সিলেটটুডে ডেস্ক

১৮ আগস্ট, ২০১৫ ১৬:৩৬

প্রবীর সিকদার : জোর করে স্বীকারোক্তি আদায়ে আরেক পা ভাঙার হুমকি

সাংবাদিক প্রবীর সিকদারকে নির্যাতনের মাধ্যমে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছে এবং তাঁর আরেক পা হারাবেন এ হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তাঁর ছেলে সুপ্রিয় সিকদার।

পুলিশ রিমান্ডে নেওয়ার আগেই তাঁর চোখ বেঁধে অমানুষিক নির্যাতন করেছে। তিনি রিমান্ড শুনানিতে কথাগুলো বলেছেন বলে উল্লেখ করেছেন প্রবীর সিকদারের ছেলে সুপ্রিয় সিকদার।

এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে সুপ্রিয় লিখেন-

'প্রবীর সিকদারকে রিমান্ডে নেবার আগেই চোখ বেধে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছে। জোর করে নেয়া হয়েছে কিছু স্বীকারক্তি। বলা হয়েছে, এক পা হারাইছেন, আরেক পাও হারাবেন তিনি। বাবা নিজে আজ রিমান্ড শুনানিতে এই কথাগুলো বলেছেন।
রিমান্ডে নিলে কি হতে পারে??''

এর আগে ফেসবুকে আরেক স্ট্যাটাসে বাবার মুক্তির জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেই শেষ ভরসা হিসেবে মনে করে তার বাবাকে ফিরিয়ে দিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন।

প্রধানমন্ত্রীর ওপর ভরসা করে সুপ্রিয় সিকদার লিখেন- ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি ব্যক্তিগতভাবে প্রবীর সিকদারকে চিনেন। শেষ ভরসা আপনি। আপনি চাইলেই হয়তো রহস্যের বেড়াজাল থেকে মুক্তি পাবে প্রবীর সিকদার।

যদি কিছু করতে না পারেন, তাহলে আমার মা, আমি, আর আমার ভাইকেও একটি মামলা দিয়ে কারাগারে প্রেরণ করেন।’

সুপ্রিয় প্রশ্ন রেখে লিখেন-‘আর কতো নির্যাতিত হবে সাংবাদিক প্রবীর সিকদার?? ৭১'এ বাবা-কাকাসহ হারিয়েছেন ১৩ জন নিকটাত্মীয়। ২০০১ সালে হারিয়েছেন নিজের একটি পা, বাম হাতের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা। সারা শরীরে বয়ে নিয়ে বেড়াতে হয় শত শত বোমার স্প্লিন্টার।’

আক্ষেপ করে সুপ্রিয় সিকদার লিখেন- ‘দেশ কি দিয়েছে প্রবীর সিকদারকে ?? কেউ কি জানাবেন ??? হয়তো এটাও প্রবীর সিকদারের দেশকে ভালোবাসার ফসল।’

উল্লেখ্য, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে (আইসিটি) ফরিদপুরের কোতোয়ালি থানায় দায়ের করা মামলায় সাংবাদিক প্রবীর সিকদারের তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) দুপুরে শুনানি শেষে এ রিমান্ড মঞ্জুর করেন ফরিদপুরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ১নং আমলি আদালতের বিচারক হামিদুল ইসলাম। বেলা সাড়ে এগারোটার পর ফরিদপুর জেলা কারাগার থেকে এনে প্রবীর সিকদারকে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (সিজেএম) আদালতে হাজির করা হয়।

এর আগে সোমবার সন্ধ্যায় আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। সে সময় তাকে দশদিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন জানান মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মিরাজুর রহমান।

সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ১নং আমলি আদালতের বিচারক হামিদুল ইসলাম প্রবীর সিকদারকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়ে মঙ্গলবার রিমান্ড শুনানির দিন ধার্য করেন।

এর আগে রোববার (১৬ আগস্ট) রাতে ঢাকা থেকে গ্রেফতার করে ফরিদপুরে নিয়ে যাওয়ার পর তাকে কোতোয়ালি থানায় রাখা হয়। সোমবার সন্ধ্যা পৌনে ছয়টায় থানা থেকে আদালতে হাজির করে পুলিশ।

প্রবীর সিকদার নিউজপোর্টাল উত্তরাধিকার ৭১ নিউজ, বাংলা দৈনিক বাংলা ৭১ এবং উত্তরাধিকার নামের ত্রৈমাসিক পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক। রাজধানীর ইন্দিরা রোডে পত্রিকাগুলোর কার্যালয়।

তিনি ধনকুবের মুসা বিন শমসেরের যুদ্ধাপরাধে সম্পৃক্ততা এবং বাচ্চু রাজাকারকে নিয়ে অনেকগুলো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেন। লেখালেখির কারণে ২০০১ সালে আক্রমনের শিকার হয়ে তিনি পা হারাতে হয় প্রবীর সিকদারকে।

এছাড়াও তিনি ফরিদপুরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেয়াই (মেয়ের শ্বশুর) এলজিআরডি মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন কর্তৃক হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বাড়িঘর দখলের বিরুদ্ধে লেখালেখি করে আসছিলেন, যে অভিযোগটি প্রথমে করেছিল বৌদ্ধ খ্রীষ্টান ঐক্য পরিষদ। তাঁর এ লেখালেখির পর মন্ত্রী নিজেই বলেছিলেন- হিন্দু ঐ পরিবারটি ভারত চলে গেছে।

এর বাইরেও প্রবীর সিকদার সাম্প্রতিক সময়ে এমজিআরডি মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফের নির্বাচনী এলাকা ফরিদপুরের মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর সাম্প্রতিক সময়ের নির্যাতন নিপিড়নের বিরুদ্ধে লেখালেখি করে আসছিলেন।

সাম্প্রতিক সময়ে নিজের জীবন নিয়ে শঙ্কিতও ছিলেন প্রবীর সিকদার। গত ১০ আগস্ট এ নিয়ে ফেসবুকে দেয়া এক স্ট্যাটাসে প্রবীর সিকদার লিখেন-

“আমার জীবন শংকা তথা মৃত্যুর জন্য দায়ী থাকবেন :
১. এলজিআরডি মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন এমপি
২. রাজাকার নুলা মুসা ওরফে ড. মুসা বিন শমসের
৩. ফাঁসির দণ্ডাদেশ প্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী বাচ্চু রাজাকার ওরফে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এবং এই তিন জনের অনুসারী-সহযোগীরা।”

ফেসবুক স্ট্যাটাসে মন্ত্রীর ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার অভিযোগে সাংবাদিক প্রবীর সিকদারের বিরুদ্ধে আইসিটি আইনের ৫৭ (২) ধারায় কোতোয়ালি থানায় মামলাটি দায়ের করেছেন ফরিদপুরের আওয়ামী লীগ নেতা, জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের উপদেষ্টা এপিপি অ্যাডভোকেট স্বপন কুমার পাল। রোববার বিকেলে তিনি ওই মামলা করার পর রাতে প্রবীর সিকদারকে তার রাজধানীর ইন্দিরা রোডের কার্যালয় থেকে গ্রেফতার করে ফরিদপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে ওই মামলায় প্রবীর সিকদারকে গ্রেফতার দেখানো হয়।

লিখিত এজাহারে বাদী অভিযোগ করেন, গত ১০ আগস্ট বেলা ১১টা ১৫ মিনিটে ‘আমার জীবন শংকা তথা মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী থাকবেন’ শিরোনামে জনসমক্ষে একটি স্ট্যাটাস পোস্ট করেন। এই পোস্টটি পড়ে আমার দৃঢ় বিশ্বাস হয় যে, উক্ত প্রবীর সিকদার ইচ্ছাকৃতভাবে গণমানুষের প্রিয় নেতা মাননীয় মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন এমপি সম্পর্কে মিথ্যা অসত্য লেখা লিখে সেটি তার নিজস্ব ফেসবুকে পোস্ট করে মাননীয় মন্ত্রীর ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করেছেন এবং উক্ত লেখাটি জনসমক্ষে প্রকাশের মাধ্যমে উস্কানি প্রদান করে শান্তিপ্রিয় মানুষের কাছে মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়কে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য বিদ্বেষ ছড়িয়েছেন। এর ফলে মাননীয় মন্ত্রীর মানহানি ঘটেছে। যা একটি ফৌজদারি অপরাধ।

মামলার আরজিতে আরও বলা হয়, ওই ফেসবুক স্ট্যাটাসে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন দাবি করে প্রবীর সিকদার বলেন- তার মৃত্যু হলে স্থানীয় সরকার, সমবায় ও পল্লী উন্নয়নমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন, বিতর্কিত ব্যবসায়ী মুসা বিন শমসের ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকার দায়ী থাকবেন।

তবে পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, রাজধানীর শেরেবাংলানগর থানায় নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে ব্যর্থ হয়ে প্রবীর সিকদার ওই স্ট্যাটাস দেন।

পরিবার বলছে, রোববার সন্ধ্যায় প্রবীর সিকদারকে নিয়ে যান আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। তার ইন্দিরা রোডের কার্যালয় থেকে শেরেবাংলানগর থানা পুলিশের একটি দল প্রবীর সিকদারকে নিয়ে যায়। পরে তাকে মিন্টো রোডে মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নেওয়া হলেও রাতেই তাকে ফরিদপুর কোতোয়ালি থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।

সাংবাদিক প্রবীর সিকদার মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পরিবারের সন্তান। তার বাবাসহ পরিবারের ১৪ জন একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে শহীদ হয়েছিলেন। দৈনিক জনকণ্ঠের ফরিদপুরের নিজস্ব সংবাদদাতা থাকাকালে পত্রিকায় প্রকাশিত ‘সেই রাজাকার’ কলামে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুসা বিন শমসেরের বিতর্কিত ভূমিকার বিবরণ তুলে ধরেন তিনি। এরপর ২০০১ সালের ২০ এপ্রিল সন্ত্রাসী হামলায় গুরুতর আহত হন। বর্তমানে একটি পা হারিয়ে পঙ্গু জীবন যাপন করছেন তিনি।

ফরিদপুরের কানাইপুরের ঐতিহ্যবাহী জমিদার সিকদার বাড়ির সন্তান প্রবীর সিকদার দৈনিক জনকণ্ঠের ফরিদপুরের নিজস্ব সংবাদদাতা ও পরে পদোন্নতি পেয়ে স্টাফ রিপোর্টার পদে কর্মরত ছিলেন দীর্ঘদিন। পরে ঢাকায় এসে দৈনিক সমকাল ও দৈনিক কালের কণ্ঠে কাজ করেছেন তিনি।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত