০৯ আগস্ট, ২০২৬ ২০:৪৪
সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় ও আলাদা ভূমি কমিশন গঠন, খাসি, গারো, ত্রিপুরাসহ বাংলাদেশে বসবাসকারী বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও চা-বাগানের শ্রমিকদের ভূমির অধিকার নিশ্চিত করা এবং আদিবাসীদের সাংবিধানিকভাবে ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন আদিবাসী নেতারা।
"আদিবাসী জীবন ও ঐগিহ্যগত জ্ঞান সুরক্ষায় এগিয়ে আসুন” এ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে রোববার (৯ আগস্ট) দুপুর ১২টার দিকে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল জেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে ‘বিশ্ব আদিবাসী দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে দিনব্যাপী আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতে ফিতা কেটে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন আগত অতিথিরা। এ সময় জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানা রঙের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরা বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণী ও শিশু-কিশোররা জেলা পরিষদ মঅডিটোরিয়ামে সমবেত হন। তাঁরা সবাই বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করেন।
পরে বিভিন্ন দাবি সংবলিত ফেস্টুন নিয়ে শহরে একটি শোভাযাত্রা বের করা হয়। এতে আদিবাসী সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দসহ নারী-পুরুষ ও তরুণ-তরুণীরা অংশ নেন। শোভাযাত্রাটি ভানুগাছ সড়ক, স্টেশন সড়ক, চৌমুহনী চত্বর, কলেজ রোড ও গুহ রোড প্রদক্ষিণ করে জেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে এসে শেষ হয়।
এরপর জেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন আদিবাসী সাংস্কৃতিক কমিটি, বৃহত্তর সিলেট বিভাগের সভাপতি পংকজ এ কন্দ। উদ্বোধনী বক্তব্য দেন আদিবাসী সাংস্কৃতিক কমিটি, বৃহত্তর সিলেট বিভাগের সাধারণ সম্পাদক জনক দেববর্মা।
সভায় বক্তব্য রাখেন, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য নেরলা তেনসং, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক বিজয় হাজরা, ত্রিপুরা স্টুডেন্ট ফোরামের সাবেক সভাপতি যুবরাজ দেববর্মা, নিরালা পুঞ্জির মান্ত্রী এলভিস পতাম, কথা সাহিত্যিক ও লেখক আকমল হোসেন নিপু, আদিবাসী সাংস্কৃতিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক জনক দেববর্মা, লাউয়াছড়া খাসিয়া পুঞ্জির মান্ত্রী ফিলা পতমী, বাংলাদেশ আদিবাসী লেখক পরিষদের সভাপতি সনাতন হামোম, শ্রী চুক গারো যুব সংগঠনের সভাপতি পার্থ হাজং, আদিবাসী সাংস্কৃতিক কমিটির সাধারন সম্পাদক জনক দেববর্মা ও পাত্রখোলা চা-বাগানের সভাপতি স্বপন কুর্মী প্রমুখ।
আলোচনা সভায় বক্তারা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও ঐতিহ্যগত জ্ঞান সংরক্ষণে সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার, শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান তাঁরা।
বক্তারা জাতিসংঘের ২০০৭ সালের আদিবাসী বিষয়ক ঘোষণাপত্র বাস্তবায়ন এবং আইএলও কনভেনশন-১৬৯ অনুসমর্থন ও কনভেনশন-১০৭ বাস্তবায়নের দাবি জানান। বক্তারা বলেন, “সরকার আমাদের ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। আবার অবলিক দিয়ে বলছে ‘উপজাতি’, অবলিক দিয়ে আরও যোগ করছে। এখন ভাই, একজন মানুষের নাম কয়টা পরিচয় হতে পারে? নিজের পরিচয় দেওয়ার অধিকার বাংলাদেশ সংবিধান বলছে, এটা একান্তই ব্যক্তিগত অধিকার, নিজের অধিকার। আমি কে, সেটা পরিচয় দেওয়ার অধিকার আমারই। আমরা আশা করি, মর্যাদাপূর্ণ ও সম্মানপূর্বক যাতে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। আমরা সেইটার জন্য বলছি, আদিবাসীদের সাংবিধানিকভাবে ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি চাই।”
সভাপতির বক্তব্যে পংকজ এ কন্দ বলেন, “আমরা আজকে এসেছি মৌলভীবাজার জেলার যে ২৯টি জনগোষ্ঠী স্বীকৃত, ৫০টি জনগোষ্ঠীর মধ্যে আমরা ২৯টি জনগোষ্ঠী এখানে আছি। ২৯টি ব্যতীত যারা স্বীকৃতি পায়নি, স্বীকৃতির দাবিদার যারা, চা জনগোষ্ঠীর মধ্যে যারা আছেন, তাঁরাও এখানে দাবি করার জন্য উপস্থিত হয়েছেন আদিবাসী দিবস পালন করতে। জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত আদিবাসী দিবসে আমাদের দাবি, বাংলাদেশ সরকারের কাছে সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন করা হোক। সমতলের আদিবাসীদের জন্য আলাদা ভূমি কমিশন করা হোক। পাশাপাশি আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হোক, আমরা সেটাই প্রত্যাশা করছি।”
পরে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি তুলে ধরে ২০টি বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক দলের অংশগ্রহণে ঐতিহ্যবাহী নৃত্য পরিবেশন করা হয়। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর শিল্পীরা তাঁদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবাহী নৃত্য পরিবেশন করেন।
আপনার মন্তব্য