১৭ মে, ২০২৬ ০২:০৭
জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ (জি এম) কাদের বলেছেন, ‘দেশের অর্ধেক লোককে বাদ দিয়ে আপনারা (সরকার) সংস্কার করবেন, আপনারা বিচার করবেন, নিজের স্টাইলে বিচার আর নির্বাচন করবেন, এটা কত দিন টিকবে জানি না। বাংলাদেশের ইতিহাসে সকলকে বাদ দিয়ে যে সংস্কার করা হয়েছে, সেটা কোনো দিন টিকে নাই। দেশের মানুষ, সকলকে মিলে যদি অ্যামেন্ডমেন্ট (সংশোধনী) না করতে পারেন, সেই অ্যামেন্ডমেন্টও কখনোই টিকে থাকবে না।’
শনিবার (১৬ মে) বিকেলে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে জহুর হোসেন চৌধুরী হলে এক প্রকাশনা উৎসবে এসব কথা বলেন জি এম কাদের।
‘বাংলাদেশের গণতন্ত্র, সোনার পাথরবাটি’ ও ‘মাইজেরিস অব ডেমোক্রেসি মিসকনসিভড্’ শিরোনামে লেখা জিএম কাদেরের দুটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। প্রকাশনা সংস্থা ‘আকাশ’ এর আয়োজন করে।
২০১৪ সালের পর থেকে সবগুলো নির্বাচন ‘সাজানো’ হয়েছে বলে মন্তব্য করেন জি এম কাদের। তিনি বলেন, ‘২০১৪-এর পর থেকে এখন পর্যন্ত যে নির্বাচন হয়েছে, সব কটি সাজানো নির্বাচন হয়েছে। প্রিডিটারমাইন্ড ইলেকশন হয়েছে।’
নির্বাচন কমিশন ও অন্তর্বর্তী সরকারকে কটাক্ষ করে জাপা চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমাদের নির্বাচন কমিশন ও অন্তর্বর্তী সরকারকে একটা অভিনন্দন জানানো উচিত। অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অত্যন্ত সুচতুরভাবে কারচুপি করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার অত্যন্ত সুচতুরভাবে দেশি-বিদেশিদের বোকা বানিয়েছে, আমাদেরকে বোকা বানিয়েছে। এই ধরনের কারচুপির নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে কারও সময় হয় নাই।’
‘ভোটার’, ‘কেন্দ্র’, ‘ভোট দেওয়ার সময়’ ও ‘ভোট কাস্টিংয়ের গাণিতিক হিসাব’ উল্লেখ করে সেগুলোকে চ্যালেঞ্জ করে জি এম কাদের বলেন, ‘এই ধরনের নির্বাচন কাকে জেতানো হবে, কাকে হারানো হবে, কাকে বের করে দেবে—সম্পূর্ণ পূর্ব নির্ধারিতভাবে তারা এটা করেছে। এই নির্বাচনে আপনারা যতটুকু দেখিয়েছেন, যতটুকু ভোট কাউন্টিং দেখেছেন, সেই ভোট কাউন্টিং ইম্পসিবল। এটা হয়নি, হতে পারে না।’
আওয়ামী লীগের ২০১৪ সাল থেকে ‘ওয়ান সাইডেড ইলেকশন’ শুরু হয়েছে বলে মন্তব্য করেন জি এম কাদের। তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন রাষ্ট্রের মানুষের চিরদিনের আকাঙ্ক্ষা ছিল বৈষম্য থেকে মুক্তি। কিন্তু আমরা নিজস্ব দেশ পেলেও বৈষম্য থেকে মুক্তি পেলাম না। সংবিধানে গণতন্ত্র থাকলেও আসলে আমরা সেই গণতন্ত্র পাইনি। নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র পেয়েছে জনগণ।’
জিএম কাদের বলেন, ২০২৪ সালের নির্বাচনে ভোটার ছিল প্রায় ১২ কোটি, তখন ভোট বুথ ছিল ২ লাখ ৬১ হাজার। অথচ ২০২৬ সালের নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা প্রায় ৮০ লাখ বেড়ে ১২ কোটি ৭৭ লাখ হলেও বুথ কমিয়ে করা হয়েছে ২ লাখ ৪৪ হাজার ৬৫৯টি। প্রায় ১৭ হাজার বুথ কেন কমানো হলো? ওনারা জানতেন যে, মানুষ ভোট দিতে আসবে না। তাই কৃত্রিম ভিড় দেখাতে এবং পরবর্তীতে ভোট ম্যানিপুলেট করতেই এই চাতুর্যের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কমিশন ঘোষিত ৫৯.৪৪ শতাংশ ভোট পড়ার দাবিকে ‘সম্পূর্ণ অসম্ভব’ আখ্যা দিয়ে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান বলেন, ১৩ কোটি ভোটারের ৫৯% অর্থাৎ প্রায় ৭ কোটি ৫৯ লাখ ভোট পড়েছে বলা হচ্ছে। এই ভোট যদি নির্ধারিত বুথ সংখ্যা দিয়ে ভাগ করা হয়, তবে প্রতি বুথে ৩১০টি করে ভোট পড়ে। ৯ ঘণ্টার (৫৪০ মিনিট) সময়সীমায় প্রতি ভোটারের জন্য বরাদ্দ থাকে মাত্র ১০৪ সেকেন্ড। এই ১০৪ সেকেন্ডের মধ্যে একজন ভোটারের আইডি চেক করা, আঙুলে কালি দেওয়া, ব্যালট পেপার নিয়ে বুথে ঢোকা, দুটি ব্যালটে সিল মারা, ভাঁজ করা এবং ব্যালট বক্সে ফেলা কোনোভাবেই সম্ভব নয়; যদি না এক সেকেন্ডের জন্যও বুথ খালি থাকে।
তিনি দাবি করেন, সাংবাদিক ও মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী বেশিরভাগ কেন্দ্রই অর্ধেকের বেশি সময় খালি ছিল। বাস্তবে ১২ থেকে ১৫ শতাংশের বেশি ভোট পড়েনি। বাকি সাড়ে ৫ কোটি ভুয়া ভোট নিজেদের পছন্দমতো প্রার্থীদের মধ্যে ভাগ করে দিয়ে ফলাফল নির্ধারণ করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেও দেশে তীব্র দুর্নীতি চলেছে দাবি করে জিএম কাদের বলেন, বর্তমানে দেশজুড়ে এক অভিনব ‘মামলা বাণিজ্য’ শুরু হয়েছে। নিরীহ মানুষকে মামলার ভয় দেখিয়ে এবং ‘শোন অ্যারেস্ট’ (গ্রেপ্তর দেখানো) থেকে বাঁচানোর নাম করে বিভিন্ন স্তরে বড় অংকের টাকা ঘুষ নেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ হিসেবে জাতীয় পার্টি বা ভিন্নমতাবলম্বী কারও নাম থাকলেই দোষর আখ্যা দিয়ে বিমানবন্দরে আটকে দেওয়া হচ্ছে এবং পরে ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায় করা হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনা করে জাপা চেয়ারম্যান বলেন, শেখ হাসিনা ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের বিশাল পরিবর্তন করেছিলেন, কিন্তু সবাইকে বাদ দিয়ে করায় তা টেকেনি। একইভাবে বর্তমান সরকারও যদি দেশের অর্ধেক রাজনৈতিক শক্তি ও সাধারণ মানুষকে বাদ দিয়ে নিজেদের স্টাইলে সংস্কার বা বিচার করতে চায়, তবে সেই সংস্কারও বাংলাদেশের ইতিহাসে কখনো টিকবে না।
দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, লাঙ্গল প্রতীক থাকবে কি থাকবে না, তা নিয়ে আমরা ভাবছি না। মামলা চলছে। হয়তো নিয়ে যাবে। কিন্তু দলের ভেতরে থেকে যারা বেইমানি করবে, তাদের আর সুযোগ দেওয়া হবে না। আমরা জনগণের পক্ষে একা হলেও লড়াই চালিয়ে যাব।
প্রধান আলোচকের বক্তব্য প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক, রাষ্ট্রচিন্তাবিদ ও বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, ‘আমাদের গোটা ইতিহাসটাই বলে যে বাঙালির রাজনৈতিক প্রতিভা, রাজনৈতিক মেধা এই জাতির মধ্যে পাওয়া যায় না। বিদেশিদের দ্বারা শাসিত হয়েছে।’
আবুল কাসেম আরও বলেন, ‘রাজনীতি সম্পর্কে আমাদের চিন্তাচেতনা বিকশিত হোক। যাঁরা রাজনীতি করেন, তাঁরা কিছু লিখলে সেই লেখার গুরুত্ব অন্যদের লেখার তুলনায় সাধারণভাবে বেশি।’
বর্তমান বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে সিনিয়র সাংবাদিক মাসুদ কামাল বলেন, ‘দেশে আমরা সব সময় ভেবেছি একটা শক্তিশালী বিরোধী দল থাকা উচিত। একটা নির্বাচন হয়েছে, একটা সংসদ পেয়েছি। সেই নির্বাচনের মাধ্যমে জাতীয় সংসদে আমরা যে বিরোধী দল পেয়েছি, এটাকে বিরোধী দল বলি না।’
মাসুদ কামাল তার মত তুলে ধরে বলেন, ‘বিরোধিতা মাঠে হচ্ছে, এগুলো লোকদেখানো। আমি মনে করি, পারসোনালি নৈতিকভাবে এই দলগুলো আসলে একই।’
বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের খুবই অভাব রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সাংবাদিক আনিস আলমগীর। তিনি বলেন, ‘বৃহত্তর একটা রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হয়ে আছে। আরেকটা রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আর আরেকটা রাজনৈতিক দল বিরোধী দলে আছে এবং তাদের এ-টিম, বি-টিম, সি-টিম সব আছে। আর কোনো রাজনৈতিক দল নাই। এই অবস্থায় বাংলাদেশে একটা বৃহত্তর রাজনৈতিক দল দরকার, যেটা বিরোধী ভূমিকায় যেতে পারবে। সেটা এখন খুব জরুরি।’
আওয়ামী লীগের বিরোধিতা জাতীয় পার্টি শক্তভাবে করতে পারলে দেশে জঙ্গিবাদের মুখে পড়তে হতো না বলে মন্তব্য করেন সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্না। তিনি বলেন, ‘ডক্টর ইউনূস সরকারের সময় জঙ্গিবাদ, চরম পন্থা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল।’
প্রকাশক আলমগীর সিকদার লোটনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন জাতীয় পার্টির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী, ইকবাল হোসেন তাপস, সাংবাদিক কাজী রনক হোসেন প্রমুখ।
আপনার মন্তব্য