০৭ ডিসেম্বর, ২০১৬ ২০:০৫
নিজ শহর ময়মনসিংহের ভাটিকাশর কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী কবি মাহবুবুল হক শাকিল। বুধবার বিকালে কাচিঝুলি আঞ্জুমান ঈদগাহ্ মাঠে দ্বিতীয় নামাজে জানাযার পর তার দাফন সম্পন্ন হয়।
এরআগে সকাল ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে মাহবুবুল হক শাকিলের প্রথম নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়।
এদিকে, প্রগতিশীল রাজনীতিবদ ও কবি মাহবুবুল আলম শাকিলকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তাঁর ঘনিষ্টজনেরা।
সাংবাদিক জ. ই মামুন ফেসবুকে লিখেছেন-
মাহবুবুল হক শাকিল কত গুণীজনকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে যে ফুলের তোড়া হাতে শহীদ মিনারে গেছেন! আশা করেছিলাম আজ তাঁকেও শহীদ মিনারে নেয়া হবে শেষ শ্রদ্ধা- ভালোবাসা জানানোর জন্য। হলো না।
আশা করেছিলাম, ব্রক্ষ্মপুত্রের তীরে তাঁর শেষ যাত্রায় তিনি হেলিকপ্টার পাবেন। পেলেন না।
সরকারের নিউক্লিয়াসের ভেতরে থেকেও তিনি যে নির্মোহ, নির্লোভ আর সাদামাটা জীবন যাপন করে গেছেন, মরণেও তিনি সেই সাদামাটাই থাকলেন। কিন্তু কাল দুপুরে মৃত্যুর খবর ছড়ানোর পর থেকে আজকের জানাজা এবং শেষ যাত্রায় যত মানুষ দেখলাম, তাঁর জন্য মানুষের ভালোবাসার যে প্লাবন দেখলাম, তাতে শাকিলকে ঈর্ষা করতে ইচ্ছা করে!
আমরা শাকিলকে আজীবন ঈর্ষা করে গেলেও কখনো শাকিলের মতো হতে পারবো না। না পারবো তাঁর মতো জীবনকে ভালোবাসতে, না পারবো জীবনের কাছে অমন অকপট হতে, না পারবো জীবনকে দুই হাতে পিংপং বলের মতো নিয়ে খেলতে, না পারবো জীবনের মোহ ছেড়ে রুধিরাক্ত মরণ খেলায় মেতে উঠতে!
মৃত্যুর ভেতর দিয়ে নিজেকে আরো বেশি ঈর্ষণীয় করে গেলেন শাকিল। হে বন্ধু, অনন্ত ভালোবাসা তোমার জন্য।
ক্রীড়া সাংবাদিক নাজমুল হক তপন ফেসবুকে লিখেছেন-
আমরা কতটা অসহায় টের পাচ্ছেন শাকিল ভাই!!!!!
সকাল ১১টায় শাকিল ভাইয়ের জানাযায় অংশ নিয়েছি। হাজারও মানুষ। অনেককেই বলতে শুনলাম... শাকিল ভাইয়ের কফিন কি শহীদ মিনারে নেয়া হবে না?
কেউ উত্তর দিতে পারল না।
না, শহীদ মিনারে নেয়া হয়নি শাকিল ভাইকে। বন্ধু প্রতিম ছোট ভাই সুমন জাহিদ খুব আক্ষেপ নিয়ে জানাল....শেষবারের মত কতজনকেই না শাকিল ভাই শহীদ মিনারে নিয়ে গেছেন নিজের উদ্যোগে।
...আজ যদি আপনার পরিণতি আমার হত। আমি অতি সাধারণ, দীনহীন মানুষ। কিন্তু আমি জানি,শাকিল ভাই থাকলে আমাকেও শেষবারের মত নেয়া হত শহীদ মিনারে! রাজনৈতিক দর্শনের ভিন্নতা আপনি মনেও রাখতেন না। আমরা কতটা অসহায় অনুভব করতে পারছেন , শাকিল ভাই।
মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর একটি রেস্টুরেন্টে মাহবুবুল হক শাকিলকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তার বয়স হয়েছিল ৪৮। তিনি স্ত্রী, এক কন্যা, মা-বাবা এবং এক ভাই ছাড়াও রাজনৈতিক অঙ্গনে অনেক অনুসারী এবং সাহিত্য ও সংস্কৃতির অঙ্গনে অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
ওইদিন রাজধানীর বারডেম হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয় তার মরদেহ। বুধবার সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়।
ময়নাতদন্তের পর চিকিৎসক জানিয়েছেন, শরীরে আঘাতের চিহ্ন নেই। হৃদপিণ্ড স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বড়। মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে ভিসেরা সংরক্ষণ করা হয়েছে। ভিসেরা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে সিআইডির রাসায়নিক ল্যাবে।
ছাত্রলীগের সাবেক নেতা শাকিলের মৃত্যুর কারণ জানতে কয়েকদিন সময় লাগবে জানান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের সহকারি অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ।
শাকিল এক সময় ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও পরে সিনিয়র সহ-সভাপতি ছিলেন। স্কুল জীবনেই ছাত্ররাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি।
নব্বই’র ছাত্রগণঅভ্যুত্থান ও পরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গড়ে উঠা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন শাকিল।
শাকিলের স্ত্রী একজন আইনজীবী। তাদের একমাত্র মেয়ে আগামী বছর এসএসসি পরীক্ষা দেবে।
নিজ দলের বাইরে অন্য দলের নেতা-কর্মীদের কাছেও তিনি সজ্জন হিসেবে পরিচিত ছিলেন। দেশের শিল্প-সংস্কৃতির অঙ্গনেও প্রিয় এক নাম ছিল মাহবুবুল হক শাকিল।
গত বছরের (২০১৫) একুশে বইমেলায় তার প্রথম কবিতার বই ‘খেরোখাতার পাতা থেকে’ প্রকাশিত হয়। আর ২০১৬ বইমেলায় প্রকাশ হয় দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘মন খারাপের গাড়ি’। সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করা শাকিলের সর্বশেষ স্ট্যাটাসটিও একটি কবিতা।
আগামী বইমেলার জন্য তার একাধিক বইয়ের পাণ্ডুলিপি তৈরি হয়ে আছে। এমনকি কবিতার বইটির প্রকাশনা উৎসবের তারিখ ঠিক হয়ে আছে ৬ ফেব্রুয়ারি। তার আগে তার জন্মদিন ২০ ডিসেম্বর।
আপনার মন্তব্য