২০ মে, ২০১৬ ০১:৩২
শিক্ষককে লাঞ্ছিত করে দেশব্যাপী ক্ষোভ আর তোপের মুখে পড়লেও স্বভাবসুলভ উদ্ধতভাব থেকে সরে আসেননি সেলিম ওসমান। প্রভাবশালী মন্ত্রী থেকে শুরু করে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের নিন্দার মুখে পড়েও পিছু হঠেন নি বিতর্কিত এই সংসদ সদস্য। এই ঘটনায় প্রতিবাদকারীদেরও হুমকী প্রদান করেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনেও সেলিম উসমান ছিলেন উদ্ধত। সাফাই গেয়েছেন নিজের কৃতকর্মের। সংবাদ সম্মেলনে লাঞ্ছিত শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে ‘তার-ছেঁড়া’ বলে মন্তব্য করেছেন। তদন্ত কমিটি প্রমাণ না পেলেও সংবাদ সম্মেলনে সেলিম ওসমান ব্যবহার করেছেন 'ধর্ম অবমাননার' বর্ম।
সকল মহল থেকে সেলিম ওসমানের প্রতি ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানালো হলেও 'ক্ষমা চাইবো না' বলে ঘোষণা দিয়েছেন নানা সময়ে সমালোচিত ওসমান পরিবারের এই সদস্য।
তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের হুমকী দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে সেলিম ওসমান বলেন, ‘কেউ কেউ বলেছে আমাকে নাকি গণধোলাই দেবে।’ উপস্থিত নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘আমাকে যখন গণধোলাই দিতে আসবে, তখন কি আপনারা চুড়ি পরে বসে থাকবেন?’ এ সময় হলভর্তি নেতা-কর্মীরা সমস্বরে বলে ওঠেন, ‘না।’
বৃহস্পতিবার সেলিম ওসমানের সংবাদ সম্মেলনের কিছুক্ষণ পূর্বেই শিক্ষামন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, ‘শিক্ষকের মর্যাদাহানি মানে পুরো জাতির মর্যাদাহানি। আমরা শিক্ষকের অমর্যাদা কোনোভাবেই বরদাশত করব না। শিক্ষকের সম্মান নিশ্চিত করতে হবে। কারণ শিক্ষকরাই জাতি গড়ার কারিগর।’ শ্যামল কান্তির বহিস্কারাদেশ অবৈধ জানিয়ে তাকে স্বপদে বহালেরও ঘোষণা দেন শিক্ষমন্ত্রী।
তবে এর একটু পরেই নারায়নগঞ্জে সংবাদ সম্মেলন করে সেলিম ওসমান বলেন, ‘আমি কার কাছে ক্ষমা চাইব? আল্লাহর কটাক্ষকারীর সাজা হয়েছে। আমি যদি মরেও যাই, তা-ও ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।’
তাঁর কৃতকর্মে সারা দেশে নিন্দার ঝড় ওঠলেও সেলিম ওসমান এটিকে আখ্যায়িত করেন ‘বিভ্রান্তিকর খবর প্রচার’ হিসেবে।
ইমানদার মুসলমানেরা শিক্ষকের শাস্তি চেয়েছিলেন দাবি করে তিনি সাংবাদিকদের কাছে জানতে চান, ‘আমরা কি ইবলিশের রাজত্বে বাস করছি? আপনারা জবাব দেন।’
শিক্ষার্থীকে মারধর ও ‘ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তির’ অভিযোগে গত শুক্রবার শ্যামল কান্তিকে স্থানীয় সাংসদের উপস্থিতিতে মারধর ও কানে ধরে ওঠবস করানো হয়। পরে তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ জানান, ‘ধর্মীয় অবমাননার’ অভিযোগের বিষয়ে প্রাথমিকভাবে সত্যতা পায়নি সরকারি তদন্ত কমিটি। বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি অন্যায়ভাবে শ্যামল কান্তিকে সাময়িক বরখাস্ত করেছিল। তাই ওই কমিটি বাতিল করা হয়েছে। আর শ্যামল কান্তিকে তাঁর স্বপদে বহাল রাখা হয়েছে বলে মন্ত্রী জানান।
শিক্ষককে অপমানের ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে শুরু হয় দেশজুড়ে তুমুল সমালোচনা। শিক্ষক ও আইনজীবীরা সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানসহ জড়িতদের ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানান। সমালোচনায় মুখর হন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারাও।
১৪ দলের পক্ষ থেকে বলা হয়, ওই কাজ করে সেলিম ওসমান সাংসদ পদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেছেন। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে কান নিজের কান ধরার ছবি দিয়ে শুরু হয় অভিনব প্রতিবাদ ‘স্যরি স্যার’।
ওই ঘটনায় সাংসদ সেলিম ওসমানসহ যাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে, তাদের বিরুদ্ধে কেন আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে না- তা জানতে চেয়ে বুধবার হাই কোর্ট একটি রুলও জারি করে।
এদিকে দেশজুড়ে প্রতিবাদ ও দোষীদের বিচার দাবির মধ্যেই মঙ্গলবার সেই শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করে স্কুল কর্তৃপক্ষ। এর দুই দিনের মাথায় শিক্ষামন্ত্রী স্কুলের পরিচালনা পর্ষদ বাতিলের সিদ্ধান্ত জানিয়ে প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে বরখাস্তের আদেশও অবৈধ ঘোষণা করেন।
ঢাকায় শিক্ষামন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনের ঘণ্টাখানেকের মধ্যে নারায়ণগঞ্জ ক্লাব কমিউনিটি সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে আসেন জাতীয় পার্টির টিকেটে নারায়ণগঞ্জ-৫ (শহর-বন্দর) আসনের এমপি হওয়া প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের সদস্য সেলিম ওসমান।
২০১৪ সালের এপ্রিলে নাসিম ওসমানের মৃত্যুর পর তার ভাই সেলিম নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে জাতীয় পার্টি থেকে এমপি নির্বাচিত হন। তিনি নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কর্মাস অ্যান্ড ইন্ড্রাস্ট্রিজেরও সভাপতি।
আপনার মন্তব্য