০৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ১৫:০০
সেনাবাহিনীতে চাকরি সূত্রে সিলেটে বসবাসকালীন সিলেটের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াত করতেন রূপনগরে পুলিশি অভিযানে নিহত জঙ্গি জাহিদুল ইসলাম। সেখানকার কয়েকজন শিক্ষককের সাথে ঘনিষ্ঠতা ছিল তার। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলছে এই সময়কালেই জাহিদ উগ্রবাদে জড়িয়েছেন। গোয়েন্দারা এসব বিষয় নজরদারিতে রেখেছেন তবে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
জাহিদের শ্বশুর মো. মমিনুল হকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জাহিদ ২০১৪ সালের জুন মাসে একটি প্রশিক্ষণে ছয় মাসের জন্য কানাডায় যান। এরপর দেশে ফিরে সিলেটের জালালাবাদ সেনানিবাসে যোগদান করেন। তখন তিনি সেনাবাহিনীর রেশন নেওয়া বন্ধ করে দেন। এক পর্যায়ে ২০১৫ সালের জুলাইয়ে সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসরে যান তিনি। এরপর লেকহেড গ্রামার স্কুলে লক্ষাধীক টাকা বেতনে প্রসাশনিক কর্মকর্তা হিসেবে তিন মাস চাকরি করেন।
গুলশান হামলায় অংশ নিয়ে জঙ্গিদের প্রশিক্ষণদাতা জাহিদের নাম উঠে এসেছে। যিনি জাহাঙ্গীর আলম মুরাদ নাম ব্যবহার করতেন। নারায়ণগঞ্জের অভিযানে প্রাপ্ত একটি ডায়েরির সূত্র ধরেই রূপনগরে জঙ্গি জাহিদের আস্তানার সন্ধান পান গোয়েন্দারা। ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিসান রেস্তোরাঁয় হামলার পর থেকেই গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য ছিল, হামলাকারীদের প্রশিক্ষণ, অর্থ সরবরাহ করেছিল 'জাহাঙ্গীর আলম মুরাদ' নামে এক ব্যক্তি। তার বয়স ৩৫-৪০-এর মধ্যে। জঙ্গিদের কাছে সে 'মেজর' হিসেবে পরিচয় দিলেও গোয়েন্দারা তার পরিচয় নিশ্চিত হতে পারছিলেন না।
অনেকের ধারণা ছিল, হয়তো সে 'সুবেদার মেজর' পদবির সাবেক কোনো সেনাসদস্য হতে পারে। কারও ধারণা ছিল, সে সাবেক সৈনিক হতে পারে। এমনকি কল্যাণপুরে অভিযানের পর ওই আস্তানা থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টাকালে গ্রেফতার রাকিবুল হাসান রিগানও গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, জাহাঙ্গীর আলম মুরাদ নামে তাদের একজন 'বড় ভাই' রয়েছে। এর পর থেকেই মূলত 'রহস্যজনক' সেই 'বড় ভাই' মুরাদের পরিচয় নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা যায় ,গুলশানের হামলার সূত্র ধরে পুলিশ রাজধানীর কল্যাণপুরে একটি জঙ্গি আস্তানার খোঁজ পায়। সেখান পাওয়া কিছু আলামত থেকে দেখা যায়, গুলশানে হামলায় নিহত সব জঙ্গি ও জাহিদুল কিছুদিন একত্রে ওই বাসায় অবস্থান করছিল। গুলশানে হামলায় নিহতদের মধ্যে নিবরাসের সঙ্গে জাহিদুলের ভালো সম্পর্ক ছিল।
জাহিদের পৈতিক নিবাস সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে। পুলিশ বলছে, সেনাবাহিনীর সাবেক এই কর্মকর্তা ‘নব্য জেএমবি’র শীর্ষ নেতা তামিম চৌধুরীর ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ ছিলেন। তিনি এই জঙ্গি গোষ্ঠীর সামরিক কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। তামিম চৌধুরীর বাড়িও সিলেটের বিয়ানীবাজারে।
জানা যায়, সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা জাহিদ যিনি দুই বছর আগে কানাডা থেকে ফেরার পর চাকরি ছেড়ে দেন। বর্তমানে তার বাবা পুলিশের সাবেক পরিদর্শক নুরুল ইসলাম পরিবার নিয়ে কুমিল্লা সদরের পাঁচথুবীর পশ্চিম চাঁন্দপুর প্রাইমারি স্কুল রোডে থাকেন।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার আবিদ হোসেন জানান, জাহিদের বাবা নুরুল ইসলাম ১৯৮৫ সালে কুমিল্লায় বাড়ি করলেও তাদের আদি নিবাস সিলেট।
তিনি বলছেন, জাহিদুল সর্বশেষ প্রায় সাত মাস আগে কুমিল্লার বাড়িতে এসেছিলেন।
রূপনগরের আস্তানায় যারা যাতায়াত করত: পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, রূপনগরে জাহিদুলের বাসায় বিভিন্ন সময় যাতায়াত করত তার সহযোগী মানিক, ইকবাল, আকাশ, সাগরসহ অজ্ঞাত আরও পাঁচ-ছয়জন। সেখানে জেএমবি ও অন্যান্য উগ্রপন্থি সংগঠনের সহায়তায় জঙ্গিদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়া হয়। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, এবিটির মেজর জিয়া সংগঠনে সাগর নামে পরিচিত।
স্ত্রী নিখোঁজ:
গতকাল পর্যন্ত নিহত মেজর (অব.) জাহিদের স্ত্রী জেবুন্নাহার ইসলামের খোঁজ পায়নি পুলিশ ও পরিবার। রোববার রাতে জেবুন্নাহারের বাবা মমিনুল হক, মা জোহরা আক্তার ও ভাই শহীদুল হকের সঙ্গে কথা বলে পুলিশ।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, কুমিল্লার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মমিনুল হক খুব আফসোস করছিলেন। তিনি বলেন, তাঁর মেয়েজামাই জাহিদ মেধাবী কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি জাহিদের চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি। চাকরি না ছাড়ার জন্য অনুরোধ করেছিলেন মমিনুল হক। কিন্তু জাহিদ কিছু অজুহাত দেখিয়ে অনুরোধ শোনেননি।
মামলা:
মিরপুরের রূপনগরে পুলিশি অভিযানে জঙ্গি মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম নিহত হওয়া এবং তিন পুলিশ সদস্য আহত হওয়ার ঘটনায় রূপনগর থানায় মামলা হয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে পুলিশের করা মামলায় মানিক, ইকবাল, আকাশ, সাগরসহ অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। তাঁরা সবাই মিরপুরের রূপনগরে জাহিদের ভাড়া করা ওই বাসায় যাতায়াত করতেন বলে এজাহারে বলা হয়। ওই বাসা থেকে পিস্তল, চাকু, চাপাতি, গুলির খোসা, চাপাতি-চাকু ধার দেওয়ার রড এবং ৩১টি ধর্মীয় পুস্তিকা জব্দ করা হয়েছে।
সূত্র: দৈনিক সমকাল
আপনার মন্তব্য