সিলেটটুডে ডেস্ক

১৩ জুন, ২০২৬ ১৭:৪৮

অপহরণের ‘নাটক’ সাজানো’ জিসান ডিবি হেফাজতে, বহিস্কার করল শিবির

কুমিল্লার দাউদকান্দিতে এক যুবতীর (২৫) দায়ের করা ধর্ষণ মামলায় ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় নেতা জিসান মিয়া প্রধানকে (২৮) জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। শুক্রবার রাতে তার বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে দাউদকান্দি মডেল থানায় মামলা হয়।

বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এক যুবতীকে ধর্ষণ ও ওষুধের মাধ্যমে ভ্রূণ নষ্ট করার অভিযোগে এ মামলা দায়ের করেন ভুক্তভোগী ওই নারী। জিসানকে ডিবি হেফাজতে নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দাউদকান্দি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আ. বারী।

এর আগে, শুক্রবার রাত থেকে জামায়াত ইসলাম ও শিকির নেতারা অভিযোগ করেন, জিসানকে অপহরণ করা হয়েছে। জিসান গুম হয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন কেউ কেউ।

জামায়াতের আমির ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা শফিঢকুর রহমানও ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে অভিযোগ করেন, ‘গতকাল রাতে (১১ জুন) বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির কুমিল্লা জেলা পশ্চিম শাখার সাবেক সভাপতি ও কেন্দ্রীয় সহকারী আন্তর্জাতিক সম্পাদক জিসান আহমেদ অপহৃত হয়েছেন।’

তবে শুক্রবার রাতেই গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে কুমিল্লা জেলা পুলিশ জানায়, জিসানকে কেউ অপহরণ করেনি, তিনি স্বেচ্ছায় আত্মগোপনে ছিলেন।

অভিযুক্ত জিসান মিয়া প্রধান বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক। তিনি ছাত্রশিবিরের কুমিল্লা জেলা পশ্চিম শাখার সাবেক সভাপতি। জিসান জেলার দাউদকান্দি উপজেলার বীরবাগ গ্রামের সফিকুল ইসলামের ছেলে। ওই মামলায় জিসান ছাড়াও ধর্ষণে সহায়তার অভিযোগে সেকান্দর আলী (২৪), গোলাম রাব্বী (২৬), সজিব হাসানকে (২১) আসামি করা হয়েছে। তাদের সবার বাড়ি দাউদকান্দিতে।

শুক্রবার রাতে জেলা পুলিশের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গত ২০ মে জিসান তার দাউদকান্দির ভাড়া বাসায় বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এক নারীকে ধর্ষণ করেন। অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে ওষুধের মাধ্যমে ভ্রূণ নষ্ট করা হয়। এ ঘটনার পর ওই নারী জিসানকে বিয়ের জন্য চাপ দিলে জিসান শুক্রবার বিয়ে করবে বলে সম্মতি দেন।

বিবৃতিতে পুলিশ আরও জানায়, বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জিসান বিয়ে নিয়ে টালবাহানা করে আত্মগোপনে চলে যান। এ ঘটনায় তিনি তার চাচাতো ভাই রাসেল আহমেদের মাধ্যমে থানায় নিখোঁজের জিডি করান।

এদিকে জিসানকে উদ্ধারের খবর পেয়ে শুক্রবার রাতে ওই নারী বাদী হয়ে ধর্ষণ এবং ভ্রূণ নষ্ট করার অভিযোগে জিসানকে প্রধান আসামি করে দাউদকান্দি মডেল থানায় মামলা করেন।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, নিখোঁজ ওই ছাত্রশিবির নেতাকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাকে কেউ অপহরণ করেনি। এক নারীর সঙ্গে প্রতারণামূলক ঘটনার জের ধরে সে নিজে আত্মগোপনে ছিল। ওই নারী তার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। নারী ও শিশু নির্যাতন দমনে মামলাটি করা হয়। ওই নারী তার বিরুদ্ধে ভ্রূণ নষ্টসহ বেশ কিছু অভিযোগ করেছেন।

এর আগে, শুক্রবার রাত ১০টার দিকে তাকে রেলওয়ে জংশন থেকে উদ্ধার করে লাকসাম ক্রসিং থানা পুলিশ।

শনিবার দুপুর পৌনে ১২টার দিকে দাউদকান্দি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আ. বারী বলেন, জিসানের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা হয়েছে। ডিবি হেফাজতে সে এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তার বিরুদ্ধে বিধিমোতাবেক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

জিসানকে বহিষ্কার ছাত্রশিবিরের : প্রেমের সম্পর্ক প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী শিবির নেতা জিসান আহমেদকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রচার সম্পাদক এসএম ফরহাদ।

শনিবার (১৩ জুন) দুপুর ২ টার দিকে এস এম ফরহাদ তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে এক পোস্টের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

পোস্টে জিসানের উদ্ধার ও পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে এস এম ফরহাদ তিনটি মূল বিষয় তুলে ধরেছেন। তা হুবুহু তুলে ধরা হলো-

জিসান আহমদের ইস্যুতে আমাদের বক্তব্য

১. গতরাতে পুলিশ জিসানকে উদ্ধার করার পর থেকে আজ দুপুর ১:৩০টা পর্যন্ত ছাত্রশিবিরের কোনো প্রতিনিধি দল কিংবা জিসানের পরিবারের সদস্যদের তার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেয়নি প্রশাসন। এখনো জিসান পুলিশের জিম্মায় রয়েছে। ফলে নিখোঁজ সংক্রান্ত তার বিস্তারিত বক্তব্য জানবার সুযোগ আমরা পাইনি। ফলশ্রুতিতে, নিখোঁজ কিংবা অপহরণ সংক্রান্ত বিষয়ে পুলিশের বক্তব্য ছাড়া দ্বিতীয় কোন সোর্স এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে নেই।

২. জিসানের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরকারী বিধবা নারী লিজা আক্তারের বড় বোন জানিয়েছেন, গতকাল বিকালে ১৫-২০ জন পুলিশ বা প্রশাসনের লোক তাদের বাড়ি থেকে লিজাকে নিয়ে যায়। এ সময় পরিবারের অন্য সদস্যদের তার সঙ্গে যেতে দেওয়া হয়নি। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, লিজা ও তার বাবাকে এখনো পুলিশের জিম্মায় আইসোলেটেড অবস্থায় রাখা হয়েছে এবং তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। লিজার বড় বোন সাবিকুন্নাহার জানান, বাড়ি থেকে পুলিশ নিয়ে যাওয়ার সময় থেকে শুরু করে থানায় নেওয়া, মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া এবং বর্তমান পরিস্থিতি—কোনো বিষয় সম্পর্কেই তিনি বিস্তারিত অবগত নন। কারণ, তিনি বা তার পরিবারের সদস্যরা পুলিশের জিম্মায় থাকা তার বোন লিজা ও তার বাবার সাথে কোন প্রকার যোগাযোগ করতে পারেনি। তবে, তিনি জিসান এবং লিজার প্রেমের সম্পর্কের ব্যাপারে আগে থেকেই অবগত বলে জানিয়েছেন।

৩. সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে না পারায় এখন পর্যন্ত আমরা নিখোঁজ ঘটনার প্রকৃত রহস্য বা বাস্তবতা উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হইনি। তবে প্রেমের সম্পর্ক প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী তাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কোনো ধরণের অপরাধ প্রমাণিত হলে ভুক্তভোগীকে সকল প্রকার আইনি সহায়তা প্রদান করা হবে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত