সিলেটটুডে ডেস্ক

২৬ জুন, ২০১৫ ২৩:০২

‘পানি চাইলে প্রস্রাব খেতে বলে বিজিপি’: রাজ্জাকের সঙ্গী লালমোহনের লোমহর্ষক বর্ণনা

বিজিবির নায়েক রাজ্জাককে অপহরণের সময় জেলে লালমোহন ও জীবনকেও ধরে নিয়ে যায় বিজিপি। পরে ওরা দুজন পালিয়ে আসে।

ভোরবেলা। নৌকায় করে নাফ নদীতে মাছ শিকারে ব্যস্ত লালমোহন। সঙ্গে ছোট ভাগ্নে জীবন। রাত জাগায় ঘুমিয়ে পড়েছে কিশোরটি। হঠাৎ গুলির শব্দ। বিজিবির এক জওয়ান গুলি খেয়ে পড়ে গেলেন পানিতে। বিজিবির একজনকে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষীরা তুলে নিল তাদের ট্রলারে। তুলে নেয় লালমোহন ও তাঁর ভাগ্নেকেও।

ট্রলারে তুলেই শুরু হয় নির্যাতন। বিজিবি নায়েক রাজ্জাকের প্যান্ট খুলে নেওয়া হয়। মংডুতে নিয়ে একটি ক্যাম্পে উলঙ্গ করে রাখা হয়। সহ্য করতে না পেরে লালমোহন নিজের লুঙ্গি দিয়ে রাজ্জাকের লজ্জা ঢাকেন। স্বদেশীর প্রতি সহমর্মিতা দেখে রাজ্জাকের কাছ থেকে লালমোহনদের সরিয়ে ফেলা হয়।

গত ১৭ জুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) নায়েক রাজ্জাককে অপহরণ এবং মিয়ানমারে নিয়ে নির্যাতনের এমন বর্ণনা দিলেন বাংলাদেশি জেলে লালমোহন দাশ (২৮)। রাজ্জাকের সঙ্গে লালমোহন ও তাঁর ভাগ্নে জীবনকেও অপহরণ করেছিল মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী পুলিশ (বিজিপি)। তাঁদের তুলে নেওয়া হয়েছিল বিজিপির ট্রলারে। এরপর নাফ নদীর ওপারে মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের মংডুর রইঙ্গাধং নামের বিজিপি ক্যাম্পে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয়।

আক্ষেপ করে সহজ-সরল জেলে লালমোহন দাশ বলেন, 'আদব-কায়দা বলে একটা কথা তো আছে। সেটাই দেখলাম না মিয়ানমারের আরাকানে বিজিপির কাছে। আমি পিপাসায় ছটফট করছিলাম। তাই বার কয়েক পানি চেয়েছিলাম ওদের কাছে। ওরা বলে কী- ওই ব্যাটা প্রস্রাব করবি, আর খাবি। বলুন, এটা কোনো আদব-কায়দার কথা?'

এসব কথা বলেন, কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের নাটমুরা জলদাশ পাড়ার জেলে লালমোহন দাশ।

লালমোহন জানান, নাফ নদীতে রাতভর মাছ ধরে ক্লান্ত তাঁরা। রাত জাগায় ভীষণ ক্ষুধার্ত ছিলেন তাঁরা। পিপাসায় যেন মরণ দশা। লালমোহন বলেন, 'এ জন্যই ট্রলারে ওঠানোর পর বিজিপি ভাইদের কাছে আকুতি জানাই পানির জন্য। আরে পানি না দিলে না দিবি কিন্তু নিজের প্রস্রাব নিজেকেই পান করতে বলবি?' লালমোহন লেখাপড়া জানেন না। তিনি কিছুতেই ভুলতে পারছেন না মিয়ানমারের বিজিপির এমন অমানুষিক আচরণ।

সেদিনের ঘটনা প্রসঙ্গে জেলে লালমোহন বলেন, তিনি বাংলাদেশের জলসীমায় মাছ ধরছিলেন। সঙ্গে ১২ বছরের ভাগ্নে জীবন। সে হ্নীলা আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র। তার সঙ্গে শখ করেই মাছ ধরতে গিয়েছিল। ছোট নৌকাটির মালিক লালমোহনের বড় ভাই। নৌকায় কিশোর জীবন ঘুমিয়ে পড়েছিল। সেদিন ১৭ জুনের ফজরের নামাজের আজানের সময়। লালমোহন দেখতে পান নাফ নদীর পূর্ব দিক থেকে দুটি ট্রলার বাংলাদেশের জলসীমার দিকে আসছে। এখানেই ছিল বিজিবির একটি টহল নৌযান।

লালমোহন বলেন, 'এর কিছুক্ষণের মধ্যেই গুলির শব্দ। আমাদের বিজিবির নৌযান থেকে একজন পড়ে যান নদীতে। আমিও গুলির শব্দে নৌকা থেকে পানিতে নেমে যাই। নৌকা থেকে টেনে নিই ঘুমন্ত ভাগ্নেকেও। ও মা! দেখতে পাই মিয়ানমারের বিজিপি দুটি ট্রলারে করে সাত-আটজন এসে ধস্তাধস্তি করে তাদের ট্রলারে তুলে নেয় বিজিবির একজনকে। ওরা যাওয়ার সময় আমার ভাগ্নে আর আমাকেও তুলে নেয়।'

সেদিনের ভয়ংকর ঘটনার বিবরণ দিয়ে লালমোহন বলেন, "মিয়ানমারের ওই লোকগুলো যেন এক অদ্ভুত মানুষ। সেই ট্রলারেই তারা আমাদের ওপর নির্যাতন শুরু করে দেয়। এমনকি বিজিবি সদস্য রাজ্জাকের প্যান্টও খুলে নেয়। তাঁর 'বিজিবির পোশাকের' শার্টটি খোলার যথেষ্ট চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু রাজ্জাকের শরীর মোটা বিধায় সেটি খোলা সম্ভব হয়নি। সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায় বিজিবি সদস্য রাজ্জাককে ক্যাম্পে রাখা হয়। তাঁকে দফায় দফায় বেধড়ক পিটুনি দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে আমাদেরও বাদ দেওয়া হয়নি মারধর থেকে।"

লালমোহন বলেন, 'একপর্যায়ে আমার অন্তর কেঁদে ওঠে। আমারই দেশি ভাই। তাই আমার সঙ্গে থাকা একটি লুঙ্গি বিজিবি সদস্যকে দিয়ে দিই। এ কারণে বিজিপি সদস্যরা আমাকে বেদম মারধর করে। এমনকি এ ঘটনার জের ধরে আমাকে এবং আমার ভাগ্নেকে রাজ্জাকের কাছ থেকে পৃথক একটি রুমে রাখে। সারা দিন ধরে আমাদের কিছুই খেতে দেয়নি ওরা। রাত ৮টার দিকে সুযোগ বুঝে আমি আমার ভাগ্নেকে নিয়ে ক্যাম্প থেকে পালিয়ে যাই। পরে সেখান থেকেই নাফ নদীতে ভাটার সময় সাঁতার কেটে এপাড়ে পাড়ি দিই।'

টেকনাফের নাটমুরা গ্রামের জলদাশপাড়ার লালমোহন দাশের বাবার নাম নিলা কান্ত দাশ। মা-বাবা ও সন্তানসহ ছয়জনের সংসার তাঁর আয়ের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু গত ১৭ জুনের ঘটনার পর থেকে এক দিনের জন্যও নাফ নদীতে মাছ ধরার জন্য যেতে সাহস পাচ্ছেন না লালমোহন। তাঁর মনে এক অজানা ভয়। এবার যদি মিয়ানমারের ওরা (বিজিপি) তাঁকে পায় তাহলে জীবনে রাখবে না- এমনই শঙ্কা তাঁর। লালমোহন বলেন, 'আমি নিরাপত্তা চাই। আমি আমার জলসীমায় মাছ ধরে জীবনযাপন করতে চাই।' সংবাদ সূত্র: কালের কণ্ঠ।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত