২০ মে, ২০১৬ ২১:৩৬
ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু সমুদ্র উপকূলের আরও কাছাকাছি এসেছে। ঝড়টি উপকূলের সন্নিকটে চলে আসায় কক্সবাজার ছাড়া সব সমুদ্র বন্দরে ৭ নম্বর বিপদ সংকেত দেখাতে বলেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
শুক্রবার সন্ধ্যায় আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষ বুলেটিনে (নং-১৩) বলা হয়েছে, ঘূর্ণিঝড় ‘রোয়ানু’ মংলা সমুদ্র বন্দর থেকে ৬৭৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে।
শনিবার বিকাল বা সন্ধ্যা নাগাদ বরিশাল-চট্টগাম উপকূল অতিক্রম করতে পারে ‘রোয়ানু’।
রোয়ানু উপকূলের দিকে অগ্রসর হওয়ায় চট্টগ্রামের বাঁশখালী-আনোয়ারাসহ উপকূলবাসীদের আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
শুক্রবার চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে ৭ নম্বর বিপদ সংকেত জারির পর উপকূলবাসীদের সরিয়ে নেওয়া শুরু হয়। জেলা পর্যায়ে একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলার পাশাপাশি সকল উপজেলায় খোলা হয়েছে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ।
পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরের বর্হিনোঙ্গরে সব ধরণের পণ্য উঠানামা বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
এদিকে পরবর্তী আদেশ না দেয়া পর্যন্ত চট্টগ্রামের সকল সরকারি ও আধা-সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সবরকম ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
সাগরে থাকা অধিকাংশ মাছ ধরার নৌযানগুলো উপকূলে ফিরেছে। যেকোন পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুত রয়েছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনও।
শুক্রবার চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘উপকূলীয় এলাকায় মাইকিং করা হচ্ছে। আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় আছি। ঘূর্ণিঝড়টি বাঁশখালী-আনোয়ারা উপকূল দিয়ে আঘাত হানার সম্ভাবনা আছে। তাই সেখানকার বাসিন্দাদের সতর্ক করা হয়েছে। এই দুই উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তারা পুরো বিষয়টি তদারকি করছেন। প্রস্তুত রাখা হয়েছে উপজেলাগুলোর সকল স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও আশ্রয় কেন্দ্রগুলোকে।’
নগরীতে ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু আঘাত হানার সম্ভাবনা নেই জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘নগরীতে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বৃষ্টি হতে পারে। তবে ঘূর্ণিঝড়টি আঘাত হানার তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই। এজন্য বাঁশখালী-আনোয়ারাকে ঘিরেই দুর্যোগ মোকাবেলার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি।’
জেলা প্রশাসক জানান, জেলা নিয়ন্ত্রণ কক্ষের নম্বর হচ্ছে ৬১১৫৪৫। বাংলাদেশ বেতারে সতর্কতা সংকেত বারবার ঘোষণা করা হচ্ছে। সরকারি-বেসরকারিভাবে স্বেচ্ছাসেবকরা ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী উদ্ধার কাজের জন্য চট্টগ্রামের উপকূলীয় উপজেলাগুলোতে অবস্থান করছে। জেলা প্রশাসনের ভাণ্ডারে পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুদ রয়েছে। এছাড়া উপজেলা শুকনো খাবার পাঠানো হচ্ছে।
বাঁশখালীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ শামসুজ্জামান বলেন, ‘জেলা প্রশাসনের নির্দেশ পেয়েই আমাদের ১৪টি ইউনিয়নের বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করেছি। শুকনো খাবারসহ সব ধরনের ত্রাণ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রতিটি এলাকায় মাইকিং করা হচ্ছে। প্রতিটি গ্রামেই আমাদের প্রতিনিধিরা পৌঁছেছেন। আমরা সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় আছি।’
চট্টগ্রাম বন্দরের সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) জাফর আলম বলেন, ‘বন্দরে জরুরি সভায় ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু মোকাবেলায় কর্ণফুলী নদীর মোহনায় অবস্থানরত সকল লাইটারেজ জাহাজকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করতে বলা হয়েছে। এছাড়া বন্দরে অবস্থানরত সকল পণ্যবাহী জাহাজকে দুই ঘণ্টার নোটিশে বঙ্গোপসাগরের বর্হিনোঙ্গরে নোঙ্গর করতে বলা হয়েছে। বন্দরের বর্হিনোঙ্গরে সকল ধরনের পণ্য উঠানামা পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। বন্দরের সব যন্ত্রপাতি সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।’
এদিকে শুক্রবার বিকেলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ পূর্বে জারি করা এলার্ট-টু নামিয়ে এলার্ট-থ্রি জারি করেছে।
বন্দর সূত্র জানায়, এলার্ট-থ্রি হল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সতর্কতা ধাপ। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ৫, ৬ অথবা ৭ নম্বর বিপদ সংকেত জারি করা হলে বন্দরে এলার্ট-থ্রি জারি করা হয়।
ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে বলে জানান ফায়ার সার্ভিস, আনসার ভিডিপি, রেড ক্রিসেন্ট, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, বিদ্যুৎ, পরিবেশ অধিদপ্তর, মৎস্য অধিদপ্তরসহ সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন প্রস্তুত রেখেছে ৫০০ উদ্ধারকর্মী। প্রস্তুত রাখা হয়েছে অ্যাম্বুলেন্স, ট্রাক, বাসসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম। চসিক মেয়র আ জ ম নাসির উদ্দিন নগরীর সমুদ্র তীরবর্তী এলাকাগুলো পরিদর্শন করেছেন বলে জানান চসিকের জনসংযোগ কর্মকর্তা আবদুর রহিম।
এছাড়া তাৎক্ষণিক সেবা নিশ্চিতে নগরীর ওয়াসা মোড়ে খোলা হয়েছে চসিকের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ। নিয়ন্ত্রণ কক্ষের ফোন নম্বর ৬৩০৭৩৯ ও ৬৩৩৪৩৯।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসে দায়িত্বরত মাহমুদুল ইসলাম বলেন, ‘রোয়ানু চট্টগ্রামের দিকেই বেশি ঝুঁকে রয়েছে। তাই চট্টগ্রামে ৭ নম্বর বিপদ সংকেত জারি করা হয়েছে। এটা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে চট্টগ্রামে হালকা বৃষ্টিপাত হচ্ছে। দুপুর ৩টা পর্যন্ত চট্টগ্রামে ২৮ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সাগর উত্তাল রয়েছে।’
ঘূর্ণিঝড়টি আরও উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে শনিবার সন্ধ্যা নাগাদ চট্টগ্রাম-নোয়াখালী অঞ্চলের ওপর দিয়ে উপকূল অতিক্রম করতে পারে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা।
গভীর সাগরে থাকা অধিকাংশ মাছ ধরার নৌযানগুলো উপকূলের কাছাকাছি ফিরেছে বলে জানায় চট্টগ্রামের ফিশিং ট্রলারের মালিকরা।
শুক্রবার দুপুরে আবহাওয়া অধিদফতরে বিশেষ বুলেটিনে বলা হয়েছে, ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর প্রভাবে চট্টগ্রাম ৭, কক্সবাজারে ৬, মংলা এবং পায়রা সমুদ্রবন্দরে ৫ নম্বর বিপদ সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
আপনার মন্তব্য