১২ মে, ২০২৬ ১২:৫৮
দেশের বিভিন্ন বার অ্যাসোসিয়েশন নির্বাচনে এবার আওয়ামী লীগ-সমর্থক আইনজীবীদের নির্বাচন করতে দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন নির্বাচনেও অংশ নিতে পারছেন না আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবী নেতারা। সুপ্রিম কোর্টের ৭৮ বছরের ইতিহাসে এই ঘটনাকে নজিরবিহীন ও স্বেচ্ছাচারী ঘটনা বলছেন আইনজীবীরা। নির্বাচনে অংশ নিলেই অনেকেই জিতে যাচ্ছেন, এমনটা দেখা গেছে দেশের বিভিন্ন বার অ্যাসোসিয়েশনে। ফলে মনোনয়নপত্র উত্তোলন থেকে শুরু করে, জমা দান, এবং যাচাই-বাছাইপর্বে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জোরপূর্বক বাদ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সর্বশেষ গাজীপুর জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীদের নির্বাচনে বাধা দেওয়া হয়েছে। এনিয়ে বিক্ষুব্ধ আইনজীবীরা গণমাধ্যমে প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন। তারা বলেছেন, নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া এবং পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়া প্রত্যেক সদস্যের মৌলিক অধিকার। এই প্রক্রিয়ায় কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা আইনজীবী সমিতির মর্যাদা ও ভাবমূর্তিকে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করে।
জানা গেছে, দেশের ৮৪টি আইনজীবী সমিতির মধ্যে চলতি বছর ৪১টিতে নির্বাচন হয়েছে। এর মধ্যে ১৫টিতে আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীরা অংশ নিয়েছেন। তার ৯টিতে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ পদে বিজয়ী হয়েছেন। বাকিগুলোতে একাধিক পদে জয়লাভ করেছেন। সর্বশেষ ১৬ এপ্রিল পিরোজপুর জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে ১৩টি পদের মধ্যে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ সাতটি পদে জয় পান আওয়ামীপন্থীরা। এরপর আর আওয়ামীপন্থীদের নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি।
আওয়ামী লীগ-সমর্থক আইনজীবীদের এই বিপুল বিজয়ে নড়চড়ে বসে বিএনপি ও জামায়াতসমর্থক আইনজীবীরা। এরপর তারা কোথাও আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীদের নির্বাচনে অংশ নিতে দিচ্ছে না। কখনও মনোনয়নপত্র উত্তোলনে বাধা, জমা দানে বাধা, আবার কোথাও বা যাচাই-বাছাইপর্বে বাদ দেওয়া হচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় গঠিত ঢাকা আইনজীবী সমিতির অ্যাডহক কমিটি সিদ্ধান্ত নেয়, বারের সভাপতির অনুমতি ছাড়া কেউ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। নির্বাচনের ঠিক আগে নেওয়া এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আওয়ামীপন্থী ১৬ জন আইনজীবীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। ফলে তারা আর নির্বাচন করতে পারেনি। ফলে ২৪টি পদের মধ্যে ২৩টিতে বিএনপি এবং একটি পদে জামায়াতের প্রার্থী জয়লাভ করে। এই পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীদের নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়ার পর অর্থাৎ গত ১৬ এপ্রিলের পর থেকে ২৬টি আইনজীবী সমিতির নির্বাচন হয়েছে। ২৩টিতে বিএনপিপন্থীরা জয়লাভ করেছেন। এর মধ্যে ১০টি সমিতির সবকটি পদে তারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হন। মাদারীপুরসহ পাঁচ জেলায় জামায়াতপন্থী আইনজীবীরা এক বা একাধিক পদে জয় পেয়েছেন। বাংলাদেশ বার কাউন্সিল সূত্রে মোট ৩৮টি বারের ফলাফল নিশ্চিত হওয়া গেছে। তিনটির ফল জানা যায়নি।
এখন পর্যন্ত আইনজীবী সমিতির যে ৪১টি নির্বাচন হয়েছে, তাতে আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীরা অংশ নিতে পেরেছেন মাত্র ১৫টি। তন্মধ্যে তারা ৯টিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছেন। এর মধ্যে মাদারীপুরে গত ৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ১৫টি পদের মধ্যে ১৩টিতে জয় পেয়েছেন আওয়ামীপন্থীরা। সভাপতি এবং আপ্যায়ন ও সংস্কৃতি সম্পাদক পদে জামায়াতপন্থীরা জয়লাভ করেন।
গত ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সিলেটে সাধারণ সম্পাদকসহ ১০টি পদে আওয়ামীপন্থীরা জয়লাভ করেন। সভাপতিসহ ৭টি পদে জয় পান বিএনপিপন্থীরা। জামায়াতপন্থীরা বিজয়ী হন তিনটিতে। নোয়াখালী জেলা বারে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদকসহ ৯ পদে আওয়ামীপন্থীরা জয়লাভ করেছেন। সভাপতিসহ পাঁচটি পদে বিএনপি এবং একটি সদস্য পদে জামায়াতের প্রার্থী নির্বাচিত হন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১৫ পদের মধ্যে সাধারণ সম্পাদকসহ ৯টি পদে জয়লাভ করেন আওয়ামীপন্থীরা। বিএনপিপন্থীরা পেয়েছেন ৫টি পদ। লক্ষ্মীপুরে আওয়ামীপন্থী আটজন আইনজীবী বিজয়ী হয়েছেন। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ছয়টি পদে বিএনপিপন্থীরা জয়লাভ করেন। পিরোজপুরে গত ১৬ এপ্রিল অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছেন আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরা। ১৩টি পদের মধ্যে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ সাতটি পদে বিজয়ী হয়েছেন তারা। বিএনপিপন্থীরা যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদসহ ছয়টি পদে জয়ী হন।
কক্সবাজারে ১৭টি পদের মধ্যে সাতটিতে আওয়ামীপন্থী বিজয়ী হয়েছেন। চারটিতে বিএনপিপন্থী ও ছয়টি পদে জামায়াতপন্থী আইনজীবীরা বিজয়ী হন। ঠাকুরগাঁওয়ে গত ৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ১২টি পদের মধ্যে সাধারণ সম্পাদকসহ পাঁচটিতে আওয়ামীপন্থীরা জয় পেয়েছেন। সভাপতিসহ সাতটিতে জয়ী হয়েছেন বিএনপিপন্থীরা। এ ছাড়া ফরিদপুরে চারটি, কুষ্টিয়ায় তিনটি, রাজবাড়ী, মানিকগঞ্জ ও কুমিল্লায় দুটি করে পদে আওয়ামীপন্থীরা জয়লাভ করেন। সুনামগঞ্জে শুধু সাধারণ সম্পাদক পদে আওয়ামীপন্থী আইনজীবী জয় পান।
শেরপুর বারে ১৫টি পদের মধ্যে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ১১টিতে বিএনপিপন্থীরা বিজয়ী হন। বাকি পদে জামায়াতসহ অন্যরা জয়ী হয়েছেন। একইভাবে খুলনায় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ১৪টি পদে নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপিপন্থীরা। ঝালকাঠিতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ১১ পদে এবং নড়াইলে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছেন বিএনপিন্থীরা। রাজশাহীতে ২১টি পদের মধ্যে ২০টিতে জয়লাভ করেছেন বিএনপিপন্থীরা। সহসভাপতি পদে গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতি মনোনীত প্যানেল থেকে জয়লাভ করেছেন। নওগাঁয় সভাপতিসহ ১২টি পদে জয় পেয়েছেন বিএনপিপন্থীরা। সাধারণ সম্পাদক পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচিত হন। সিরাজগঞ্জে ১৭টি পদের মধ্যে ১৬টিতে জয়লাভ করেন বিএনপিপন্থীরা। অন্যজন স্বতন্ত্র। ফেনীতে ১৫ পদের মধ্যে সভাপতি-সম্পাদকসহ ১০টিতে জয়লাভ করেছেন বিএনপিপন্থীরা। জামায়াতপন্থীরা পেয়েছেন চারটি পদ। একটি পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। এ ছাড়া মাগুরা, দিনাজপুর, পঞ্চগড়ে বিএনপি ও জামায়াতপন্থীরা নির্বাচিত হন।
আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে নির্বাচন হয়েছে শরীয়তপুর, ময়মনসিংহ, জামালপুর, চাঁদপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী, মেহেরপুর, পাবনা, টাঙ্গাইল ও মুন্সীগঞ্জে। এই সবকটি আইনজীবী সমিতিতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন বিএনপিন্থীরা।
সর্বশেষ গত ২৯-৩০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ঢাকা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। নির্বাচনে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ২৩টি পদে বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা বিজয়ী হয়েছেন।
১৩ ও ১৪ মে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচনে আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের অংশ নিতে দেওয়া হচ্ছে না। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির অ্যাডহক কমিটি ২৪ ঘণ্টার নোটিসে বিশেষ সাধারণ সভা করে আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হবে না বলে সিদ্ধান্ত নেয়। এর মাধ্যমে আওয়ামীপন্থী ৪২ আইনজীবীর মনোনয়নপত্র বাতিল করে দেওয়া হয়।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির ১৪টি পদে আগামী এক বছরের জন্য নেতৃত্ব নির্বাচন করবেন আইনজীবীরা। মোট ভোটার ১১ হাজার ৮৯ জন। তবে এবারই প্রথম ভোটারদের সামনে বিকল্প বেছে নেওয়ার সুযোগ সীমিত। ঢাকা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনের মতো এখানেও ভোট পড়ার আশঙ্কা তাই থেকেই যাচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি একটি পেশাজীবী সংগঠন। এখানে আইনজীবী হিসেবে সবাই নির্বাচন করে থাকেন। সুপ্রিম কোর্ট বারের ৭৮ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো দলের প্রার্থীকে নির্বাচনে অংশ নিতে বাধা দেওয়া হলো। এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোতাহার হোসেন সাজু গণমাধ্যমকে বলেছেন, এই স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসে কলঙ্কজনক, যা আইনজীবীরা কোনোভাবেই মেনে নেবেন না।
তবে তার এই বক্তব্যে একমত নন বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল। তিনি বলেছেন, সারাদেশে সব জেলা বারে যেভাবে নির্বাচন হচ্ছে, সুপ্রিম কোর্ট বারেও একইভাবে নির্বাচন হবে। তিনি বলেন, যে কারণে ওনারা (আওয়ামী লীগ-সমর্থক আইনজীবী) জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি, একই কারণে বারে নির্বাচন করার সুযোগ পাচ্ছেন না।
গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হাসান তারিক চৌধুরী বলেন, ‘আমরা চাই সুপ্রিম কোর্ট বারে স্বাধীন ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নির্বাচন হোক। কিন্তু এবারের নির্বাচনে সুপ্রিম কোর্ট বার সমিতি সংবিধান লঙ্ঘন করে অন্যায়ভাবে বহু যোগ্য প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করেছে। এর মধ্য দিয়ে স্বৈরাচার আমলের ধারাবাহিকতায় একটি প্রহসনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।’
উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। এরপর নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করে। তবে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনসহ দেশে কোন আইনজীবী সমিতির নির্বাচন দলীয় ব্যানারে হয় না।
আপনার মন্তব্য