২৭ জুন, ২০২৬ ১৮:৩৩
চব্বিশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ক্ষমতা গ্রহণ করেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তার সরকার টিকেছিল ১৮ মাস। এরপর নিয়মিত নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। ইউনূসের এই শাসনামলে তার উপদেষ্টাদের নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। নানা ক্ষেত্রে অনিয়মের আলোচনার এ পর্যায়ে সামনে এসেছে বিদেশের চিকিৎসা বিল। বিদেশে চিকিৎসা নিতে গেছেন অনেক উপদেষ্টা। সঙ্গে নিয়েছেন পরিবারের সদস্যরাও। বিলের নামে তুলেছেন কাড়ি কাড়ি টাকা।
দ্য মিনিস্টার্স এবং মিনিস্টার্স অব স্টেট অ্যান্ড ডেপুটি মিনিস্টার্স (রেমুনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজ) অ্যাক্ট— এই আইনগুলোতেই মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর সুবিধা নির্ধারিত। এই আইনের বলে তারা বিদেশে চিকিৎসা নিতে পারেন। আইনগত বৈধতা থাকলেও নৈতিকতা ও জনআস্থার জায়গায় এ নিয়ে বিতর্ক চলমান। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে তারাও এই আইনগুলোর আওতায় পড়েন।
জাতীয় দৈনিক ‘আগামীর সময়’ ইউনূস আমলের উপদেষ্টাদের চিকিৎসা বিল নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে অন্তর্বর্তী সরকারের ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন একাই নিয়েছেন ৮১ লাখ ৯১ হাজার ৪৮৮ টাকা। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে প্রকাশিত এই তথ্য।
এর বাইরে বিদেশে চিকিৎসা নিয়েছেন খোদ স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম। চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর যান তিনি।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, ইউনূস সরকারের অনেক উপদেষ্টা বিদেশে চিকিৎসার জন্য লাখ লাখ টাকা নিয়েছেন। খালিদ হোসেনের পর এই তালিকায় দ্বিতীয় নামটি হচ্ছে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের। অন্তর্বর্তী সরকারের এই অর্থ উপদেষ্টা আঠারো মাসে বিদেশে চিকিৎসার জন্য সরকারি কোষাগার থেকে বিল নিয়েছেন ৭৯ লাখ ৩৮ হাজার ২২৯ টাকা। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের বিদেশে চিকিৎসা খরচের এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয়।
খালিদ ও সালেহউদ্দিনের পর তৃতীয় সর্বোচ্চ ৮ লাখ ৭০ হাজার ৭৪৪ টাকা বিদেশে চিকিৎসা বিল নিয়েছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী নিয়েছেন ৭ লাখ ১৫ হাজার ৬৪৯ টাকা।
৫ লাখ ৩৯ হাজার ৯৩৫ টাকা নিয়েছেন বিদ্যুৎ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান। ভূমি উপদেষ্টা হাসান আরিফ (প্রয়াত) নিয়েছেন ২ লাখ ৬৭ হাজার ২১৬ টাকা। ২ লাখ ৩৫ হাজার ৭২৯ টাকা নিয়েছেন প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. এম আমিনুল ইসলাম। খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার নিয়েছেন ১ লাখ ৭০ হাজার ১৩৪ টাকা।
এরবাইরে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদ উদ্দীন মাহমুদ, শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান, প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার উপদেষ্টা শেখ মইনউদ্দিন চিকিৎসা বাবদ নানা অংকের টাকা নেন সরকারি কোষাগার থেকে।
আগামীর সময় পত্রিকার এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর সামাজিক মাধ্যমে তোলপাড় চলছে। ধর্মের নামে নীতি-নৈতিকতার বয়ান দেওয়া খালিদ হোসেনের এই চিকিৎসা বিল নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, প্রশ্ন তুলছেন সততা ও নৈতিকতার। মাত্র ১৮ মাসে এই বিশাল বিলের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন অনেকের, অনেকের দাবি তদন্তের। যদি সাবেক এই উপদেষ্টা বলছেন, আমি খুব সততার সঙ্গে দায়িত্বপালন করেছি।
প্রতিবেদনে জানা যায়, “হেফাজত ইসলামের সাবেক নায়েবে আমীর চিকিৎসা নিয়েছেন থাইল্যান্ডে। হৃদরোগ খালিদ হোসেনের। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট বলেছিল হার্টে যে সমস্যা, তার চিকিৎসা দেশে নেই। বাংলাদেশে এ-সংক্রান্ত অপারেশনের ঝুঁকি রয়েছে। তারা থাইল্যান্ডে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেন। আগামীর সময়ের প্রতিবেদকের কাছে এমনটাই দাবি খালিদ হোসেনের। খালিদ হোসেন সরকারের অনুমোদন নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। গত বছরের শেষ দিকে এবং চলতি বছরের প্রথম দিকে তিনি থাইল্যান্ডে যান। অপারেশন করান। প্রথমবার সঙ্গে ছিল চিকিৎসকও। পরের দফায় মেয়ে ও তার স্বামী। খালিদ হোসেন জানালেন, তার এখনো সমস্যা হয়। কিন্তু খরচ বেশি বলে যেতে পারছেন না।”
বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়ে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমি খুব সততার সঙ্গে দায়িত্বপালন করেছি। একপর্যায়ে শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়। দেশে চিহ্নিতই করা যাচ্ছিল না। পরে বাধ্য হয়ে যথাযথ প্রক্রিয়ায় সরকারের অনুমোদন নিয়ে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নিয়েছি। সেখানে আমি তিনবার চিকিৎসা নিয়েছি।’
সরকারি কোষাগার থেকে বড় অংকের চিকিৎসা বিল নেওয়া সাবেক উপদেষ্টা খালিদ হোসেন বিদেশে তার চিকিৎসা নেওয়ার যৌক্তিকতা প্রসঙ্গে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার বেহাল অবস্থার বর্ণনা করে বলেন, ‘আমরা কেন এত বছরেও একটি ভালো হাসপাতাল করতে পারলাম না। আমরা মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের মতো হাসপাতাল করতে পারিনি। ব্যাংকে হাজার কোটি টাকা লুট হয়, পাচার হয়। দেশে চিকিৎসা থাকলে এতো খরচ হতো না। চিকিৎসা বাবদ আমার নিজেরও অনেক টাকা খরচ হয়েছে। দেশে চিকিৎসা থাকলে কেউ যাবে? এটা প্রমোদ ভ্রমণ নয়।’
উপদেষ্টা পর্ষদের বৈঠকে স্বাস্থ্য খাত নিয়ে প্রশ্ন কেন তোলেননি এ প্রশ্নে তার উত্তর, ‘উপদেষ্টা বা মন্ত্রীরা ইচ্ছা করলেই অনেক কিছু করতে পারেন না। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রয়েছে। ইচ্ছা থাকলেই এখনে কিছু করা যায় না।’
আপনার মন্তব্য