২৪ জুন, ২০১৫ ০২:০৩
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র খ্রিস্টিয়ান সায়েন্স মনিটর সম্প্রতি প্রকাশিত এক রিপোর্টে খাদ্য ঘাটতি থেকে খাদ্য উদ্বৃত্ত দেশে পরিণত হওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিশাল সাফল্য তুলে ধরেছে।
বৈশ্বিক ক্ষুধা বিষয়ে সম্প্রতি জাতিসংঘ প্রকাশিত সমীক্ষার ভিত্তিতে প্রণীত ‘ফ্রম ফ্যামিন টু ফুড বাস্কেট : হাউ বাংলাদেশ বিকেইম এ মডেল ফর রিডিউসিং হাঙ্গার’ শিরোনামে রিপোর্টে বলা হয়েছে, ৪ দশক আগে দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ ছিলো চরম দারিদ্র্য কবলিত এবং ক্ষুধা ও বন্যার দেশ। যেখানে খাদ্য সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছিলো।
কৃষক ও কৃষি জমি ছিলো বন্যার পানিতে বিপর্যস্ত। সে সময় আমদানি করা খাদ্যের সরবরাহের ওপর নির্ভর করতে হতো। সঙ্গীত শিল্পী জর্জ হ্যারিসন ১৯৭১ সালে কনসার্ট করে ক্ষুধা ও অপুষ্টি থেকে বাঁচাতে সহযোগিতা দেয়ার জন্য তহবিল সংগ্রহ করেছিলেন। একদা খাদ্যবিহীন ঝুড়ির দেশ আজ খাদ্য ভরতি ঝুড়িতে পরিণত হয়েছে এবং অপরাপর বিশ্বের জন্য ক্ষুধা হ্রাসের ক্ষেত্রে একটি মডেলে পরিণত হয়েছে।
বৈশ্বিক ক্ষুধা সংক্রান্ত জাতিসংঘের সাম্প্রতিক রিপোর্টে ২০০০ সাল থেকে ক্ষুধার হার অর্ধেকের বেশি কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্যের কথা তুলে ধরেছে। রিপোর্টে বলা হয়, ১৯৯০ সালে বিশ্বব্যাপী ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা একশ’ কোটি থেকে কমে ৭৯ কোটি ৫০ লাখে দাঁড়িয়েছে। ২০৩০ সাল নাগাদ ক্ষুধা নিরসনের বৈশ্বিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ অন্যতম এক উজ্জ্বল অবস্থানে রয়েছে।
নিউইয়র্কের কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল এ্যান্ড পাবলিক এফেয়ার্স এবং উন্নয়ন ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞ গ্লিন ডেননিং বলেন, গত ১০-১৫ বছরে তিনটি সাফল্য অর্জনকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। অপর দুটি দেশ হলো- ইথিওপিয়া ও নেপাল। ওই দুটি দেশের সাফল্য ক্ষুধা নিরসনের নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে আমাদের আশার সঞ্চার করেছে।’
তিনি বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কৃষি উৎপাদনে উন্নয়ন, কৃষকদের প্রতি গুরুত্ব প্রদান, বাজার সুবিধা প্রদান এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা লোকদের সামাজিক বেষ্টনীর মধ্যে আনা হলে ক্ষুধা কমিয়ে আনা সম্ভব।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কৃষি উৎপাদনে এই বিপ্লবের সূচনা হয় ১৯৮০’র দশকে যা দেশকে খাদ্য আমদানি নির্ভরতা থেকে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকে নিয়ে যায়।
ক্ষুদ্র কৃষি খামার পদ্ধতি, সেচ এবং বিশেষ করে অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ জোরদারের পাশাপাশি মেয়েদের শিক্ষায় সমন্বিতভাবে ক্ষুধার্ত দেশের পুরনো পরিচিতি থেকে বাংলাদেশকে মুক্তি দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক খাদ্য নীতি গবেষণা ইনস্টিটিউটের কৌশলগত সহায়তা বিষয়ক প্রধান আখতার আহমেদ বলেন, দারিদ্র্য ও ক্ষুধা হ্রাসের তিনটি বিষয়ে আমি উল্লেখ করবো। এগুলো এখন বাংলাদেশে ঘটছে।
তিনি নিয়মিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মানব উন্নয়নের বিষয় উল্লেখ করেন। তিনি এগুলোকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি এবং ‘নিরাপত্তা বলয়’ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে চিহ্নিত করেন। এগুলো জরুরি বলে চিহ্নিত প্রবৃদ্ধি প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে অক্ষম জনগণের একাংশের কাছে নগদ অর্থ ও অন্যান্য সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছে যা দারিদ্র্য ও ক্ষুধার হার হ্রাস করতে একযোগে কাজ করছে।
ড. আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর কাছে মডেল হিসেবে কাজ করতে পারে বলে আমার বিশ্বাস।
তিনি বলেন, উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার বজায় থাকা সত্ত্বেও প্রতিবেশী ভারতে এ ক্ষেত্রে সাফল্যের হার কম। তারা ক্ষুধা হ্রাসের ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। জাতিসংঘের রিপোর্টে ক্ষুধিত মানুষের সংখ্যার ভিত্তিতে ভারতের নাম শীর্ষে স্থান দিয়েছে। সেখানে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা ১৯৫ মিলিয়ন যা বিশ্বের ৭৯৫ মিলিয়ন মোট ক্ষুধার্ত মানুষের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। আরেকটি বড় প্রতিবেশী দেশ চীনে ক্ষুধার্তের সংখ্য প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ।
আহমেদ আরো উল্লেখ করেন, পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা লাভের চার দশকের মধ্যে বাংলাদেশে ব্যাপক সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ঘটেছে। যেমন- অর্থনীতির ক্ষেত্রে নারীদের বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি সংস্থাগুলোর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। এ বিষয়গুলো বাংলাদেশে ক্ষুধা হ্রাসের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে চিহ্নিত।
বাংলাদেশে সৃষ্ট ক্ষুদ্র ঋণ কর্মসূচি বিশ্বে একটি আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। ক্ষুদ্র ঋণ ছোট ব্যবসা সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক পরিবর্তন সঞ্চার করেছে।
‘শিক্ষার জন্য খাদ্য’ কর্মসূচির সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
১৯৯০ দশকে নগদ অর্থ বা খাদ্য প্রদান ধারণা চালু করে যাতে পরিবারগুলো তাদের বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাতে সম্মত হয়। এখন এই ধারণা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে গেছে।
জাতিসংঘের হাঙ্গার রিপোর্ট উদ্ধৃত করে বলা হয়, ব্রাজিল, মেক্সিকো, হন্ডুরাস এবং লাতিন আমেরিকায় সামাজিক নিরাপত্তা-বেষ্টনী কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষুধা হ্রাসে সাফল্য এসেছে।
এ ছাড়াও আখতার আহমেদ ২০০৭-০৮ সালে বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকটের কথা উল্লেখ করে বলেন, সে সময় বিশ্বব্যাপী খাদ্যের দাম বেড়ে গেলে হঠাৎ ভারত বাংলাদেশে খাদ্য রপ্তানি স্থগিত করে দিয়েছিল।
বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার লক্ষ্য অর্জনের জন্য সকল প্রয়াস দ্বিগুণ এবং নতুন নতুন ধারণা বাস্তবায়ন করা হয়।
আখতার আহমেদ এশিয়া ও আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এ ক্ষেত্রে কাজ করেছেন। তিনি বলেন, সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে সংস্কার সাধন ও নতুন নতুন ধারণা বাস্তবায়নে বাংলাদেশের সরকারগুলো যেসব প্রয়াস চালিয়েছে আমি অন্য কোথাও তা দেখিনি। - বাসস।
আপনার মন্তব্য