০৬ ফেব্রুয়ারি , ২০১৭ ০০:৩৫
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, এক নাম এক ইতিহাস। স্বাধীনতার পূর্ব থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করা এক নেতা; আর ছিলেনও আমৃত্যু। কেবল রাজনীতির মাঠেই নয়, ছাত্রাবস্থায় তিনি অভিনয়েও জড়িত ছিলেন বলে জানিয়েছেন তাঁর সাবেক রাজনৈতিক সহকর্মীরা।
একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য পদে ছিলেন। মৃত্যুকালেও ছিলেন জাতীয় সংসদের আইন ও সংসদ বিষয়ক স্থায়ী কমিটির সভাপতি। ছিলেন সাবেক মন্ত্রীও।
বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের জন্ম হয় সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে, ১৯৪৫ সালে। মৃত্যুকালেও প্রতিনিধিত্ব করছিলেন তাঁর এলাকার। ছিলেন সাত-সাতবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য।
তাঁর বয়স ছিল যখন মাত্র ২৫, তখন প্রথমবারের মত নির্বাচিত হন। আর সেটা মুক্তিযুদ্ধের ঠিক আগে সত্তরের নির্বাচনে, যখন আওয়ামী লীগের নৌকার পক্ষে ছিল গণজোয়ার সে সময়ই। কিন্তু তিনি ছিলেন না নৌকার প্রার্থী। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির প্রার্থী হিসেবে কুঁড়েঘর নিয়ে জিতেছিলেন নৌকার বিপক্ষে। এরপর নব্বই-এর দশকের শুরুতে তিনি যোগ দেন আওয়ামী লীগে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা সফলতার আর ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা এ রাজনীতিবিদ সকল মহলের কাছে আলোচিত ছিলেন তাঁর বক্তৃতায় হাস্যরসের কারণে।
"তিনি যখন পার্লামেন্টে বক্তৃতা করতেন, সকল সদস্য সেটা তন্ময় হয়ে শুনতেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের নাম সব সময় লেখা থাকবে। একজন মহান নেতাকে আমরা হারালাম, তার শূন্যতা পূরণ হওয়া অত সহজ নয়", বলছিলেন আওয়ামী লীগের আরেক সিনিয়র নেতা তোফায়েল আহমেদ।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সরাসরি অংশ গ্রহণ করা এই রাজনীতিকের একটি অন্যতম পরিচয় ছিল সংবিধান এবং আইন বিশেষজ্ঞ হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির একজন কনিষ্ঠ সদস্য ছিলেন তিনি। সংবিধানের প্রণেতা হলেও তিনি বায়াত্তরের সংবিধানে সাক্ষর করেন নি সকল জাতির অধিকার সুরক্ষিত হয় নি বলে।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এরপর আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেন সেন্ট্রাল ল কলেজ থেকে।
অভিজ্ঞ এই রাজনীতিবিদ মানুষের মাঝে বেশি পরিচিত ছিলেন সংসদে তাঁর জ্ঞানগর্ভ ও রসাত্মক বক্তব্যের জন্য। রাজনীতিবিদ হিসেবে বিপক্ষের নেতাদেরও সমীহ পেয়েছেন তিনি।
"আমরা একই দলে কখনো কাজ করিনি, কিন্তু আমাদের বন্ধুত্ব থেকে গেছে। সত্যিকার অর্থে রাজনীতিবিদ বলতে যেটা বোঝায়, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সেই রাজনীতিবিদদের মধ্যে অন্যতম। স্বাধীনতার পর থেকে প্রায় প্রতিটি সংসদে তিনি ছিলেন, এটিই প্রমাণ করে যে তিনি একজন জনপ্রিয় একজন জাতীয় নেতা ছিলেন"। সুরঞ্জিতের মৃত্যুর পর প্রতিক্রিয়ায় বলেন মওদুদ আহমেদ।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ষাটের দশকে ছাত্রজীবন থেকেই জড়িত ছিলেন বামপন্থী রাজনীতির সাথে। সে সময় থেকে দীর্ঘদিন একসাথে রাজনীতি করেছেন বামপন্থী নেতা পঙ্কজ ভট্টাচার্য। তিনি বলছিলেন, সে সময় নাট্য-অভিনেতা হিসেবেও খ্যাতি ছিল সেনগুপ্তের।
"হলগুলোর নাটকের প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ নাটকে সুরঞ্জিত অভিনয় করেছিল একাধিকবার। আমরা ঠাট্টা করে বলতাম, অভিনেতা থেকে নেতা হয়ে গেছো তুমি"।
পঙ্কজ ভট্টাচার্য বলছেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষায় সবসময়ই বড় ভূমিকা রেখেছেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন তিনি। পরে ২০১১ সালে রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব পেলেও কয়েক মাসের মাথায় সহকারীর অর্থ কেলেঙ্কারিকে কেন্দ্র করে পদত্যাগপত্র দেন। পরে ছিলেন দপ্তরবিহীন মন্ত্রী হিসেবে।
বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদের মরদেহে ফুল দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং জাতীয় সংসদের স্পিকার। রোববার খুব ভোরে ঢাকার একটি হাসপাতালে ৭১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। বিকেলে সংসদ প্রাঙ্গনে তার মরদেহে শ্রদ্ধা জানান বিভিন্ন দলের রাজনীতিবিদেরা। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে বিএনপি, জাতীয় পার্টি-সহ বৃহৎ সকল রাজনৈতিক দলের নেতারা।
সোমবার সকালে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বর্ষীয়ান এ রাজনীতিবিদকে শেষ শ্রদ্ধা জানাবে সিলেটের সর্বস্তরের মানুষ। এরপর হাওরের নেতা হাওরের উদ্দেশে পাড়ি দেবেন। সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের বিস্তীর্ণ হাওর আপন করে নেবে তার নেতাকে।
আপনার মন্তব্য