোয়েব আহমদ বলেন, ‘‘নামে-বেনামে তাদের সামাজিক সংগঠন আছে। আগে যারা শিবির করত তারা সামাজিক কর্মকাণ্ড করে। কেউ কেউ যেতে পারেন। বিশেষ করে জনপ্রতিনিধি হলে। তবে তারা (জনপ্রতিনিধিরা) তাদের রাজনৈতিক পরিচয় জেনে যাচ্ছেন কি-না, জানি না। জেনে বুঝে গেলে এটা ঠিক নয়।

‘‘দলের ভেতরে থেকে পৃষ্টপোষকতা, অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়া খারাপ জিনিস। আওয়ামী লীগ করে জেনে বুঝে জামায়াত ঘেষা সামাজিক সংগঠনের অনুষ্ঠানে যাওয়া অবশ্যই উদ্বেগজনক বিষয়। না জেনে গেলে ভিন্ন।’’ তবে দলের ভেতরে শুদ্ধি অভিযান প্রয়োজন বলে মনে করি, ‘‘যোগ করেন সোয়েব আহমদ।’’

বড়লেখা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইয়ারদৌস হাসান বলেন, ‘‘জামায়াতের ব্যানারে কোনো প্রোগ্রাম হয়নি। এখানে জামায়াতের কেউ ছিল-কিনা খোঁজ খবর নিচ্ছি।’’

আপনার মন্তব্য

আলোচিত