তপন কুমার দাস

১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:৫৭

সাগর-রুনি হত্যা: ১৩ বছর ধরে বিনাবিচারে কারাগারে মৌলভীবাজারের এনাম

জামিন চান মামলার বাদী

মুঠোফোনের পর্দায় ছেলের খবরটি দেখছিলেন ফাতেমা বেগম। কারাগারে থাকা ছেলে এনাম আহমেদ ওরফে হুমায়ুন কবীর, পরিবারের কাছে এনামুল—দীর্ঘদিন বন্দী থাকার কারণে তাঁর মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে, এমন খবর।

খবরটি দেখতে দেখতে চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল তাঁর। ছেলের এমন অসহায় অবস্থায় মা হিসেবে কিছুই করতে পারছেন না তিনি। সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে এমন খবর আসার পর ছেলের সবশেষ অবস্থা জানতে পারেন ফাতেমা বেগম।

এক দিন, দুই দিন নয়—প্রায় সাড়ে ১৩ বছর ধরে ছেলের জন্য অপেক্ষা করছেন ফাতেমা। এই দীর্ঘ সময়ে পরিবারটির জীবনে নেমে এসেছে একের পর এক বিপর্যয়। যে ছেলে পরিবারের স্বচ্ছলতা ফেরাতে ঢাকায় নিরাপত্তাপ্রহরীর চাকরি করতে গিয়েছিলেন, সেই ছেলেই এখন জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় কাটাচ্ছেন কারাগারে।

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে এনামুলকে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে তাঁর বাবা কালা মিয়াকেও র‌্যাব পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ পরিবারের। প্রায় ২১ দিন পর তাঁকে ভৈরবের কাছে ফেলে রেখে যাওয়া হয়।

পরিবারের ভাষ্য, ওই সময় তাঁকে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছিল। এরপর আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি কালা মিয়া। শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে প্রায় ছয়-সাত মাস আগে তিনি মারা যান।

একদিকে স্বামীর মৃত্যু, অন্যদিকে ছেলের দীর্ঘ কারাবাস—সব মিলিয়ে ফাতেমা বেগমের পরিবার এখন প্রায় নিঃস্ব। তাঁর একটাই কথা, ‘আমার ছেলে যদি নির্দোষ হয়, তাকে মুক্তি দেওয়া হোক। অন্তত সাগর-রুনি হত্যার সঙ্গে আমার ছেলে জড়িত নয়—এই কলঙ্ক থেকে আমাদের মুক্তি দেওয়া হোক।’

এনামুল আহমেদ মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণভাগ দক্ষিণ ইউনিয়নের পূর্ব-দক্ষিণভাগ গ্রামের মৃত মকবুল আলী ওরফে কালা মিয়ার ছেলে।

‘ওরা আমার স্বামীকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল’ :

গত সোমবার ফাতেমা বেগমের সঙ্গে কথা হয়। পুরোনো দিনের কথা বলতে গিয়ে বারবার থেমে যাচ্ছিলেন তিনি। স্বামী কালা মিয়ার কথা উঠতেই কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে তাঁর।

ফাতেমা জানান, তাঁর স্বামীর দক্ষিণভাগ বাজারে একটি ফার্নিচারের দোকান ছিল। আনুমানিক ২০১২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তিনি দোকানে যাওয়ার পথে নিখোঁজ হন।
ফাতেমার ভাষ্য, ‘র‌্যাব পরিচয়ে’ কয়েকজন তাঁকে তুলে নিয়ে যায়। গাড়িতে তোলার পর তাঁর চোখ বেঁধে ফেলা হয়। এরপর অজ্ঞাত একটি স্থানে নিয়ে গিয়ে তাঁকে নির্যাতন এবং বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়েছিল বলে কালা মিয়া পরে পরিবারের কাছে জানিয়েছিলেন।

সেদিন স্বামীর কোনো খোঁজ না পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন ফাতেমা। থানা-পুলিশসহ বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করেছিলেন। আত্মীয়স্বজনের কাছেও ছুটেছিলেন। পরিবারের সামর্থ্য অনুযায়ী টাকা-পয়সা খরচ করে স্বামীর সন্ধান করেছিলেন। কিন্তু কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছিল না।

এর মধ্যে একদিন কালা মিয়ার মুঠোফোন থেকে পরিবারের কাছে একটি ফোন আসে। তিনি এনামুলের বিষয়ে জানতে চান। এরপর ফোন কেটে দেন।

ফাতেমা বলেন, পরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে তাঁর স্বামীকে তুলে নেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। প্রায় ২১ দিন পর তাঁকে ভৈরবের কাছে ফেলে রেখে যাওয়া হয়। যাওয়ার সময় সাথে যে মোবাইল ও নগদ ৮০০ টাকা ছিল তাও সাথে দিয়া গেছে। মারাত্মক অসুস্থ অবস্থায় সেখানকার লোকজন তাকে সিলেটের একটি বাসে তোলে দেন। মোবাইলে খবর দেওয়ার পর ছেলেরা সিলেট কদমতলী বাসষ্ট্যান্ড থেকে বাড়ি নিয়ে আসেন।

তাঁর দাবি, স্বামীকে তখন হুমকি দেওয়া হয়েছিল—তাঁকে তুলে নেওয়া ও নির্যাতনের বিষয়ে কারও কাছে কিছু বললে আবারও তুলে নেওয়া হবে।

নির্যাতনের পর আর স্বাভাবিক হননি এনামুলের বাবা :

ফাতেমা বলেন, বাড়ি ফিরে স্বামী তাঁকে তুলে নেওয়া ও অজ্ঞাত স্থানে নির্মম নির্যাতনের ঘটনা জানিয়েছিলেন। সেই ঘটনার পর থেকেই তিনি বদলে যান। শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ার পাশাপাশি মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েছিলেন। ‘ওই ঘটনার পর আমার স্বামী আর স্বাভাবিক হতে পারেননি। শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে বাকি জীবন কাটিয়েছেন। ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেল। তাঁর চিকিৎসার পেছনে অনেক টাকা খরচ হয়েছে,’ বলেন ফাতেমা।

চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি মারা যান কালা মিয়া। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাঁর চিকিৎসা চালাতে হয়েছে বলে জানান পরিবারের সদস্যরা।

ফাতেমার ভাষ্য, স্বামীর চিকিৎসা, সংসারের খরচ এবং দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকটে তাঁদের পক্ষে এনামুলের জন্য নিয়মিত আইনগত সহায়তাও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে যদি দোষী হয়ে থাকে, আমরা তখন তার বিচার চেয়েছিলাম। কিন্তু এত বছর ধরে তদন্ত চলার পরও তার বিরুদ্ধে কোনো অপরাধ পাওয়া গেল না। শুধু সন্দেহের কারণে আমার ছেলে আর আমাদের পরিবারটাকে শেষ করে দেওয়া হয়েছে।’

‘ভয়ে ছেলের জন্য আইনজীবীও নিযুক্ত করেননি’ :

স্বামী ধরে নেওয়ার পরে ও ফেলে যাওয়ার পর তিনিসহ প্রতিটি ছেলে-মেয়ের প্রতিটি মুহুর্ত কেটেছে গ্রেফতার গুম, খুনসহ অজানা নানা আতংকে।

ফাতেমা বেগমের দাবি, পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় এনামুলের জন্য ভালোভাবে আইনজীবীও নিয়োগ করতে পারেননি।

‘কারাগারে ভাইটি পাগল হয়ে গেছে, ভয়ে কখনও খোঁজও নেইনি’ :

এনামুলের বড় ভাই শাহিন আহমদ বলেন, তাঁদের পরিবার একসময় স্বাভাবিক জীবনযাপন করত। এনামুল ঢাকায় চাকরি করে পরিবারকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু তাঁর গ্রেপ্তারের পর সবকিছু বদলে যায়।

শাহিনের ভাষ্য, ভাইকে গ্রেপ্তারের পর তাঁরা ভয় ও আর্থিক সংকটের মধ্যে পড়ে যান। টাকার অভাবে এবং বিপদের আশঙ্কায় তাঁরা নিয়মিতভাবে ভাইয়ের খোঁজখবরও নিতে পারেননি।

তিনি বলেন, ‘আমাদের বিপদে ফেলা হতে পারে—এই ভয় ছিল। টাকার অভাবও ছিল। এ কারণে আমরা তখন মামলা চালাতেও পারিনি।’

বাবার প্রসঙ্গ টেনে শাহিন বলেন, ‘আমার নিরপরাধ বাবাকে তুলে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে। সেই নির্যাতনের পর তিনি আর স্বাভাবিক হতে পারেননি। চিকিৎসা করাতে করাতে শেষ পর্যন্ত মারা গেলেন। আর আজ আমার ভাই কারাগারে পাগল হয়ে গেছে।’ এনামুল নির্দোষ হলে তাঁকে দ্রুত মুক্তি দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানান শাহিন।

তদন্তে এখনো মেলেনি জড়িত থাকার প্রমাণ :

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ৫৮/এ/২ নম্বর বাসার একটি ফ্ল্যাট থেকে সাংবাদিক সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সাগর মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক এবং রুনি এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ছিলেন।

রুনির ভাই নওশের আলম বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা করেন। প্রথমে মামলাটি তদন্ত করে থানা-পুলিশ। চার দিন পর তদন্তভার দেওয়া হয় ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগকে (ডিবি)। তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার ৬২ দিনের মাথায় ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল হাইকোর্টে তদন্তে ব্যর্থতার কথা জানায় ডিবি।

এরপর মামলার তদন্তভার দেওয়া হয় র‌্যাবকে। দীর্ঘ সময় তদন্ত করেও র‌্যাব প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি। একপর্যায়ে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় ১১২ বার পেছায়। পরে মামলাটির তদন্তে চার সদস্যের টাস্কফোর্স গঠন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী বর্তমানে ওই টাস্কফোর্সের আওতায় মামলাটি তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত সংস্থা পিবিআই। এনাম আহমেদ ছিলেন ওই ভবনের নিরাপত্তাপ্রহরী। পরে তাঁকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব আদালতে সোপর্দ করে। সেই থেকে তিনি কারাগারে।

সম্প্রতি পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তর বিভাগের একটি তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্তকালে এখন পর্যন্ত এনাম আহমেদের বিরুদ্ধে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

জিজ্ঞাসাবাদে এলোমেলো উত্তর :

আদালতের আদেশের আলোকে গত ২২ এপ্রিল কাশিমপুর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে এনাম আহমেদকে পুণরায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি কোনো প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর দিতে পারেননি। অনেক কিছু মনে করতে পারছিলেন না। তাঁর উত্তরও ছিল এলোমেলো। তদন্ত কর্মকর্তার পর্যবেক্ষণে তাঁকে মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন বলে মনে হয়েছে।

কারা কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন বন্দী থাকার কারণে এনাম বর্তমানে মানসিক ভারসাম্যহীনতায় ভুগছেন। তাঁকে সাধারণ বন্দীদের থেকে আলাদা একটি ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে এবং প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তাঁর দ্রুত সুচিকিৎসা প্রয়োজন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

একজন সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তারের পর যে মানুষটির জীবনের সাড়ে ১৩ বছর কেটে গেল কারাগারে, এখন তাঁর মানসিক অবস্থাও প্রশ্নের মুখে। অথচ তদন্ত প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, এই দীর্ঘ তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

মুক্তি চান সাগর-রুনির স্বজনও :
এনামুলের মুক্তির দাবি শুধু তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকেই আসেনি। নিহত সাংবাদিক মেহেরুন রুনির ভাই নওশের আলমও চান, এনামুলকে জামিন দিয়ে মুক্তি দেওয়া হোক এবং তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হোক।

সম্প্রতি গণমাধ্যমের সাথে আলাপকালে নওশের আলম বলেন, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত, সঠিক তদন্তের মাধ্যমে তাঁদের শনাক্ত করে সুস্পষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নিরপরাধ কাউকে যেন হয়রানি করা না হয়। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই এনামুলকে জামিন দিয়ে মুক্তি দেওয়া হোক। তাঁর সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা হোক।’

সাগর-রুনি হত্যার বিচার চান নিহত সাংবাদিক দম্পতির স্বজনেরা। সেই সঙ্গে তাঁরা চান, তদন্তের নামে নিরপরাধ কেউ যেন দীর্ঘদিন হয়রানির শিকার না হন।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত